কৃষিশিক্ষা
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় :গৌরবের ৫৩ বছর
প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০১৪, ২১:৫৩
চিকিত্সা বিজ্ঞানে আমাদের অনেক অর্জন। চিকিত্সক সবাক প্রাণীর সেবা করেন, যে নিজের কথা বলতে পারে। কিন্তু কৃষিবিদদের কর্মকাণ্ড নির্বাক প্রাণীদের নিয়ে, যারা নিজেদের চাওয়া, সুখ-দুঃখের কথা বলতে পারে না। বোবার মুখে হাসি, আর নির্জীবে ফুল ফুটানো অত্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন ও কষ্টসাধ্য সাধনার বিষয়। জ্ঞানে-গরিমায় বলীয়ান, কৌশলে চৌকস, কৃষিবিদরা এসব বোবা জীবের সাথে মিতালি গড়ে, আপন বলয়ে সন্তানের মতো লালন-পালন করে, মানুষের চাহিদানুযায়ী, বৈরী-প্রতিকূল পরিবেশে বেড়ে উঠতে সক্ষম নতুন জাত, প্রজাতি, প্রযুক্তি তৈরি করেন। তাঁরা ফসলের, সব্জির, গাছের, বন , মাছের, হাঁস-মুরগি, গবাদি সম্পদের নতুন, উন্নত জাত ও চাষ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে অজেয়কে জয় করছেন। রক্ত ঝরানো যত সহজ, ঘাম ঝরানো তত কঠিন। হুল ফুটানোর চেয়ে ফুল ফুটানোর কঠিন ও কষ্টকর কাজটি কৃষিবিদরা অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে করে যাচ্ছেন। অর্থনৈতিক মুক্তি না হলে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্থহীন। এ মুক্তির জন্য তাঁরা যুদ্ধ করছেন।
জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক, জাতীয় বীর-কৃষিবিদদের সূতিকাগার; নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, মেধা লালন ও চর্চা কেন্দ্র- বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৬১ সালের ১৮ আগস্ট, ময়মনসিংহে প্রতিষ্ঠিত হয়। কৃষির প্রায় সকল শাখায়, শিরা, উপশিরা ও রক্তনালীতে কৃষি শিক্ষার্থীদের বিচরণ, সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের চেষ্টায় রত। এখানে কৃষিবিজ্ঞানের সব শাখায় উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত হয়েছে। বহুমাত্রিক ও বৈচিত্র্যময় বিষয় গবেষণার সুযোগ, একত্রে, একসাথে শুধু এখানেই রয়েছে। কৃষি, পশু চিকিত্সা, পশুপালন, মাত্স্য বিজ্ঞান, কৃষি প্রকৌশল ও কারিগরি, কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ৪৪টি বিভাগ হতে গ্রাজুয়েট ৩৬,৮৩৩ হাজার কৃতী কৃষিবিদ কৃতিত্বের সাথে কৃষি সেক্টরসহ প্রায় সকল ক্ষেত্রে সুনামের সাথে দেশে বিদেশে সফলতার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকে উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এ ক্যাম্পাসে রয়েছে বহুমুখী কৃষি গবেষণার জন্য পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার করে উন্নত জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে নিয়োজিত একমাত্র প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) এবং বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউট। টেকসই উন্নয়ন ও বিনিযোগ বৃদ্ধির জন্য প্রযোজন প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি। বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা, কর্মকাণ্ড, বিভিন্ন পেশা ও শ্রেণীর মানুষের চাহিদা সমস্যা সমাধানে তাঁরা তত্পর। দেশে গবেষণা, উন্নয়ন ও পজিটিভ পরিবর্তন যদি কোন ক্ষেত্রে হয়ে থাকে সেটা হয়েছে কৃষি সেক্টরে এবং কৃষির জন্য। সরকারের সফলতা ও গৌরবের প্রতীক হচ্ছে কৃষি সেক্টর। এ মহান অর্জনের মূলে রয়েছে বীর প্রসূতি, মেধার লালন ও চর্চার চারণভূমি, রত্নগর্ভা বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং এর গ্রাজুয়েট-কৃষিবিদরা। বিভিন্ন কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সেক্টরে কর্মরত থেকে জাতীয় এ বীররা মৌলিক গবেষণা, জ্ঞান সৃষ্টি ও সর্বত্র প্রযুক্তির প্লাবন সৃষ্টি করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় প্রত্যাশিত গতিবেগ সৃষ্টি করেছে। তাঁদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তিগুলোর মধ্যে উফশি ধানের ৭০টি, হাইব্রিড-৪, গমের-২৭টি, আলুর-৩০টি, আখের-৪০টি, পাটের-৪২টি, সব্জির-৬৫টি, ফলের-১২৭টি, তিলের-৩৬, ডালের-২৭টি জাত। প্রতিষ্ঠানিক হিসাবে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট-৩০৫টি, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট-৬১টি, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট-৫৭টি, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট-৩৬টি জাত উদ্ভাবন করেছে। বাকৃবির রয়েছে শতাধিক প্রযুক্তি। নন-কমোডিটি প্রযুক্তির সংখ্যা হবে হাজারেরও অধিক। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও এক্ষেত্রে ব্যাপক সফলতা দেখিয়েছেন। আর প্রযুক্তির উত্কর্ষ সাধন, সমপ্রসারণ ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের ফলেই উত্পাদন/ফলন বেড়েছে, মানুষের আয় বৃদ্ধি পেয়ে জীবনযাত্রা উন্নত হয়েছে। ‘বঙ্গবন্ধুর অবদান, কৃষিবিদ ক্লাস ওয়ান’ ঘোষণার মাধ্যমে কৃষিশিক্ষা ও কৃষিকে একটা সম্মানজনক পেশায় পরিণত করা হয়েছে। কৃষিশিক্ষা, গবেষণা ও সমপ্রসারণের উদ্দেশ্য নিয়ে বাকৃবির যে যাত্রা শুরু হয়েছিল তার অধিকাংশই সফল হয়েছে।
দেশের সবচেয়ে বড়, মনোরম, মুগ্ধকর পরিবেশ, ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে, নয়নাভিরাম সবুজ চত্বরে ১,২০০ একর আয়তনের সুবিশাল তিনটি ছাত্রী হলসহ মোট ১২ আবাসিক হল রয়েছে। প্রায় সাড়ে পাঁচশ’ শিক্ষকের অধিকাংশই অভিজ্ঞ, উচ্চ ডিগ্রী ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। রয়েছে পর্যাপ্ত ভৌত অবকাঠামো ও আধুনিক সুযোগ সুবিধা। আশার কথা, পৃথিবীতে প্রথম কৃষি আবাদের সূচনাকারী নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা মোট শিক্ষার্থীর অর্ধেক। জাতিকে দেশপ্রেম, কর্মনিষ্ঠা, বিশ্বস্ততা ও সততার সাথে ‘শিকড় থেকে শিখরে’ পৌঁছার মূর্ত প্রতীক হচ্ছে আমাদের নারী সমাজ। কৃষিশিক্ষা ও কৃষি সেক্টরে তাঁদের অধিকহারে প্রবেশ শুভ সূচনারই ইঙ্গিত বহন করে; জাতির জন্য এটা মঙ্গল বয়ে আনবে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ইতিমধ্যে অর্ধশতাব্দির পথ পাড়ি দিয়ে ৫৪ বছরে পদার্পণ করলো। এটি আমাদের পরম আনন্দ ও গৌরবের। এ দীর্ঘ পথ চলায় দেশের প্রাচীন, প্রথম ও ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান-বাকৃবি তৈরি করেছে অনেক বিচক্ষণ কৃষিবিদ, সফলতা ও অর্জন যাঁদের অনেক। জাতীয় রাজনীতিতে, দেশ গঠনে, মহান মুক্তিযুদ্ধে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে বিরাট অবদান। তাঁরা যেখানেই পা ফেলেছে, সফলতা তাঁদের করায়ত্ত হয়েছে; মায়াময় দক্ষ হাতের ছোঁয়ায় সর্বত্র সোনা ফলেছে। কৃষিবিদদের সম্মিলিত কর্ম উদ্যোগ ও আত্মবিশ্বাস জাতির অর্থনৈতিক মুক্তির দিশারী হবে।
লেখক: কৃষি প্রকৌশলী
niazpasha@yahoo.com