দুর্ঘটনা
নৌ-দুর্ঘটনা ও গার্মেন্টস শ্রমিক
প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০১৪, ২১:০৫
ঈদের পর বিএনপির আন্দোলন নিয়ে সরকার ও জনগণ যখন চিন্তাগ্রস্ত তখন গত ৪ আগস্টের নৌ-দুর্ঘটনা, তোবা শ্রমিকের বেতন-বোনাস আন্দোলন (যা ঈদের আগেই শুরু হয়) আর সম্প্রচার আইন নিয়ে ঘটে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। বলা যায়, এই তিন বিষয় যখন সরগরম তখন বিরোধীদের আন্দোলন কর্মসূচিহীন নিরুত্তাপে স্থবিরত্বে ধুঁকেছে। তাদের কর্মীহীন মাঠশূন্য রাজনীতি তেমন হালে পানি পাচ্ছে না। এর মধ্যে আবার খড়্গ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে অভিযোগপত্রের। আছে মামলার আতঙ্কও। এসবের ভারে তাদের কর্মপরিকল্পনা এখন দিকশূন্যহীন, পথহারা। কোনো কর্মসূচিই ঠিক দাঁড়াচ্ছে না। যা হোক, এ পর্যায়ে সবচেয়ে মর্মান্তিক খবর হলো সর্বনাশা পদ্মায় শতাধিক মানুষের নির্মম মৃত্যু। লঞ্চ ‘পিনাক-৬’ উদ্ধার হয়নি। অনেক লাশের খবর মেলেনি। স্বজন খুঁজে ফেরা মানুষ এখন আশাহীন। শোকের পাথর আর অন্তহীন হাহাকারের শেষ নেই। এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় দেশের নৌ-আইন, মন্ত্রী-মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, কর্তৃপক্ষ যেন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। একটি দুর্ঘটনা সর্বপ্রকার আইনকেই যেন বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়েছে। কতোবার ঘটছে এমন দুর্ঘটনা, এর আগেও ডুবে যাওয়া লঞ্চ এবং শত শত যাত্রীর খোঁজ মেলেনি। আমাদের দেশে আইন আছে কিন্তু প্রয়োগ নেই। মাথাভারি প্রশাসন আছে কিন্তু কাজের লোক নেই। একসময় এমন দুর্ঘটনায় মানুষের প্রাণ গেলে হয়তো নিয়তি ভেবেই অনেকে তা মেনে নিতো। এক ধরনের সান্ত্বনাও পেতো। কিন্তু এখনও কী তা সম্ভব? এই আধুনিক প্রযুক্তির যুগে, এতো সচেতনতা-সতর্কতা, মিডিয়ার প্রচার, তাত্ক্ষণিক যোগাযোগের সুযোগ—তবুও অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু পিছু ছাড়ছে না। ঈদে-পার্বনে এরকম হরহামেশাই ঘটে চলছে। আরও কষ্টকর যে, মৃত্যুর পর স্বজনদের লাশের ঠিকানাও মেলে না। এভাবেই কী আমাদের প্রযুক্তিনির্ভরতার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন কিছু অবহেলা আর আহাজারিতে আটকে থাকবে! এখনও যদি মানুষের এই পরিণতি হয় তবে বাঁচার অধিকার কোথায়! অস্তিত্বটুকু কী থাকে? প্রতিকারই বা কী? টকশোতে কাগজে অনেক পরামর্শ উপদেশ সতর্কতার ফিরিস্তি দেয়া হচ্ছে (মন্ত্রীগণসহ)। কিন্তু কিছু হচ্ছে কী! কোনো দুর্ঘটনাই কী আমাদের কাছে শিক্ষার কোনো কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে? এক একটি দুর্ঘটনা ঘটে, আমরা সবাই দোষত্রুটির পরিকল্পনা নিয়ে বসি অতঃপর ‘যথাপূর্বং তথা পরং’। সবকিছু আগের মতো হয়ে যায়। এবার ঈদের আগেই নৌ-মন্ত্রণালয় বিশেষ সতর্কতার কথা বলেছিল, দক্ষিণবঙ্গগামী লাখ লাখ মানুষের যাত্রা সুবিধার জন্য নানা পদক্ষেপও ঘোষণা করেছিল—কিন্তু কোনোটাই কাজে আসেনি। এসবের পেছনে গাফিলতিই প্রধান। কেউ আইন মানে না। আইনের প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা নেই। আর যারা আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ তারাও কঠোর নন। আইন উদ্বুদ্ধকরণে সচেষ্ট হন না। সত্যিকার অর্থে, একটি কাজের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিছক চাকরিই করেন। দায়বদ্ধতা আর দেশপ্রেম খুব ঠুনকো মনে হয়—নইলে এমন তুচ্ছ অবহেলায় এতো মানুষের প্রাণহানি ঘটে? কথাগুলো হয়তো সরল ও একপাক্ষিক মনে হচ্ছে। কিন্তু অনেকটাই তো সত্য! মানুষের জীবনই যদি বিপন্ন হয় তাহলে এতো ব্যবস্থা কীসের জন্য। আসলে সিস্টেম বা ব্যবস্থাটা শক্ত হওয়া জরুরি। ইচ্ছেমতো গায়ের জোরে নিজের নক্শায় যে লঞ্চমালিক হওয়া যায় না কিংবা নির্দিষ্ট অবস্থান থেকে লঞ্চ ছাড়ার সময় আইনের বাইরে কেউ কিছু করা যাবে না—এ সত্যটি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সবক্ষেত্রেই ব্যক্তিস্বার্থ মুখ্য নয়, তাহলে আইন ও শাসনের দণ্ড শিথিল হয়ে পড়ে। কোন সময়ে কার সরকার বা মন্ত্রী সেটি বড় কথা নয়। আইন ভঙ্গ করা চলবে না। শক্তির জোরে স্বেচ্ছাচারিতা চলবে না। যে কোনো মূল্যে বৃহত্তর স্বার্থটুকু বহাল রাখতে হবে। চাঁদাবাজি, প্রযুক্তিহীন লঞ্চনির্মাণের দায়হীনতা আর অধিক যাত্রী বহনের নির্বিচার কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হবে। আমাদের দায়িত্বহীনতা এখন এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে অনাচার নিয়ে বিদ্রূপ করাও যেন কষ্টকর!
আমরা সবাই জানি, পোশাক শ্রমিকরা এদেশের প্রবৃদ্ধির একটি বড় অংশ। কিন্তু তাদের শ্রমের মর্যাদা নেই বললেই চলে। তোবা পোশাক কারখানায় শ্রমিকদের বকেয়া-বোনাস, ওভারটাইম নিয়ে তৈরি হয় সংকট। এ সংকটের উত্স কী? শ্রম দেয়ার পর মালিকরা কেন বেতন দিতে কসুর করেন? ধারাবাহিকভাবে আমাদের পোশাকশিল্পে এ সংকট চলছে। হঠাত্ গার্মেন্টসপাড়া হয়ে ওঠে অসন্তুষ্ট। ছড়িয়ে পড়ে অসন্তোষ। এ খবর বিশ্বময় প্রচার হলে দারুণ নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এ খাতে। শ্রমিক অসন্তোষের পেছনে সরকারের পক্ষ থেকে মাঝে-মধ্যেই নানা ষড়যন্ত্রের কথা বলা হয়। কিন্তু তার দাঁতভাঙ্গা জবাব কেন দেয় না সরকার! গ্রাম-গঞ্জ থেকে কর্মহীন মানুষ ছুটে আসে গার্মেন্টসগুলোতে। সম্প্রতি সরকার যে ন্যূনতম মজুরি ঠিক করে দিয়েছেন সেটা অনেকটা ভালো ব্যাপার। এতে করে অসন্তোষ কিছুটা হলেও কমবে। যে কর্মহীন মানুষগুলো কর্মের নেশায় শহরে ছুটে আসে তাদের মৌলিক চাহিদাটুকু মিটলেই তো তারা সন্তুষ্ট। কিন্তু তোবা-তাজরিন-রানা প্লাজার মতো গুটিকয় স্বার্থলোলুপ অসত্ নিষ্ঠুর মালিকের জন্য গার্মেন্টস খাত হয়ে পড়ছে কালিমাময়। তাতে ভাবমূর্তি হারাচ্ছে। এখনও জেএসপি সুবিধা ফিরে পায়নি বাংলাদেশ। সত্যিকার অর্থে শ্রমিকদের কাজের ন্যূনতম পরিবেশ, মাসান্তে বেতন, বছরের বোনাস না দিয়ে স্বার্থলোলুপ মালিকের স্বেচ্ছাচারিতায় একটি প্রতিষ্ঠান দিনের পর দিন চলে কী করে? বাংলাদেশে শ্রম সস্তা, সেই সস্তার বিপরীতে মালিকরা ডিক্টেটর হয়ে শ্রমকে মূল্যহীন করে তুললে তার দায় কে নেবে! তা স্বস্তিকরও নয়। কেউ মেনেও নেবে না। সাধারণত এক কারখানার শ্রমিকদের অন্য কারখানা নানা কারণেই নিতে চায় না। কাজ না পেলে তারা অসহায়তার মধ্যেও পড়ে। এখন মনে হয় গার্মেন্টস শিল্পকে বাঁচাতে কর্মপরিকল্পনা দরকার। এবং তা প্রয়োগহীন হলে চলবে না। রানা প্লাজা বা তাজরিন দুর্ঘটনা যে শিক্ষা দিয়েছে তাতে শ্রমিক স্বার্থই শুধু নয় সামগ্রিক স্বার্থ জড়িত। জেএসপি সুবিধা ফিরে পাবার জন্যও তা দরকার। মালিকদের রক্তচোষা নীতি পরিহার করতে হবে। কারণ, একসময় বেতন-মজুরিতে মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতা ছিল; এখন শ্রমিক সচেতনতা, অভ্যন্তরীণ চাহিদা, শ্রম মর্যাদা, শ্রমিক ইউনিয়নের কর্মকাণ্ড বেড়েছে, শ্রমিক-ফ্যাক্টরির সংখ্যাও অনেকগুণ বেড়েছে—তাই সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন—যা হবে শ্রমভিত্তিক। হতে হবে শ্রমিক-মালিক উভয়েরই স্বার্থ-সাপেক্ষ। এতে করে মাঝে-মধ্যেই যে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি হয় তা প্রশমিত হতে পারে। অবহেলিত শ্রমিকদের বিপরীতে মালিকপক্ষের স্বেচ্ছাচারী সংস্কৃতি পরিহার করতে হবে। শ্রম বিক্রি করা শ্রমিকদের পিঠ যাতে দেয়ালে ঠেকে না যায় তা দেখতে হবে, কারণ শ্রমজীবী জনতার স্বার্থ-ঐক্য তীব্র হলে তাতে যে ক্ষোভ দানা বাঁধে তাতে পুরো শিল্পই হতে পারে ক্ষতির সম্মুখীন। দেশের অর্থনীতি শক্তিও চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। বিদেশে ক্ষুণ্ন হয় দেশের ভাবমূর্তি। তোবার মালিক দেলোয়ার শ্রমশোষক-অসত্-নীতিহীন দুর্নীতিবাজ। তার মতো মালিকের দায় বিজেএমইএ বা সরকার কেন নেবে! ব্যবসার নীতি ও সততাই প্রধান। শ্রমিকরা ন্যায্য পাওনা ও মর্যাদা যেমন চায়, চাকরির নিশ্চয়তাও চায়— এটি একটি স্বাধীন দেশের নাগরিকের ন্যূনতম অধিকার। মালিকরা লাভবান হবেন প্রাতিষ্ঠানিকতা মেনে। সেটি দিতে পারে শ্রমিক-মালিক সম্পর্কের স্বাভাবিক নিশ্চয়তা।
লেখক : অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
shiqbal70@gmail.com