জীবনদর্পণ 

আত্মশক্তি হারালে চলবে কেন

ন্যান্সির আত্মহত্যা চেষ্টার খবর অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে নিশ্চয়ই। এর নেপথ্য কারণ নিয়েও বিভিন্ন খবরের কাগজে গত কয়েকদিনে নিয়মিত সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তার সম্পর্কে আমার ধারণা কেবল এতটুকু যে, তিনি বর্তমান প্রজন্মের গায়িকাদের মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় এবং ভালো গায়িকা। তার যে কয়েকটি গান আমি শুনেছি, আমার ভালো লেগেছে। তাই তার আত্মহত্যা চেষ্টার ঘটনাটা জানার পর এর নেপথ্য কারণটি জানার আগ্রহ বেড়ে যায়। কোন ধরনের হতাশার চোরাবালিতে ডুবে যেতে যেতে একজন ব্যক্তি নিজের জীবন নিজেই নিঃশেষ করার সিদ্ধান্ত নেয়, আমি জানি না। আত্মহত্যা করে তারাই, যারা জীবনের কাছে পরাজিত হয়। ‘পরাজিত’ কেন বলছি? তার আগে ‘পরাজিত’-এর সংজ্ঞাটিকে কীভাবে বিশ্লেষণ করা উচিত—সেটাও ভাববার বিষয়। সবার কাছে নিশ্চয়ই এই ‘পরাজয়’টা একরকম নয়। জীবনযুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ের টুকরো টুকরো পরাজয়ে মানব-মনে নানা ধরনের হতাশা সৃষ্টি হয়। আর সেই হতাশা কোনো একটি পর্যায়ে মানুষের যাপিত জীবনের অবলম্বনকে এমনভাবে আক্রমণ করে—সম্ভবত সেই মানুষটির ভাবাবেগ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। কিন্তু হতাশা তো জীবনেরই ছায়া। হতাশা নেই কার জীবনে? তাই বিভিন্ন সংবাদপত্রের প্রকাশিত ন্যান্সি-সংক্রান্ত খবরের মধ্যে নিজের জীবনকে ‘শেষ’ করার কোনো শক্তিশালী কারণ বা এ-সংক্রান্ত বস্তুনিষ্ঠ তথ্য খুঁজে পেলাম না। পেলাম না, নাকি সংবাদদাতারা দিতে ব্যর্থ হল—জানি না। একজন নারী যখন আত্মহত্যা করেন অথবা আত্মহত্যার চেষ্টা করেন—তখন স্বাভাবিকভাবেই লোকে মনে করে—নিশ্চয়ই তিনি ভীষণভাবে অসুখী ছিলেন। বিবাহিত হলে তিনি বিবাহিত জীবনে স্বামী সংসারের অশান্তির জন্য, অথবা অবিবাহিতা হলে তার হূদয়ঘটিত কোনো হতাশার জন্য আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন—এই সমীকরণটিই সাধারণত সহজে মেলানো হয়। ন্যান্সি ভালো গান গায়, জনপ্রিয় শিল্পী। তার দুটো সন্তান আছে। তাও আবার ‘কন্যা’ সন্তান। আত্মহত্যা-চেষ্টার পেছনে কোনো বিবাহিতা নারীর ক্ষেত্রে সাধারণত তার স্বামীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। এক্ষেত্রেও আছে কিনা আমাদের জানা নেই। ন্যান্সি তার ফেসবুক-এ সর্বশেষ ছবি আপলোড করেছেন গত ৭ আগস্ট। সেখানে তার মিষ্টি দুটি মেয়ের তিনটি ছবি দেয়া, অনুভূতির জায়গায় লেখা—‘পরিপূর্ণ অনুভব করছেন’। ঠিকই তো—এত মিষ্টি দুটি মেয়ে যার, তিনি তো ‘পরিপূর্ণ অনুভব’ই করবেন। এর মাত্র কয়েকদিন পর কী এমন ঘটনা ঘটল, যা এই পরিপূর্ণ জীবনকেও ধ্বংস করে দিতে তিনি দ্বিধা করেননি? তাহলে কি আমরা ন্যান্সির ‘মানসিকতা’ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারি না? দুটো বাচ্চা রেখে কোনো ‘মা’ কেমন করে এ পথ বেছে নেয়ার বীভত্স সিদ্ধান্ত নিতে পারেন? তিনি তো শুধু নিজেকে ‘হত্যা’ করতে চাননি। তিনি দুটো ছোট্ট বাচ্চার ‘মা’কে হত্যা করতে চেয়েছেন, যেই দুটো ছোট বাচ্চার কাছে ‘মা’ অতীব গুরুত্বপূর্ণ। ‘মা’ হয়েও ন্যান্সি কি করে এত স্বার্থপর ও নৃশংস হতে পারলেন? কয়েকটি সংবাদপত্র প্রতিদিন বিভিন্ন পাতায় বড় বড় ছবি দিয়ে ন্যান্সির আত্মহত্যা-চেষ্টার আকর্ষণীয় ‘খবর’ পরিবেশন করছে। গত সোমবার একটি ট্যাবলয়েড সংবাদপত্র ‘আত্মহত্যা’র কারণ নিয়ে প্রথম পাতায় বেশ বড়সড় একটা রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। সেখানে লিখেছে, ন্যান্সি ইদানীং হতাশায় ভুগছিলেন, তার কারণ নাকি রাজনৈতিক হয়রানি! গত বছর বিএনপির পক্ষে ন্যান্সি একটি মন্তব্য করার পর থেকেই নাকি ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন মহলের প্ররোচনায় তার সংগীত জীবনের গতিপথ নানাভাবে হুমকির মুখে পড়ে। তার সংগীত প্রোগ্রাম কমে যাওয়া, স্টেজ শো-এর জোয়ারে ভাটা পড়া, রাত বিরেতে বাড়িতে পুলিশি হামলা ইত্যাদি। দ্বিতীয়বার বিয়ের পর থেকেই তার জীবনে (গত অক্টোবর) নেমে এসেছে রাজনৈতিক এবং পেশাগত প্রতিবন্ধকতা। এসবের জের ধরেই ন্যান্সির জীবনে যে হতাশা সৃষ্টি হয়েছে তারই পরিণতি নাকি এই ‘আত্মহত্যা’র চেষ্টা! কিছু কিছু পত্রিকায় নানা সময় একটি ঘটনাকে বিভিন্নভাবে রঙ দেয়ার চেষ্টা আমরা দেখতে পাই। নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী ‘খবর’কে অন্যখাতে প্রবাহের চেষ্টা তো খুব সাধারণ। সুতরাং ন্যান্সির আত্মহত্যা-চেষ্টার খবর নিয়েও নানা মহল নিজস্ব ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টাও আমরা দেখছি। ন্যান্সি যেভাবে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন, তাতে তিনি নাও বেঁচে ফিরতে পারতেন। কিছুদিন আগে মিতা নূর নামে এক অভিনেত্রী আত্মহত্যার মাধ্যমে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তার দাম্পত্য জীবনের টানাপড়েনের বিষয়টি নিজ-জীবন সংহারের নেপথ্য কারণ হিসেবে সংবাদপত্রে উঠে এসেছিল। ন্যান্সিও না ফেরার দেশে চলে যেতে পারতেন—বলা যায়, এটাই ছিল তার মূল লক্ষ্য। আর আমাদের জিজ্ঞাসাটা এখানেই। ‘জীবন’ নামক অমূল্য বস্তুটি কি মানসিক ঘোরে এতটাই ‘ঠুনকো’ হয়ে যায়? ‘জীবন সংগ্রাম’ বলে যে কথাগুলো আমরা প্রতিদিন শুনে শুনে পরিণত হই—তার কি মূল্য নেই এক কানাকড়িও? জীবনে যদি ব্যক্তি-পসার, আত্মপ্রচার বা অর্থের প্রাচুর্যই ‘সবকিছু’ হয়ে যায়, তবে জীবনপথে যারা চড়াই-উত্রাই পার করে চলছেন, গভীর অনিশ্চয়তায় যাদের কাটে শত সহস্র অন্ধকার রাত—তাদের কি তবে একমুঠো ঘুমের বড়ির মূল্যও জোটে না? তাদের কি মুক্তি পেতে ইচ্ছে করে না অন্ধকার অনিশ্চিত জটিল-কুটিল জীবনপথ থেকে? তারা কি বোকা? আরও একটা প্রশ্ন তাই ন্যান্সির কাছে—তিনি কি জানেন, যে অপরাধ তিনি করতে যাচ্ছিলেন, সেটা করা হয়ে গেলে তার শাস্তি থেকে তিনি রেহাই পেতেন, কিন্তু ‘আত্মহত্যা’ প্রচেষ্টা যখন ব্যর্থ হয়ে গেলো, তখন সেই চেষ্টাটি কি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসাবে চিহ্নিত হবে না? তার দুটি সন্তানও একদিন তাকে প্রশ্ন করতে পারে—‘মা! আমরা কি তোমার বোঝা হয়ে গিয়েছিলাম? কিংবা আমাদের কি তুমি সত্যিকার অর্থে ভালোবাসতে না? তুমি কি করে আমাদের ‘মাতৃহারা’ করার কথা ভাবতে পারলে?’ ন্যান্সি তো একজন উপার্জনক্ষম স্বাবলম্বী নারী। ন্যান্সির এই আত্মহত্যার চেষ্টা নারী সমাজকেও পরাজয়ের গ্লানিতে ডোবায়, নারীর মানসিক শক্তিকে ‘ভঙ্গুর’ হিসেবে প্রতিপন্ন করে, সার্বিকভাবে হেয় করে নারী জাতিকেই। মানসিক বিপর্যয় আসতেই পারে, তাকে মোকাবিলা করার ভিতরেই বীরত্ব। সেই শক্তি নারী জাতির সবচেয়ে বেশি আছে। ন্যান্সি যেন তা ভুলে না যায়।