হিংসা-কবলিত জীবন ও রাজনীতি

হিংসা মানব জীবনের কথিত ৭টি মারাত্মক দোষের মধ্যে জঘন্যতম। অন্য ৬টি হলো-অহমিকা, ক্রোধ, লোভ, আলস্য, অতিরিক্ত কামাসক্তি ও উদরসর্বস্বতা। মানুষ কেন একে অপরকে হিংসা করে? হিংসা মানব মনের একটি জটিল, দুর্বোধ্য আবেগ। আমরা জানি আবেগের গভীরতা অনুভূতির চেয়ে বেশি। অনেক সময়ে পরস্পরের নিকট একই জিনিস থাকা সত্ত্বেও দ্রব্যের গুণ, আকার, মান ও সেটি উপভোগের ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের আত্মতৃপ্তি দেখে কারো মনে হিংসার জন্ম হতে পারে। যেমন, ছোট শিশুদের মাঝে একই জিনিস সমান ভাগ করে দেবার পর তারা অন্যের জিনিসটির দিকেই বার বার তাকাতে থাকে। হিংসা কখনো সহনশীল আবার কখনো মারমুখী পর্যায়ে নেমে যেতে পারে। অ্যারিস্টটল (Aristotle)এর মতে, ‘হিংসা মানুষের মনে সৃষ্ট একটি মানসিক যন্ত্রণা, যা অন্যের সৌভাগ্য দর্শনে জন্ম লাভ করে।’ সাধারণত দেখা যায়, অন্যের চেহারা-ছুরত, চারিত্রিক গুণাবলী, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অবস্থান, যোগ্যতা, দক্ষতা, জনপ্রিয়তা কিংবা সমৃদ্ধি ইত্যাদির কারণেই মানুষের মনে হিংসার সূত্রপাত ঘটে। যখন কারো মনে এই বোধ জাগে যে, অন্য কেউ তার চেয়ে অনেক ভাগ্যবান, শিক্ষিত, স্মার্ট, সুদর্শন, আকর্ষণীয়, ভাল বক্তা, সুন্দর হাসির অধিকারী, মেধাবী, ধনবান, অর্থাত্ নিজের চেয়ে উত্তম যে কারো বিরুদ্ধেই মানুষের মনে হিংসার আগুন জ্বলে উঠতে পারে। বার্ট্রান্ড রাসেল (Bertrand Russel) এর মতে, ‘ মানব জীবনে অসুখী হওয়ার প্রধান একটি কারণ হলো হিংসা।’ আজকে রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে শান্তি নেই। কারণ, নেতাদের মনে সুখ নেই। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে গ্রহণ করে নেবার মতো জায়গা তাদের হূদয়ে নেই। মানুষের মাঝে হিংসা এবং ভালবাসার সম্পর্ক, পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে তৈরি হয়। একারণেই ঐতিহাসিকভাবে বংশ বা গোষ্ঠী পরম্পরায় তা বিরাজমান থাকে। বর্তমানে প্রচারণা বা মিডিয়ার মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে অপসমালোচনার মাধ্যমে হিংসার বিষ ছড়িয়ে থাকে। এমন কি দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে কখনো ভিনদেশের নেতা ও সরকরের বিরুদ্ধেও হিংসা-ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়াতে দেখা যায়। এধরনের হিংসা-বিদ্বেষ সময়ে সময়ে জাতিগতভাবেও প্রচার করতে দেখা যায়। একে আমরা হেট্রেড প্রোপাগান্ডা (hatred propaganda) বলে থাকি। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক সাংবাদিকতাও এখন জনমত গঠনে বিশেষ অস্ত্র হিসাবে ব্যবহূত হচ্ছে। যুদ্ধ বিগ্রহের সময়ে কোনো দেশ বা জাতি কিংবা স্বাভাবিক অবস্থাতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে টার্গেট করে অপপ্রচারের মাধ্যমে হিংসা ছড়াতে দেখা যায়। হিংসা, ঈর্ষা বা ঘৃণা কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা আদর্শের বিরুদ্ধে পরিচালিত হতে পারে। হিংসা মানব মনে ক্রোধের জন্ম দেয় এবং তা মানুষকে আক্রমণাত্মক করে তোলে। অনেক সময়ে পরিকল্পিতভাবে কোনো গোষ্ঠী বা দলের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়ে বিরূপ জনমত সৃষ্টি করে স্বার্থ হাসিল করা হয়। তারা ইংরেজি প্রবাদ ‘Give a dog a bad name and hang him’ মতবাদে বিশ্বাসী। এটাকে দোষারোপ খেলা পদ্ধতি (blame game) বলা হয়। এই নিন্দার খেলাটি বেশ সুপরিকল্পিতভাবেই বর্তমান রাজনীতির ক্ষেত্রে ব্যবহূত হচ্ছে। বর্তমানে বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে নির্দিষ্ট এজেন্ডা অনুযায়ী দোষারোপের ক্যাম্পেইন চালানো হয়। গণতন্ত্রের অন্যতম উপাদান জনমতকে কোনো দলের বা দেশের স্বার্থে উসকে দেয়ার কাজটি হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃণা এবং পরশ্রীকাতরতার মাধ্যম ছড়িয়ে দেয়া হয়। বর্তমান সমাজে মানুষের কথাবার্তা ও নেতা-নেত্রীদের বক্তৃতায় অহরহ পারস্পরিক ঘৃণা ও নিন্দার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে। সমালোচনার নামে এক গোষ্ঠী আরেক গোষ্ঠীকে রাবিশ, খবিশ বলে বাঁশ দিতেও দ্বিধা করে না। ভুঁইফোড় নেতারাও নিজ দলের বড় নেতাকে খুশি করার জন্য অন্যদলের নেতা-নেত্রীদের ব্যক্তিগত জীবন কালিমালিপ্ত করতে কসুর করে না। তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও খোঁচাখুঁচিতেই যেন তাদের আনন্দ। এখন আর কেউ রাজনীতির বাইরে থাকতে পারে না। উদারনৈতিক চেতনার অভাবে রাজনীতি আমাদেরকে একতাবদ্ধ না করে দলে দলে বিভক্ত করে দিচ্ছে। পরশ্রীকাতরতা, পরনিন্দা, অপসমালোচনা, অপবাদ, টকশো, লেখালেখি অথবা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে সমর্থকদের মাঝে হিংসা ছড়িয়ে দেয়া হয়। যারা এ সকল বক্তব্য গ্রহণ করে, বিশ্বাস করে তারাও ক্রমান্বয়ে ঐ গোষ্ঠী বা সমর্থক দলের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। এভাবে কোনো কোনো সময়ে একটি দল আরেকটি দলের বিপরীতে অথবা সম্পূর্ণ দেশ বা জনগোষ্ঠী আরেকটি দেশের শত্রুতে পরিণত হয়ে যায়। ঠিক একইভাবে বন্ধুত্বসুলভ প্রচারণার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দেশ বন্ধুতে পরিণত হয়ে যায়। দার্শনিক ক্যান্ট (Immanuel Kant)এর মতে, হিংসা হলো অন্যের ভাল অবস্থার প্রতি দুঃখী কৃপণের দৃষ্টিতে তাকানোর একটি প্রবণতা। এটি অন্যকে নিজের ভাল অবস্থানের কাছাকাছি আসতে না দেয়ার মতো একটি মানসিকতা। নিজেরা কতটা ভাল আছি আমরা তা নিরূপণের মানদণ্ড নির্ধারণ করি অন্যেরা আমাদের চেয়ে কতটা ভাল বা মন্দ আছে তার উপর লক্ষ্য রেখে। অথচ, আমাদের উচিত নিজের অবস্থানেই নিজেদেরকে সুখী ভাবা। হিংসা (envy) এবং পরশ্রীকাতরতা (Jelousy) কারো কারো মনে একই সময়ে বিরাজ করতে পারে। তবে দুটোই মানুষের জন্য অকল্যাণকর ও ধ্বংসাত্মক। ধরা যাক, দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে পারস্পরিক হিংসার সম্পর্ক বিরাজমান। এখন তৃতীয় আরেকটি দল এদের যার সাথেই ভাব করতে আসবে সে অন্য দলের ঈর্ষায় পতিত হবে। হিংসুক শুধু তার প্রতিপক্ষকেই টার্গেট করে; ঈর্ষাকারী তার প্রতিপক্ষ এবং ইপ্সিত ব্যক্তি বা দলকেও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। নিজেদের কামড়াকামড়িতে কাম্যবস্তু বা ক্ষমতা প্রতিপক্ষের হাতে না গিয়ে অন্যের কাছে চলে গেলে কোনো দুঃখ থাকে না তাদের মনে। অন্যের যা আছে আমার তা নেই কেন? আমি কেন তার মত সুখী, ধনবান, ক্ষমতাবান, জনপ্রিয় নই? অন্যের ভাল দেখে মানুষের মনে ঈর্ষার সৃষ্টি হয়ে থাকে। তবে, কারো মনে যদি ইতিবাচকভাবে ঈর্ষা জেগে ওঠে তখন সুস্থ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সে নিজেকে যোগ্যতর করার প্রচেষ্টা চালায়। আর, তা নেতিবাচক হলে ঈর্ষণীয় ব্যক্তিকে প্রতিপক্ষ মনে করে তার ক্ষতি বা অমঙ্গল কামনায় এগিয়ে যায়। বঙ্কিম চন্দ্রের ভাষায়-‘সূর্যমুখীর উপর আমার এত রাগইবা কেন? সে ত কখন আমার মন্দ করে নাই;বরং ভালই বাসে, ভালই করে। তবে রাগ কেন? তা কি হীরা জানে না? হীরা না জানে কি? কেন বলবো? সূর্যমুখী সুখী, আমি দুঃখী, এজন্য আমার রাগ। সে বড়, আমি ছোট, সে মনিব, আমি বাদী। সুতরাং তার উপরে আমার বড় রাগ। যদি বল, ঈশ্বর তাকে বড় করিয়াছেন, তার দোষ কি? আমি তার হিংসা করি কেন? তাতে আমি বলি, ঈশ্বর আমাকে হিংসুক করেছেন, আমারই বা দোষ কি?’ অন্যের সুখ-শান্তি-আনন্দ-বেদনা আমাদেরকে আলোড়িত করে। আমরা শুধু নিজের মধ্যেই নিজেকে নিয়ে সীমাবদ্ধ থাকতে পারি না। কিছু মানুষ কখনো কখনো অন্যের অনিষ্ট বা দুর্নাম রটিয়ে আনন্দ উপভোগ করে। একইভাবে অন্য কিছু মানুষ নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে পরোপকারে সুখ খুঁজে পায়। যেকোনো সরকারের উন্নয়নমূলক কাজ সাধারণত বিরোধী দলের পছন্দ হয় না। আবার নিজেরা ক্ষমতায় গেলে বিরোধী দলের সমালোচনা সহ্য করা যায় না। এক দল সরকারে থাকতে যা-যা কাজ করেছে অন্যদল সরকারে গিয়ে সেই সকল কাজ করতে থাকলে নিজেদের ভেতরটা জ্বলে যায়। হিংসা কোথা থেকে আসে, কেন আসে তা অনেক সময়ে হিংসুক নিজেই জানে না। সাধারণত দেখা যায়, যাদের মধ্যে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তীব্র তারাই হিংসার আগুনে জ্বলতে থাকে বেশি। অন্যের মাঝে নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার প্রবণতা যার মধ্যে বেশি তার মনে হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃণা ইত্যাদি বাসা বাঁধতে পারে না। হিংসার বীজ জন্মলাভ করে মানুষের অন্তরে। হূদয়ের গভীরে। একজন হিংসুকের সবকিছু থেকেও যেন কিছু নেই। অন্যের কিছু থাকাটাই তার কাছে নিজের না থাকার সামিল। অন্যের যদি কিছু না থাকে তাতে তার কোনো ক্ষতি নেই-দুঃখ নেই। নিজের কিছু না থাকলেও ক্ষতি নেই। কেবল নিজের চেয়ে অন্যের সামান্য কিছু বেশি থাকাটাই সে সহ্য করতে পারে না। ক্ষমতার বাইরে সে অতিমাত্রায় গণতন্ত্রী। ক্ষমতার ভেতরে এলেই সে হয়ে ওঠে স্বৈরাচারী। অন্যের ভাল থাকাটাই তার সকল দুঃখের কারণ। হিংসা, ঘৃণা, অপবাদ, অপপ্রচার, গীবত ইত্যাদি এখন রাজনৈতিক অস্ত্র হিসাবে ব্যবহূত হয়। প্রধান নেতার আশ-পাশে বেশ কিছু হাইব্রিড নেতা গজিয়ে ওঠে যাদের কাজ হলো নিজের নেতার জয়গান করা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী নেতাদের চরিত্র মসীলিপ্ত করা। এসকল নেতাদের প্রভাবে প্রধান নেতা মোহগ্রস্তের মতো আচরণ করতে থাকে। ধূর্ত, মৌসুমী নেতারা নিজের স্বার্থে প্রধান নেতাকে প্রীত করার জন্য চাপাবাজি, ভাওতাবাজি ও ভণ্ডামির আশ্রয় নিয়ে থাকে। সকল সময়ে এধরনের কিছু চাটুকার উপদেষ্টা, ছোটনেতা থাকে যারা প্রধান নেতাকে খুশি করে, বিভ্রান্ত করে নিজেদের ভাগ্য বদল করে নেয়। তারা পরনিন্দা, পরচর্চা, অপবাদ, অপপ্রচার, হিংসা, বিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়িয়ে মানুষের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করে থাকে। প্রধান নেতাদের অবশ্যই এসকল ভেলকিবাজদের পরিহার করতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে হেয়, অবহেলা অথবা ছোট করার জন্য মানুষ ঘৃণা ছড়িয়ে থাকে। বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য, মিথ্যা বা অপপ্রচারের মাধ্যমে কোনো দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করা বর্তমানে একটি রাজনৈতিক কৌশল। মিডিয়ার মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে জেনেশুনে অপবাদ রটানো হয়ে থাকে। বার বার কোনো মিথ্যা ভাষণ শুনতে শুনতে অন্তত কিছু মানুষ একটা সময়ে এসকল মিথ্যা ও গুজব কিছুটা পরিমাণে হলেও সত্য বলে গ্রহণ করে নেয়। নানাবিধ ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, গোষ্ঠীগত ও রাজনৈতিক বিশ্বাস মানুষকে পারস্পরিক হিংসা, ঘৃণা ও বিভক্তির পথে ঠেলে দেয়। মহান দার্শনিক, ধর্মগুরু বা আদর্শবাদী সত্ রাজনীতিকগণ এসকল সামাজিক স্তর-বিভাগের ঊর্ধ্বে উঠে সবাইকে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের আদর্শে ডাক দিয়ে থাকেন। তাতে সমাজে শান্তি ও স্থিতি আসে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রাজনীতিকগণ নিজের দলের বাইরে কাউকে সহ্য করতে পারে না। এমনকি অন্য দলের বা ভিন্ন মতাদর্শে বিশ্বাসী কারো সাথে কখনো কখনো ব্যবসায়িক বা আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হতে গেলেও নিজের দলের লোকদের সন্দেহের চোখে দেখা হয়। এখন কোনো কোনো স্থানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি হিংসা ও ঘৃণা প্রকাশ করা দলীয় দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এক দলের সদস্য হয়ে অন্য দলের সাথে ওঠাবসা করলে তার পেছনে লোক লাগানো হয়। প্রয়োজনে সতর্কও করা হয়। আমরা বুঝতে চাই না এই দেশটা আমাদের সকলের। দেশের স্বার্থে কাজ করার অধিকার সকলেরই আছে; যার যেমন করে। একাধিক সন্তানের মাতা মাঝে মাঝে ফাঁপরে পড়ে যায় যখন ‘আমার আম্ম’ু,‘আমার আম্ম’ু বলে সকল সন্তান তাকে নিজের দিকে টানতে থাকে; অন্য সহোদরদের অধিকার কিছুতেই তারা মানতে চায় না। এখন আমাদের দেশমাতৃকার অবস্থাও ঠিক তাই। সবাই মায়ের একমাত্র সেবক হতে চায়। অথচ আমাদের সমাজে-রাজনীতিতে যদি হিংসা, বিদ্বেষ, ঈর্ষা ইত্যাদির কর্ষণ ও পরশ্রীকাতরতার চর্চা না থাকতো তাহলে কতই না সুন্দর হতো আমাদের এই দেশটা। লেখক :অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল