পাসের হার এবং মুদ্রার উল্টো পিঠ
প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০১৪, ২১:২৪
গতবারের তুলনায় এবার ৪.০৩ শতাংশ শিক্ষার্থী বেশি পাস করেছে উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষায়। পাসের হার প্রতিবছর বাড়তেই থাকবে এবং আমরা ঐদিনের অপেক্ষায় আছি যেদিন অকৃতকার্য বলে আমাদের পাবলিক পরীক্ষায় কিছু থাকবে না। তবে সেটি যাতে লোক দেখানো বা শুধুমাত্র কাগজে-কলমে না হয় সেটিই প্রত্যাশা করছি। শিক্ষা ও পরীক্ষার মান নিয়ে প্রতিবছরই কথা ওঠে। ওঠার কারণও রয়েছে যথেষ্ট। ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ৭০ শতাংশ জিপিএ-৫ পাওয়া ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা অকৃতকার্য হয়েছে। ২০১২ ও ২০১১ সালের ভর্তি পরীক্ষায় যথাক্রমে ৫৫ শতাংশ ও ৫২ শতাংশ শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছিল। ভর্তি পরীক্ষায় সাধারণত শিক্ষার্থীদের প্রকৃত অবস্থা অনেকটাই ফুটে ওঠে। এ বিষয়টি পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলকে পুরোপুরি প্রশ্নের সম্মুখীন করে দিয়েছে। বিষয়টি গভীরভাবে ভেবে দেখা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে। পাস করা শিক্ষার্থীদের অবশ্যই ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাই। অকৃতকার্যদের জন্য সমবেদনা জানাই আর বলতে চাই : ‘ফেইলার ইজ দি পিলার অফ সাকসেস।’ জীবনে কার কিভাবে প্রতিষ্ঠা আসবে তা শুধুমাত্র এই পরীক্ষার ফলাফল দ্বারা নির্দেশিত হয় না। তারপরেও জাতীয় পরীক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এটিকে বিশেষ গুরুত্বসহকারে দেখতে হবে সংশ্লিষ্ট সবাইকে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নতুন শিক্ষা পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা অভ্যস্ত হয়ে ওঠায় পরীক্ষার্থীরা ভাল করেছে বলে মনে করছেন অনেকে। এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় গড় পাসের হার এবার ৭৮.৩৩ শতাংশ। হোঁচট খেয়েছিল। ২০১২ সালে যেখানে পাস করেছিল ৭৮.৬৭ শতাংশ, ২০১৩ সালে সেখানে পাসের হার ছিল ৭৪.৩০ শতাংশ। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণেও এরকম হয়েছে অনেকটা। এটি ঠিক। ২০১৩ সালে জাতীয়ভাবে হরতালসহ নানা রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে ৮টি পরীক্ষা নির্ধারিত তারিখে অনুষ্ঠিত হয়নি। শিক্ষার্থীরা ঝুঁকি নিয়ে পরীক্ষা দিয়েছিল। বারবার পরীক্ষা পেছানোর কারণে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ নষ্ট হয়েছিল। এবার সব পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছিল নির্বিঘ্নে। তাই দেশের রাজনীতিবিদদের উচিত রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলো যাতে জাতীয় কোন স্বার্থের বিরুদ্ধে না যায়। শিক্ষার্থীরা তাদের কাছ থেকেই তো শিখবে কিভাবে জীবনে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হয়।
২০১৪ সালে সবচেয়ে ভাল করেছে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড। আলিম পরীক্ষায় পাসের হার ৯৪.০৮ শতাংশ, এইচএসসি ও সমমানে ৭৮.৩৩ শতাংশ। গতবার এই হার ছিল ৯১.৪৬ শতাংশ। অন্যদিকে ছাত্র-ছাত্রীদের পাসের হারে মাদ্রাসা বোর্ডের শিক্ষার্থীরা প্রায় সমান। ছাত্রদের পাসের হার ৯৪.২০ শতাংশ আর ছাত্রীদের ৯৩.৯০ শতাংশ। তবে মাদ্রাসার ছাত্রীদের তুলনায় ছাত্রদের জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা অনেক বেশি। এটি অবশ্য সাধারণ ধারায়ও ঘটেছে। মাদ্রাসা বোর্ডে এক হাজার ৮১৩ ছাত্রী জিপিএ-৫ পেয়েছে আর ছাত্রদের মধ্যে পেয়েছে ৪ হাজার ২১২ জন। মাদ্রাসা বোর্ডের ফলাফলে আমাদের সন্তোষ প্রকাশ করা উচিত।
শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন- নানা ধরনের উদ্যোগের ফলে পরীক্ষার ফল ভাল হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, সৃজনশীল পদ্ধতি চালু ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞ শিক্ষকদের দিয়ে ক্লাস নেয়া। সেরা শিক্ষকদের ক্লাস বিটিভিতে প্রচার, ইংরেজি ও গণিতে আলাদা ক্লাস নেয়ায় ইতিবাচক ফল পাচ্ছি আমরা। বর্তমানে যেভাবে প্রশিক্ষণ হচ্ছে তা আগে ছিল না। সৃজনশীলে একাধিকবার মিলিয়ে দশ লাখ শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। দুর্বল শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে এগার লাখেরও বেশি অতিরিক্ত ক্লাস নেয়া হয়েছে। এতে একদিকে শিক্ষকদের, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বেড়েছে। ২০১২ সালে একটি বিষয়ে, ২০১৩ সালে সাতটি বিষয়ে এবং এবার তেইশটি বিষয়ে সৃজনশীল পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেয়া হয়। শিক্ষার্থীরা সৃজনশীল প্রশ্নে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। এ বিষয়গুলোর সাথে আমরা একমত পোষণ করছি। বর্তমানে বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষকরা যেহারে প্রশিক্ষন পাচ্ছেন পূর্বে তা ছিল না। আমরা যদি এ ব্যাপারগুলোতে আরও একটু যত্নবান হই তা হলে অবশ্যই আমরা সত্যিকার অর্থে সামনে এগিয়ে যেতে পারব।
লেখক: প্রোগ্রাম ম্যানেজার, ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচি ও ভাইস প্রেসিডেন্ট