ফিরে দেখা

২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা

দেশের প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে এমন বিপরীতমুখী অবস্থান নিয়ে আছে যা থেকে এটা স্পষ্ট যে, দেশে রাজনৈতিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠা এবং সাংঘর্ষিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির দ্রুত অবসান ঘটার সম্ভাবনা খুবই কম। নেতাদের কথাবার্তা শুনে এবং বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখে মনে হয় তারা এক পক্ষ আরেক পক্ষকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার চেয়ে শারীরিকভাবে ‘নিশ্চিহ্ন’ করতেই যেন বেশি উত্সাহী। নানা তথ্য-উপাত্ত হাজির করে এটা বলা যায় যে, ‘নিশ্চিহ্ন’ করার রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপি এগিয়ে আছে। দুই দলের জন্ম প্রক্রিয়াতেই এমন কিছু গুণগত পার্থক্য আছে যার জন্য হত্যা-ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে বিএনপির সঙ্গে সমানতালে এগিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে আওয়ামী লীগের আরো অনেক সময় লাগবে। বিএনপির নিশ্চিহ্নকরণ রাজনীতির একটি বড় দৃষ্টান্ত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনা। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে নৃশংস গ্রেনেড হামলা চালানো হয়েছিল। মূলত আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্যই ওই গ্রেনেড হামলা চালানো হলেও তিনি সৌভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যান। তবে আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভী রহমানসহ কমপক্ষে ২৩ জন নেতা-কর্মী নিহত হন। শেখ হাসিনাসহ অসংখ্য নেতা-কর্মী গুরুতর আহত হন। এদের অনেকেই সারা জীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। কেউ কেউ এখনো শরীরে অসংখ্য স্প্লিন্টার নিয়ে দুঃসহ জীবন-যাপন করছেন। ২১ আগস্টের বীভত্স হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে একটি কলঙ্কময় অধ্যায় হিসেবেই চিহ্নিত থাকবে। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার সময় ক্ষমতায় ছিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। দেশে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে প্রাথমিকভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা সরকারের দায়িত্ব। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার মতো এতবড় অপরাধ যারা করেছিলো তাদের চিহ্নিত করা, গ্রেপ্তার করা এবং আইনের হাতে সোপর্দ করার জরুরি কর্তব্যটি তত্কালীন সরকার সম্পাদনে কেবল চরমভাবে ব্যর্থতারই পরিচয় দেয়নি, বরং ঘটনা প্রবাহ অন্যখাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টাই চালানো হয়েছে। অপরাধীরা যাতে নিরাপদে থাকতে পারে কৌশলে সেই চেষ্টাই করা হয়েছে। নিরপরাধ নিরীহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে নিষ্ঠুর নির্যাতন চালানো হয়েছিল। সাধারণ মানুষের চোখে ধূলা দেয়ার জন্যই যে অপপ্রয়াস বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার নিয়েছিল তাতে আজ আর কোনো সন্দেহ নেই। এখন এটা অনেকের কাছে পরিষ্কার হয়েছে যে, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনার সঙ্গে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সংশ্লিষ্টতা ছিল। গ্রেনেড হামলার ঘটনায় দায়ের করা দুটি মামলায় যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের দেয়া তথ্য থেকেই জানা যায় যে, হামলাকারীদের সঙ্গে তত্কালীন সরকারের একাধিক মন্ত্রী এবং গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের যোগাযোগ ছিল। সে সময়ে ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ‘হাওয়া ভবনে’ তারেক রহমান ও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবরের উপস্থিতিতে হামলায় প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারীদের সাথে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল বলেও তথ্য পাওয়া গেছে। কিন্তু এটাও আমাদের জানা আছে যে, তখন সরকার জজ মিয়া নামের একজন ছিঁচকে অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল। সরকার তখন শৈবাল সাহা পার্থ নামের একজনকে গ্রেপ্তার করেও নাটকীয়তার জন্ম দিয়েছিলো। ২১ আগস্টের হামলার দায়িত্ব স্বীকার করে এবং শেখ হাসিনাকে হত্যার হুমকি দিয়ে সংবাদপত্রে একটি ই-মেইল বার্তা পাঠানোর সূত্র ধরে পার্থকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পার্থই ওই ই-মেইল বার্তাটি পাঠিয়েছিলো তার কোনো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া না গেলেও সম্পূর্ণ অনুমানের উপর নির্ভর করে পার্থ সাহাকে পুলিশ ধরে নিয়ে প্রথম চারদিন অজ্ঞাতবাসে রাখে এবং পরে তিন দফা রিমান্ডে নিয়ে তার ওপর প্রচণ্ড শারীরিক-মানসিক নির্যাতন চালায়। দরিদ্র বাবা-মায়ের সন্তান পার্থ সাহা একজন মেধাবী ছাত্র ছিলেন। অত্যন্ত কষ্ট করে উচ্চশিক্ষা শেষে যখন চাকরি খুঁজছিলেন, তখনই তার ওপর নেমে আসে জোট সরকারের ভয়াবহ থাবা। পার্থ সাহার প্রথম অপরাধ তিনি ‘হিন্দু’ এবং দ্বিতীয় অপরাধ তিনি ভারতের মাদ্রাজে গিয়ে বিবিএ ও এমবিএ পাস করেছেন। এমন একজন মানুষ ‘র’-এর এজেন্ট না হয়ে পারেন! তার কাছ থেকে যেমন সন্দেহজনক কোনো গোপন তথ্য পাওয়া যায়নি, তেমনি মারপিট করে প্রায় পঙ্গু বানিয়েও কোনো স্বীকারোক্তি আদায় করা সম্ভব হয়নি। তা সত্ত্বেও সরকারিভাবে তাকে ‘র’-এর এজেন্ট বানিয়ে প্রচারের কোনো কমতি দেখা যায়নি। ই-মেইলে হুমকি দেয়ার জন্য অন্য কাউকে সন্দেহের তালিকায় না এনে পার্থর ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো থেকেই বোঝা গিয়েছিলো জোট সরকার ২১ আগস্টের ঘটনা তদন্তে কোন নাটকের মহড়া দিতে চেয়েছে। কোনো ঘটনা ঘটলেই তার দায় বিরোধী দলের ওপর চাপানো ছিলো জোট সরকারের একটি বদঅভ্যাস। ২১ আগস্টের ঘটনার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ২২ আগস্ট, ২০০৪ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের এক সমাবেশে সংগঠনের তত্কালীন সাধারণ সম্পাদক আজিজুল বারী হেলাল বলেছিলেন, শেখ হাসিনা এবং সাবের হোসেন চৌধুরীকে রিমান্ডে নিলেই প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটিত হবে! এ ধরনের বালখিল্য মন্তব্যের জন্য বিএনপি নেতারা ছাত্রদল নেতাকে তিরস্কৃত তো করেনইনি উল্টো নিজেরাও ওই ধারায় গলাবাজি করেছেন। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর বলেছিলেন, ‘উই আর লুকিং ফর শত্রুজ’। তারপর ৩০ আগস্ট, ২০০৪ বিএনপি আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশে দলের তত্কালীন মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভুঁইয়াসহ কয়েকজন মন্ত্রী ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার জন্য আওয়ামী লীগকেই দায়ী করেন। তত্কালীন শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী আমানুল্লাহ্ আমান ওই সমাবেশে বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক তদন্ত চাচ্ছেন। আমরা সবধরনের তদন্ত করবো। খুব তাড়াতাড়িই তদন্ত রিপোর্ট দেবো। ওই রিপোর্টে গ্রেনেড হামলার জন্য আব্দুস সামাদ আজাদ, মোহাম্মদ নাসিম, সাবের হোসেন চৌধুরী, তোফায়েল আহমেদ এবং মতিয়া চৌধুরীকে দায়ী করা হবে।’ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা নিয়ে বিএনপি যে কত ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা ফেদেছিলো সেটা আমানুল্লাহ্ আমানের বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়। তদন্ত না হতেই তদন্ত রিপোর্টে কি থাকবে সেটা একজন প্রতিমন্ত্রী বলার পর ওই তদন্ত রিপোর্ট সম্পর্কে মানুষের মনে কি ধারণা হয় সেটা বোঝার ক্ষমতাও জোট সরকারের মন্ত্রীদের ছিল না। বেগম জিয়া নিজেও গ্রেনেড হামলার কথা বলতে গিয়ে খুব দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পেরেছিলেন সেটাও বলা যায় না। ২ সেপ্টেম্বর, ২০০৪ বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক সমাবেশে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গ্রেনেড হামলার ঘটনাকে ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে অভিহিত করে বলেছিলেন, সরকারের সাফল্যকে আড়াল করতে ‘বোমা’ হামলার ঘটনা ঘটানো হয়েছে। বেগম জিয়ার এই বক্তব্য দেশের মানুষকে হতবাক করেছে। শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা এবং আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতা-কর্মীকে হত্যা করা হয়েছিলো সরকারের সাফল্যকে আড়াল করতে-এমন বক্তব্য সরকার প্রধানের মুখ থেকে বের হওয়ার পর ২১ আগস্টের ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত যে হবে না সেটা তখন সবার কাছেই স্পষ্ট হয়েছিলো। বাস্তবে ঘটেছিলও তাই। জোট সরকার ক্ষমতায় থাকতে তদন্ত কাজ অগ্রসর হয়নি, বরং প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করার জন্য সবকিছু ধামাচাপা দেয়ার কসরত্ই চালানো হয়েছিলো। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন বর্তমান সরকারের সমালোচনায় অত্যন্ত মুখর। তিনি এই সরকারের কোনোকিছুই ভালো দেখেন না। একজন রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে সরকারের ভুলত্রুটির সমালোচনা করার অধিকার তাঁর আছে। কিন্তু তিনি যখন ঢালাওভাবে সরকারের সমালোচনা করেন তখন বিনীতভাবে জানতে ইচ্ছে হয়, তিনি কি আয়নায় নিজের মুখ দেখেন? নিজ শাসনামলে দেশ কেমন চলছিলো সেসব কি তাঁর মনে আছে? তিনি কি একবার ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের সংবাদপত্রগুলোর পাতায় চোখ বুলিয়ে দেখবেন? ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলাসহ অসংখ্য বোমা হামলার ঘটনা এবং দেশ জুড়ে জঙ্গি গোষ্ঠীর উত্থানের ঘটনাগুলোর কথা মনে পড়লে তার তো বর্তমান সরকারের লাগামহীন সমালোচনা করার কথা নয়। রাজনীতিতে মতভিন্নতা থাকাটাই স্বাভাবিক। সব শিয়ালের এক রার মতো সব রাজনৈতিক দলের এক রা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। নানা মতের, নানা পথের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করবে-এটাই গণতন্ত্রের রীতি। কিন্তু মত ও পথের ভিন্নতার জন্য সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের পরিবেশ নষ্ট হওয়াটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। অথচ আমাদের দেশের রাজনীতিতে পরমতসহিষ্ণুতার অভাব অত্যন্ত প্রকটভাবেই লক্ষ্য করা যায়। রাজনীতিবিদদের অসহিষ্ণু মনোভাবের কারণে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা ক্রমাগত বাড়ছে। বেগম জিয়া নিজের শাসনামলের ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য একবারও দেশবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ না করে বর্তমান সরকার আমলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা কিংবা আইনের শাসনের অভাব নিয়ে কথা বলেন তখন দেশের মানুষ সে বক্তব্য খুব ভালোভাবে গ্রহণ করে বলে মনে হয় না। সমালোচনা যদি বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যনির্ভর না হয় তাহলে সেটা মানুষের কাছেও বিশ্বাসযোগ্য হয় না। গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি। ফলে সংসদীয় রাজনীতিতে এখন বিএনপির কোনো ভূমিকা নেই। তার মানে অবশ্য এটা নয় যে, বিএনপি ভবিষ্যতেও জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেবে না। সেই নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী না করেও বিএনপির চেয়ারপারসনের কাছে দেশের মানুষ জানতে চাইতে পারে, আগামীতে তিনি তাঁর সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে ক্ষমতায় গেলে দেশে প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির চর্চা বন্ধ করবেন কি? এখনই তিনি যেভাবে হুমকি-ধামকি দিচ্ছেন তা থেকে তো মনে হয় ক্ষমতায় গেলে দেশে আবার বিরোধী রাজনীতি দমনের নামে নিষ্ঠুর ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হবে। তার কাছে আরও জানার বিষয় যে, তিনি ক্ষমতায় গেলে বর্তমান সরকার যেসব বিচার কাজ শুরু করেছে সেসব অব্যাহত থাকবে কিনা? যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ কি চলবে? যাদের ইতিমধ্যে দণ্ড দেয়া হয়েছে তা কি কার্যকর করা হবে? ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা কিংবা দশ ট্রাক অস্ত্র আটকের মামলারই বা পরিণতি কি হবে? দেশে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটেছিলো তার শাসনামলে। অথচ তিনি আগেও বলেছেন, এখনো বলছেন যে, দেশে কোনো জঙ্গি নেই। জঙ্গিদের তিনি আড়াল করতে চান কেন সেটা একটি রহস্য বৈকি! আবার ক্ষমতায় গেলে জঙ্গিদের প্রশ্রয় দেবেন কিনা সেটা তাঁর স্পষ্ট করে বলা দরকার। বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় থাকতে দেশে বোমাবাজি-সন্ত্রাস-সহিংসতাসহ যত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটেছে তার কোনোটার দায়ই তারা এড়াতে পারবে না। আগামীতে ক্ষমতায় যাওয়ার আগে এই দায় থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় বিএনপিকে খুঁজে বের করতে হবে। লেখক :সাংবাদিক ও কলামিস্ট bibhu54@yahoo.com