পরিবেশ
মানুষের জীবনে বৃক্ষের অবদান
প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০১৪, ২০:৪১
কৃতিত্বময় জীবনের অধিকারী হতে চায় সব মানুষ। অন্যের কৃতিত্বে গা জ্বললেও মূল কৃতিত্বটাকে সবাই পছন্দ করে। কৃতিত্বের অধিকারী হতে হলে মানুষকে অনেক কিছু করতে হয়। কৃতকর্মা হওয়ার জন্য যে সব জিনিসকে মানুষ নমুনা হিসেবে গ্রহণ করতে পারে, তার একটি হলো বৃক্ষ। বৃক্ষের দু’টি দিক মানুষের জন্য জীবন্ত আদর্শ। একটি বীজের বৃক্ষ হওয়া পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ের ভাঁজে ভাঁজে বিছানো আছে বহু শিক্ষা, বহু গ্রহণীয় বিষয়। বৃক্ষ নিজের উদ্গমলগ্ন থেকে পরিণত পর্যায় পর্যন্ত সব ধরনের পক্ষপাত থেকে মুক্ত থাকে। বৃক্ষ নিজের অস্তিত্ব বিকাশায়নে কারো সঙ্গে পক্ষপাতের আচরণ করে না। একটি বৃক্ষ অপর এক বৃক্ষের বীজ থেকে জন্মগ্রহণ করে। ধীরে ধীরে সে বেড়ে উঠে সম্পূর্ণ পক্ষপাতহীনভাবেই। বেড়ে উঠার পথে সে বহু জিনিস থেকে সহযোগিতা নেয়, শক্তি সঞ্চয় করে। এতে তার কোনো সঙ্কোচ নেই, নেই অভিমান ও পক্ষপাত। সে সূর্য থেকে আলো গ্রহণ করে। আকাশ ও মেঘ থেকে সঞ্চয় করে পানি। বায়ুমণ্ডল থেকে বাতাস টেনে নেয়। জমি থেকে চুষে নেয় মাটি ও উর্বরতা। এসব জিনিসের দানে ও অবদানে ক্রমে বিকশিত হয় একটি বৃক্ষ। ফলে একটি নগণ্য বীজ একটি বিশাল ছায়াবিস্তারী বৃক্ষে পরিণত হয়। এ দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় কোনো বৃক্ষ বড়াই ও পক্ষপাতের আশ্রয় নেয় না। অন্যথায় কখনো একটি বীজ বৃক্ষ হতে পারতো না। মানুষ ও উদ্ভিদের পরস্পরের দেহোপযোগী সামগ্রীর জন্য একে অন্যের উপর নির্ভরশীল। মানুষ শ্বাস-প্রশ্বাসের সময় কার্বন-ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করে এবং অক্সিজেন গ্রহণ করে। পৃথিবীতে বৃক্ষের পরিমাণ হ্রাস পেতে থাকলে এক সময় মানুষের নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হবে বলে মন্তব্য করেছেন বিজ্ঞানীরা। মানুষও যদি বৃক্ষের মতো সব ধরনের হিংসা-বিদ্বেষ ও পক্ষপাতের পক্ষাঘাত ব্যাধি থেকে মুক্ত সেবা করে যায় এবং বৃক্ষের মতো নিজের স্বভাব গড়তে পারে, তা হলেই সে অর্জন করতে পারে মহত্ত্ব ও মর্যাদা, লাভ করতে পারে উত্তম প্রতিদান, পেতে পারে আখেরাত-জগতের ফলে-ফুলে ভরা জান্নাতের বাগান।
জীবন ও জাতির বিনির্মাণে আমাদের লাউয়ের লতার মতো ছড়ালে হবে না, বাড়তে হবে গাছের মতো শক্ত মাটিতে শেকড় চালিয়ে, দীর্ঘ জীবনের আশায় বুক বেঁধে। লাউয়ের লতা দিনে দিনে বাড়ে। মাসের ভেতরেই ছড়িয়ে পড়ে বিশাল জায়গা জুড়ে। কিন্তু মাসের ভেতরেই আবার শুকিয়ে মরে যায়। প্রথম লাফে যত দীর্ঘ জায়গাই পার হোক সে মাসখানেকের ব্যবধারে তাকে দেখা যায় মানুষের পায়ের তলায় দলিত হতে। পক্ষান্তরে গাছ বাড়ে খুব ধীরে। বছরের পর বছর পার হয়ে বড় হয় একটি বৃক্ষে। সে পরিমাণে তার শেকড়ও মজবুত হতে থাকে মাটির পেটে। গাছ উপরে যতটুকু বাড়ে, ততটুকু তার শেকড়ও ছড়িয়ে পড়ে মাটির ভাঁজে ভাঁজে। সে শেকড় মাটির গভীর থেকে নিজের খোরাক সঞ্চয় করে। এসব চেষ্টা ও কৌশলের পরেই একটি বৃক্ষ বিকশিত হয়ে বেঁচে থাকে বছরের পর বছর, এমনকি শতাব্দীর পর শতাব্দী। তেমনিভাবে মানুষের জীবন ও জাতির স্থায়ী নির্মাণে বিস্তৃতির চেয়ে দৃঢ়তাই বেশি প্রয়োজন। দৃঢ়তা ছাড়া বিস্তৃতি মানে ভিত্তিহীন ঘর। আর ভিত্তিহীন ঘরের মতো জীবন গড়লে কাঙ্ক্ষিত সফলতা অধিকারে তো আসেই না , বরং তাতে রয়ে যায় ফাঁক ও ফাঁকি।
মানুষের জীবনে গ্রহণ করতে হয় গাছের জীবন বিকাশের ধীর অথচ দৃঢ় ধারাটি। আমরা যদি জীবনের শক্তিশালী ও স্থায়ী নির্মাণ চাই, তা হলে কষ্ট, সাধনা ও ধৈর্যের পাহাড় ডিঙ্গাতে হবে। জীবনকে যদি শিশুদের খেলাঘর মনে করি, তাহলে মুহূর্তে তা গড়া যাবে ঠিক, কিন্তু আবার মুহূর্তেই তা ভেঙে পড়বে। গড়তে যত না সময় লাগে, তার চেয়ে অনেক কম সময়ে তা মিশে যাবে মাটির সঙ্গে।
লেখক : সাংবাদিক