দুর্ঘটনা
নৌদুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান
প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০১৪, ২০:৫৯
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথে যে সকল মর্মান্তিক লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটে থাকে তার কারণ হিসেবে যেকোনো একটি বিষয়কে চিহ্নিত করা কষ্টসাধ্য। বরং, একেকটি নৌদুর্ঘটনার পিছনে ফিটনেসহীনতা থেকে শুরু করে চালকের অদক্ষতা পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের অজ্ঞানতা, অসতর্কতা এবং সর্বোপরি দায়িত্ববোধের অভাবজনিত কারণ বিদ্যমান।
এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য লঞ্চডুবির আপাত দৃশ্যমান কারণসমূহ বাদ দিয়ে একজন নৌপ্রকৌশলীর দৃষ্টিতে একটি নৌযানের নকশায় বা চালনায় কি ধরনের অন্তর্নিহিত ত্রুটি থাকতে পারে তা নিয়ে আলোচনা করা। কারণ একটি নৌযানের নকশা প্রণয়ন থেকে শুরু করে এর নির্মাণ, চালনা, সার্ভে সর্বোপরি এর জীবনসীমার প্রত্যেকটা ধাপে সঠিক মান নিয়ন্ত্রণ এবং তদারকিই নিশ্চিত করতে পারে একটি নৌযানের নিরাপত্তা।
একটি নৌযানের সঠিক ভারসাম্যই নির্ধারণ করে এর নিরাপত্তা, অর্থাত্ নৌযানটি বৈরি আবহাওয়ায় অথবা ঝড়ো বাতাসে সহজে ডুবে যাবে কি-না। সুতরাং একটি নৌযানের নিরাপত্তা সম্পর্কে জানতে হলে প্রথমে জানা দরকার নৌযানটি কিভাবে পানিতে ভেসে থাকে। কোনো তরল পদার্থে অন্য কোনো কঠিন পদার্থ নিমজ্জিত করলে তরল পদার্থটি উপরের দিকে এক প্রকার বল প্রয়োগ করে এবং ঐ বস্তুর নিম্নমুখী ওজনকে বাধা দেয়, এই বাধা দানকারী বলই হচ্ছে প্লবতা বা buoyancy। জাহাজ পানিতে ভেসে থাকে এই প্লবতাকে ব্যবহার করেই যার মূলনীতি আর্কিমিডিসের তত্ত্ব নামে পরিচিত। এই নীতি অনুসারে কোনো ভাসমান বস্তুর ওজন এটি দ্বারা অপসারিত পানির ওজনের সমান।
একটি জাহাজ যখন পানিতে স্থির অবস্থায় ভাসমান থাকে তখন এর নিজস্ব ভরকেন্দ্র এবং এর দ্বারা অপসারিত পানির ভরকেন্দ্র একই সরলরেখা বরাবর কাজ করে। কিন্তু জাহাজটি বাতাস বা স্রোতের কারণে যদি কোনো একদিকে সামান্য হেলে যায় তাহলে, জাহাজের দ্বারা অপসারিত পানির ভরকেন্দ্র তার আগের অবস্থান থেকে কিছুটা সরে যায়। যদি আমরা পানির এই নতুন ভরকেন্দ্র দিয়ে একটি ঊর্ধ্বমুখী সরলরেখা কল্পনা করে জাহাজের নিজস্ব ভরকেন্দ্র এবং এর পূর্বেকার অপসারিত পানির ভরকেন্দ্র দিয়ে অঙ্কিত আরেকটি কল্পিত সরলরেখাকে দূরবর্তী একটি বিন্দুতে ছেদ করি। এই বিন্দুটিকে বলা হয়, জাহাজের মেটাসেন্টার এবং এই বিন্দুটিই মূলত একটি জাহাজের ডানে বা বামে আন্দোলিত হওয়ার সময় ঝুলন বিন্দু হিসেবে কাজ করে। একটি জাহাজের মেটাসেন্টারের সাথে এর ভরকেন্দ্রের আপেক্ষিক অবস্থানই বলে দেয় জাহাজটির ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষমতা কেমন। সাধারণভাবে বলা যায় যে, জাহাজের ভরকেন্দ্র যত নিচের দিকে থাকবে সে জাহাজের ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষমতা ততো বেশি। এ কারণেই বলা যায়, জাহাজের ভারসাম্যের উপর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে ভরকেন্দ্রের অবস্থানের।
সাধারণত যাত্রীবাহী নৌযানের নকশা প্রণয়নেরকালে অন্যান্য নৌযান থেকে অনেক বেশি সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। এর অন্যতম কারণসমূহ হলো:১। তেল, কন্টেইনার বা কার্গো পরিবাহী জাহাজের মালামাল স্থির থাকে অর্থাত্ সময়ের সাথে এসব মালামালের অবস্থানের কোনোও পরিবর্তন হয় না। ফলে পুরো নৌপথ বা সমুদ্রপথ জুড়ে জাহাজের মূল ভরকেন্দ্রের কোনো পরিবর্তন হয় না। কিন্তু যাত্রীবাহী জাহাজে মানুষের চলাচলের কারণে জাহাজের ভরকেন্দ্র সময়ের সাথে সামান্য হলেও পরিবর্তিত হতে থাকে।
অনেক সময় ঝড়ো আবহাওয়ায় জাহাজের যাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে বা অন্য কোনো কারণে সকলে মিলে একসাথে জাহাজের সবচেয়ে উপরের ডেকে বা ছাদে উঠে আসে। এই পরিস্থিতিতে জাহাজের ভরকেন্দ্রও বিপজ্জনকভাবে কিছুটা উপরের দিকে উঠে যায়, যা একটি জাহাজের ভারসাম্যের জন্য মারাত্মক হুমকি নিয়ে আসে। ২। একটি জাহাজের বিভিন্ন কম্পার্টমেন্টকে তুলনা করা যেতে পারে একটি বিল্ডিয়ের বিভিন্ন রুমের সাথে। প্রত্যেকটা রুমের দেয়ালের নিজস্ব পানি-প্রতিবন্ধকতা থাকে, অর্থাত্ যেকোনো একটি রুমে যদি কোনো কারণে বেসিন বা কল থেকে পানি উপচে পড়ে গেলেও তা রুমের দেয়াল ভেদ করে অন্য রুমে প্রবেশ করতে পারে না। জাহাজের প্রত্যেকটা কম্পার্টমেন্টেও অনুরূপভাবে পানি-প্রতিবন্ধক হতে হয়। এছাড়াও জাহাজটি যখন তৈরি করা হয় তখন সহজে যেন এটি ডুবে না যায় তার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয় যার মধ্যে একটি উপায় হলো, জাহাজের যেকোনো একটি কম্পার্টমেন্ট কোনোওভাবে যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সম্পূর্ণভাবে পানি দ্বারা নিমজ্জিত হয়ে গেলেও যেন জাহাজটি পুরোপুরি ডুবে না যায়। জাহাজের এই বৈশিষ্ট্যকে বলে ফ্লাডেবিলিটি। জাহাজের ফ্লাডেবিলিটি বা নিমজ্জন-রোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করার জন্য জাহাজের কম্পার্টমেন্টগুলোর দৈর্ঘ্যের একটি নির্দিষ্ট সীমা মেনে চলা হয়।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথে চলাচলকারী লঞ্চগুলোতে অনেক সময় দেখা যায়, খরচ বাঁচানোর জন্য কম্পার্টমেন্টগুলোকে অতিরিক্ত দীর্ঘ করা হয় বা যথাযথভাবে পানি-প্রতিবন্ধক করা হয় না। ফলে ঝড়ে বা সামান্য দুর্ঘটনায় লঞ্চগুলো পানিতে ডুবে যায়।
৩। সাধারণত জাহাজের সি-কিপিং (Sea-keeping) ক্ষমতা যতটুকু নির্ভর করে একটি জাহাজের হালের আকৃতির উপর, তেমনি এটা নির্ভর করে চালকের দক্ষতার উপর। সাধারণত সমুদ্রে বা নদীতে যদি প্রচণ্ড ঢেউ থাকে তাহলে চালক কখনোই জাহাজটি সরাসরি স্রোত বা ঢেউয়ের দিকে জাহাজ চালনা করেন না। কিন্তু আমাদের দেশের জাহাজের মাস্টার বা চালকের দক্ষতা এবং সঠিক প্রশিক্ষণ না থাকায় তীব্র স্রোতে তারা সঠিক এবং নিরাপদভাবে জাহাজ চালাতে অসমর্থ হন। ৪। একটি জাহাজের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, গভীরতা ইত্যাদি পরিমাপকে একসাথে জাহাজের প্রিন্সিপাল ডাইমেনশনস বলা হয়। এই সকল প্রিন্সিপাল ডাইমেনশনস বা মূল মাত্রার প্রত্যেকটির সাথে প্রত্যেকটির (উদাহরণস্বরূপ দৈর্ঘ্যের সাথে প্রস্থের বা প্রস্থের সাথে গভীরতার) একটি নির্দিষ্ট অনুপাত আছে যা বজায় রাখা জাহাজের ভারসাম্যের জন্য অত্যাবশ্যকীয়। জাহাজের ধরন এবং দৈর্ঘ্যভেদে এই অনুপাতসমূহের আলাদা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রেঞ্জ আছে এবং যে কোনো ধরনের জাহাজের নকশা প্রণয়নের জন্য এই অনুপাতকে মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়।
আমাদের দেশের যাত্রীবাহী জাহাজের ক্ষেত্রে এসকল অনুপাতকে খুব একটা আমলে নেয়া হয় না। জাহাজের নকশা প্রণয়নের সময় জাহাজের ভারসাম্য বজায় রাখার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয় জাহাজের মালিকের চাহিদাকে। এর ফলে দেখা যায়, নদীর গভীরতা কম থাকলেও যাত্রী ধারণক্ষমতা বাড়ানোর জন্য জাহাজের ডেকের সংখ্যা বিপজ্জনকভাবে বাড়িয়ে দেয়া হয়। ৫। একটি জাহাজে চলা অবস্থায় দুই ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়। জাহাজের বাইরের খোলস বা হালের পানিতে নিমজ্জিত নিচের অংশ পানি দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং পানির উপরের অংশ বাতাসের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয়। এ কারণে যাত্রীবাহী জাহাজে ডেকের সংখ্যা অতিরিক্ত বৃদ্ধি করা হলে বৈরী আবহাওয়ায় বা ঝড়ো বাতাসে জাহাজটি সহজেই কাত হয়ে যায়।
৬। আমাদের দেশের নদীপথে পানির গভীরতা অত্যন্ত কম। এই নিম্ন গভীরতায় জাহাজ সঠিকভাবে এবং নিরাপদভাবে চালানোর মতো দক্ষতাসম্পন্ন মাষ্টার বা ড্রাইভারের অভাব রয়েছে। একটি জাহাজ যখন অল্প গভীর পানিতে গতিশীল থাকে তখন এটি হালের চারপাশের পানিকেও গতিশীল করে তোলে। কিন্তু এক্ষেত্রে জাহাজের পানির উপরিভাগের অংশের গতি সম্মুখদিকে থাকার ফলে এর নিমজ্জিত অংশের চারপাশের পানির গতিবেগ জাহাজের উপর একটি নিম্নমুখী বল প্রয়োগ করে, যার ফলে জাহাজটি নিচের দিকে ধাবিত হয়। আমাদের দেশের স্বল্প গভীর নদীপথে এই কারণে দেখা যায় জাহাজ অনেক সময় চরে বা নদী তলদেশে আটকে যায় এবং জাহাজের তলদেশের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৭। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথে যেসব যাত্রীবাহী জাহাজ চলাচল করে তাদের বেশিরভাগেরই নদীর গভীরতা বা স্রোতের বেগ পরিমাপের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই বা অপ্রতুল। এছাড়াও আবহাওয়া পূর্বাভাসের খবর তাত্ক্ষণিকভাবে সংগ্রহ করবার জন্য কমুনিকেশন ডিভাইস, রেডিও ইত্যাদি সাধারণত অনেক লঞ্চ বা জাহাজেই থাকে না। যার কারণে অনেক সময় নৌপথে যে কোনো ধরনের বিপদ সম্পর্কে চালককে সতর্ক করা সম্ভব হয় না।
আমাদের অভ্যন্তরীণ নৌপথে নৌযানের চলাচল নিরাপদ করার জন্য ত্রুটিমুক্ত নৌযান নির্মাণ যেমন গুরুত্বপূর্ণ ঠিক তেমনই গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে দক্ষ চালকের মাধ্যমে এটিকে পরিচালনা করা। নিরাপদ নৌযানে হোক নিরাপদ নৌযাত্রা। এটাই আমাদের সকলের আগামী দিনের প্রত্যাশা।
লেখকবৃন্দ :নৌযান ও নৌযন্ত্র কৌশল বিভাগের শিক্ষক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)