স্বাস্থ্যসেবা
চিকিত্সা ও আনন্দ উচ্ছল পরমায়ু
প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০১৪, ২০:৫৯
আমরা খুব বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করি বাংলাদেশি মানুষের কর্মক্ষমতা আর সৌভাগ্য কত তীব্র। বিদেশে নিজ নিজ পেশায় তাঁদের এই আন্তরিকতা বাংলাদেশকে একটি সম্মানজনক অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। অথচ দেশে এর বিপরীত দিকটাই প্রবল। কিছুদিন আগে আমার এক নিকটাত্মীয়ের হূদপিণ্ডে সামান্য পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়েছিল, ভাগ্য ভালো সে সময় তিনি ছিলেন অস্ট্রেলিয়ায়। প্রবাসে চিরস্থায়ী থাকার ইচ্ছে না থাকলেও অভিবাসন পাবার কারণে এদের বছরে, দু’বছরে একবার ঘুরে যাওয়াটাই রেওয়াজ। ভদ্রলোকের প্রতি ডাক্তারদের আগ্রহ কৌতূহল আর কর্তব্যরত নার্সের সেবা ও সময়নিষ্ঠা দেখে তাঁর স্ত্রী বলছিলেন, এটা কি হাসপাতাল না ফাইভস্টার হোটেল? সময়মত চমত্কার ট্রেতে খাবার-দাবার, কি নেই তাতে? দই থেকে আচার ষ্ট্রবেরি থেকে পাইনআপেল, সুষম উন্নত সব মিলিয়ে রাজসিক। এতে হোটেল মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক, সময়মত ঘড়ি বেঁধে নার্স ও ডাক্তারের আগমন, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সার্বক্ষণিক হাসি ও নির্ভরতার মুখ দেখে রোগীর ভালো হয়ে ওঠাই স্বাভাবিক। সবচেয়ে মজার ব্যাপার ভদ্রলোকের জন্য হাসপাতাল থেকে নিয়োগকৃত ডাক্তারটি ছিলো ভারতীয় বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ান। সেবিকাদের একজন স্বদেশি, একজন কোন এক দ্বীপরাষ্ট্রের অভিবাসিনী। অথচ এরা ছিলেন প্রকৃত অজিদের মত কর্তব্যপরায়ণ ও সচেষ্ট।
ঠিক একই সময় আমার ছোট ভগ্নিপতির প্রায় এক ধরনের শল্য চিকিত্সা হচ্ছিল কলকাতায়। যতবার ফোনে কথা হচ্ছিল ততবারই দিদির মুখে একটা কথা শুনছিলাম, কোন প্যাকেজে যাব? কোন প্যাকেজে গেলে ভালো হবে? প্রথমটায় হকচকিয়ে গেলেও পরে বুঝলাম, প্যাকেজ মানে এখন আর ছুটি বা উত্সবে বেড়ানোতে সীমাবদ্ধ নেই। এই প্যাকেজ ট্রেন, বিমান, হোটেল এমনকি বিয়ের অনুষ্ঠানের মত চিকিত্সার বেলায়ও তার আপন ঠাঁই করে নিয়েছে। আমাদের দেশের অসুস্থ মানুষের বিশ্বাস কলকাতার ডাক্তার ও চিকিত্সা স্বর্গতুল্য। সে কারণে ভগবান ডাক্তার বাবুরাও বসে নেই, সে দেশে এখন চিকিত্সা হয় প্যাকেজে। কে কত দিতে পারেন তার ওপর নির্ভর করে চিকিত্সা ও সেবা, সেটা যে কত বাস্তব তা তাদের নাটক সিরিয়ালেও প্রকাশ্য। প্যাকেজে চিকিত্সা হবার ব্যাপারটা আসলে একধরনের প্রতারণা, যে কোন নির্দিষ্ট রোগের চিকিত্সা নিশ্চয়ই এক ধরনের, সেক্ষেত্রে টাকা পয়সার ওঠা-নামাটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ, তাছাড়া একই অসুখে একেক রোগীর ক্ষেত্রে একেক ধরনের ফিস চার্জ করা অনৈতিক, তারপরও কলকাতার ডাক্তার নার্স ও হাসপাতাল মিলে চলছে রমরমা প্যাকেজ বাণিজ্য, কি অদ্ভূত আচরণ। একই দেশের ডাক্তার বা নার্স উন্নত দেশে এলে বদলে যায়, বদলে যায় তাঁদের সেবা পরামর্শ তেমনি ব্যবহারও। এই পরিবর্তনের সূত্র বা উত্স বোঝা জরুরী।
তবে ঢাকা এখন সবাইকে ছাড়িয়ে এক নাম্বারে। প্যাকেজ তো বটেই রোগীর বাঁচা মরাও এখন আর ব্যাপার না। আগে টাকা তারপর অন্য কথা। মানুষ জীবনের প্রয়োজনে সরকারি খাতে আস্থা হারিয়ে বেসরকারি খাতকে স্বাগত জানিয়েছিল। ভেবেছিল প্রাইভেট হাসপাতাল নামে পরিচিত স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো হয়ে উঠবে উন্নত আধুনিক ও সেবাপরায়ণ। বিশেষত যখন অর্থের বিনিময়ে সেবা নিতে হবে তখন তা আর যাই হোক হেলাফেলায় হতে পারে না। উদ্যোক্তারা কথা রাখেননি। না রাখতে রাখতে এমন অবস্থা হয়েছে এখন চিকিত্সক নার্স স্টাফ বা কর্মচারী সবাই আছেন যার যার ধান্ধায়। ভালো মানুষ বা কর্তব্যে নিষ্ঠাবান নাই বলা যাবে না। আছেন, তবে তাঁরা সংখ্যালঘু। সংখ্যাধিক্যরা এখন রোগীদের সাথে বাণিজ্যে ব্যস্ত।
মাঝে মাঝে বেপরোয়া বা বেসামাল কিছু ঘটে গেলে মিডিয়ায় তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। তখন সবাই নড়ে চড়ে ওঠেন। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া অবধি টি টি পড়ে যায়। রাজনীতিও সরব হয়ে ওঠে। ব্যস ঐ পর্যন্তই, তারপর টাকার জোরে, ক্ষমতার জোরে, অস্ত্রের জোরে কিংবা যে কোন বলে সব কিছু ঠাণ্ডা করে দেয়া হয়। মানুষও ভুলে যায় সবকিছু। এজন্য গোড়ায় হাত দিতে হবে। চিকিত্সা শাস্ত্র শিখে আসা মানুষরা দেশ ভেদে ভিন্ন ভিন্ন আচরণ করছেন। আচরণে ভিন্নতা আছে সেবিকাদেরও। এরা এক দেশ এক জাতির হবার পরও রাষ্ট্রভেদে ভিন্ন। যার মূল কারণ সামাজিক অসঙ্গতি আর দুর্বৃত্তায়ন। যে দেশে মানুষ মরে পচে ফুলে দৈবাত্ ভেসে ওঠার খবর হয়, যে সমাজে একজন দর্জি রাজপথে দৌড়ে রক্তাক্ত হতে হতে প্রাণ হারায়, রাজনীতি কর্মী বাহিনীকে বাসে ট্রেনে আগুন লাগাতে উদ্বুদ্ধ করে, সে দেশে কিছু মানুষ হঠাত্ কর্তব্যপরায়ণ বা সত্ হতে পারে না। আমাদের চিকিত্সা শাস্ত্র কোন কালেও আধুনিকতা শেখায়নি। শেখায়নি সমাজ দর্শন বা মানবিকতা। সত্যি বলতে কি মানবিক শিক্ষাহীন কোন শাস্ত্রই তার ভূমিকা পালন করতে পারে না। পৃথিবীর বহুদেশে যে কোন শাস্ত্র বা বিষয়ে পড়াশুনা করতে গেলে প্রথমে দর্শন, ইতিহাস ও সমাজ বিজ্ঞান জানতে হয়। আমাদের বস্তাপচা রাজনীতি তা জানে বলে মনে হয় না। চিকিত্সার মত জীবন বাঁচানোর জায়গাটাও এখন দুর্বিপাকে। জ্যান্ত-মৃত কাউকেও ছাড় দেয়া হচ্ছে না। এই যদি হাল, তবে ডিজিটাল হবার স্বপ্ন কোনদিনও সার্থকতার মুখ দেখবে না। মৌলিক বিষয় বিশেষত জানই যদি বেহাতে চলে যায় থাকলো বাকি কী? কবে এ বিষয়ে সচেতন হবো আমরা? দেশের কোটি কোটি মানুষের সাথে সম্পৃক্ত বিষয়েও এত উদাসীনতা আর নিয়মহীনতা আর যাই হোক সুস্থতার পরিচয় বহন করে না। আনন্দ উচ্ছল পরমায়ু কি অধরা হয়েই থেকে যাবে বাঙালির জীবনে।
(সিডনি থেকে)
dasguptaajoy@hoimail.com