ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণ ও সচেতনতা

বাংলাদেশে প্রতিবত্সর প্রায় তিন লক্ষ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। আর তাহাদের মধ্যে মৃত্যু ঘটে প্রায় আড়াই লক্ষ মানুষের। ঢাকায় অনুষ্ঠিত মেডিক্যাল ফিজিসিস্টদের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গত বুধবার এই তথ্য জানানো হয়। ক্যান্সারে আক্রান্ত তিন লক্ষের মধ্যে আড়াই লক্ষই মারা যান ফি বত্সর—দুশ্চিন্তার প্রতিচ্ছাপ রহিয়াছে এই তথ্যে। গরিব দেশ বিধায় আমাদের দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্যান্সার শনাক্ত হয় অনেক দেরি করিয়া, বিপজ্জনক স্তরে আসীন হইবার পর। অনেকক্ষেত্রে ভুলভাবে রোগ শনাক্ত হয়—ক্যান্সার থাকিলেও ধরা পড়ে না। বিপরীতে, ক্যান্সার নাই, কিন্তু ভুলভাবে শনাক্ত হইল যে, তাহা ক্যান্সার! সব মিলিয়া মোটামুটি সঠিক পরিসংখ্যান সহজলভ্য নহে। তাহার পরও যেইটুকু জানা যায়, তাহা দুশ্চিন্তার। কেননা, প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যান্সার ধরা পড়িলে তাহা লইয়া কার্যকর চিকিত্সা করা যায়, এমন কী আধুনিক চিকিত্সা ব্যবস্থায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রায় সম্পূর্ণ নিরাময়ও লাভ করা সম্ভব হয়। মনে করা হয় যে, আমাদের দেশে ভেজাল খাদ্যের কারণে দিন-দিন ক্যান্সারের মতো মারণ রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়িয়া যাইতেছে। কয়েক মাস পূর্বে পত্রিকান্তরে প্রকাশ হইয়াছে যে, ঢাকার বাজারে প্রাপ্ত সব ধরনের খাদ্যের মধ্যে ন্যূনতম ৪০ শতাংশই বিষাক্ত। ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরিতে নমুনা পরীক্ষায় এই বিষের পরিমাণ ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানদণ্ডের বিচারে তিন হইতে বিশ গুণ অধিক। আরও ভয়ের কথা হইল, ৮২টি নমুনা পরীক্ষায় কয়েকদশক পূর্বে নিষিদ্ধ হওয়া ডিডিটি, ক্লোরডেন, হেপ্টাক্লোর জাতীয় ভয়াবহ কীটনাশক মিলিয়াছে ৪০ শতাংশ খাদ্যদ্রব্যেই। তাহাছাড়া, কয়েক বত্সর ধরিয়া বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি পচনশীল ফলমুল, মাছ-মাংসে যেইভাবে ফরমালিনের সাহায্যে পচনরোধ করিয়া তাজা রাখিবার ব্যবস্থা লওয়া হয়, তাহাও দুশ্চিন্তার। কেননা, বিজ্ঞানীরা ফরমালিনকে ক্যান্সার সৃষ্টিকারক হিসাবে চিহ্নিত করিয়াছে বহু পূর্বেই। ফরমালিনকে রুখিতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করিলেও অভিযোগ রহিয়াছে যে, তাহা পূর্বাবত্ অন্তঃসলিলার মতো বহিয়া যাইতেছে পচনশীল খাদ্যদ্রব্যে। টাইম বোমার মতো ইহাই কি ক্যান্সার আকারে ফাটিয়া পড়িতেছে? যদিও ক্যান্সার সৃষ্টির কারণ সম্পর্কে সম্পূর্ণ সদুত্তর এখনও জানা সম্ভব হয় নাই। অনেক কিছু, যেমন ধূমপান বা মদ্যপানের সহিত ফুসফুস, মুখ ও কণ্ঠনালীর এবং যকৃতের ক্যান্সারের যোগাযোগ খুঁজিয়া পাওয়া যায়, তেমনই অনেক ক্ষেত্রে এই যোগসূত্র মিথ্যাও প্রমাণিত হয়। পান-সুপারি, জর্দা, মাংস, অতিরিক্ত লবণ, চিনি এইরূপ বহুকিছুর সহিত ক্যান্সারের যোগসূত্রের কথা বলা হয় বটে, তবে তাহাও সম্পূর্ণ প্রমাণিত নহে। মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধিও ক্যান্সারের ব্যাপ্তি দিন দিন বাড়াইয়া দিতেছে বলিয়া মনে করা হয়। আপাতভাবে ক্যান্সারকে আধুনিক সময়ের যাপিতজীবনের ফল বলিয়া মনে করা হইলেও এই ব্যাধির বহু প্রাচীন আলামত উদ্ধার হইয়াছে। মানুষের নিকট পূর্বপুরুষ হিসাবে খ্যাত বিলুপ্ত নিয়ানডারথালদের শরীরেও ক্যান্সারের চিহ্ন মিলিবার কথা জানা গিয়াছে। সুতরাং ক্যান্সার এখনও অনেকাংশে রহস্যের অবগুণ্ঠনে রহিয়াছে। আমাদের দেশে ক্যান্সার আক্রান্তের সবচেয়ে বড় বিপদ হইল—ইহার যতটুকু চিকিত্সা এখন করা সম্ভব, তাহা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। দ্বিতীয়ত, ক্যান্সার শব্দটি মৃত্যুদূততুল্য, তাই কেহ এই রোগে আক্রান্ত হইলে তাহার পরিবারটির ওপর যেন মানসিক বিপর্যয়ের আকাশ ভাঙিয়া পড়ে। তাই, ক্যান্সার সৃষ্টির সম্ভাব্য অনুঘটকসমূহকে সমীহ করিতেই হবে। জীবনযাপনেও তাহার প্রতিফলন থাকা দরকার। দরকার ক্যান্সার সচেতনতা। ইহা স্বীকৃত যে, ক্যান্সার সংক্রান্ত বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা সম্ভব হইলে এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় অর্ধেকে নামাইয়া আনা সম্ভব। গণমাধ্যম হইতে শুরু করিয়া সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানও এই ব্যাপারে আরও কার্যকরী ভূমিকা রাখিতে পারে।