দশদিগন্তে

শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে সম্পর্কোন্নয়নের পথে ঢাকা ও দিল্লি

১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় দিবস। এই দিবসের আগেই যাতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার স্থল সীমান্ত চুক্তি ভারতের পার্লামেন্টে অনুমোদিত হয় সেজন্যে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ভারতের ইকোনমিক টামইস পত্রিকা খবর দিয়েছে, বিজেপি’র কেন্দ্রীয় নেতারা তাদের পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি শাখাকে বাংলাদেশ ও ভারতের বৃহত্তর স্বার্থে এই চুক্তির বিরুদ্ধে তাদের আগের আপত্তি প্রত্যাহার করার অনুরোধ জানিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে এই চুক্তির বরাবর বিরোধিতা করে আসছে মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল সরকার। মনে হয় মমতার আপত্তি অগ্রাহ্য করেই মোদী সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে দৃঢ়তা দেখাবেন। ভারতের নতুন সরকারের এই উদ্যোগে কংগ্রেস দলের সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী আশ্বস্ত হয়েছেন। তিনি পার্লামেন্ট ভবনের সেন্ট্রাল হলে কংগ্রেসের সংসদীয় দলের এক বৈঠকে বলেছেন, “শেষ পর্যন্ত বিজেপি’র বোধোদয় হয়েছে।” তিনি দলের সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, “আপনাদের নিশ্চয়ই স্মরণ আছে, বাংলাদেশের সঙ্গে স্থল সীমান্ত চুক্তি করার জন্য আমরা (কংগ্রেস সরকার) উদ্যোগ নিয়েছিলাম। তখন তাতে সমর্থন দিতে রাজি হয়নি বিজেপি। এখন তারা বুঝতে পেরেছেন, আমাদের সরকারের ওই সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল।” বিজেপি সম্পর্কে কংগ্রেস নেত্রীর এই অভিযোগটি সঠিক। ২০১১ সালে ভারতের সাবেক কংগ্রেসী প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ঢাকা সফরের সময় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়া সত্ত্বেও ভারতের পার্লামেন্টে তা আনুষ্ঠানিকভাবে এখন পর্যন্ত অনুমোদিত হয়নি। কংগ্রেস সরকারের আমলে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করেছিল পশ্চিমবঙ্গের মমতা সরকার এবং কেন্দ্রে বিরোধী দল হিসেবে বিজেপি। প্রয়োজনীয় সমর্থনের অভাবে পার্লামেন্টে চুক্তিটি অনুমোদন করাতে পারেনি কংগ্রেস সরকার। তিস্তা চুক্তি নিয়েও পানি ঘোলা করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মমতা ব্যানার্জি। এই চুক্তি সম্পাদনের জন্য কয়েকটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীসহ ঢাকা এসেও মনমোহন সিং চুক্তিটি করতে পারেননি মমতার গোঁয়ার্তুমিতে। বিব্রতভাবে তাকে দিল্লিতে ফিরে যেতে হয়েছিল। এখন ভারতের পার্লামেন্টে নিরঙ্কুশ সংখ্যাধিক্যের অধিকারী মোদী সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর বিরোধিতা গ্রাহ্য করবেন তা মনে হয় না। সোনিয়া গান্ধী বলেছেন, শেষ পর্যন্ত এ ব্যাপারে বিজেপি’র বোধোদয় হয়েছে। আমার মনে হয় এটা বিজেপি’র নয়, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বোধোদয়। আমি আগেই লিখেছিলাম, গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এক ব্যক্তি নন। দিল্লিতে এক নতুন নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় বসেছেন। তার হিন্দুত্ববাদী খোলসের মধ্য থেকে এক বহুত্ববাদী (Pluralistic) রাজনীতিক বেরিয়ে আসছেন মনে হচ্ছে। আশঙ্কা করা হয়েছিল, তিনি বাংলাদেশের হাসিনা সরকারের প্রতি অনুকূল মনোভাব গ্রহণ করবেন না। কারণ, হাসিনা সরকারের সঙ্গে আগের কংগ্রেস সরকারের সম্পর্কটি ছিল নিবিড়। সুতরাং ঢাকায় হাসিনা সরকারের ক্ষমতায় থাকাটাকে বিজেপি সরকার হয়তো পছন্দ করবেন না। এই আশায় বিজেপি’র নির্বাচন জয়ে আহ্লাদিত হয়ে বাংলাদেশে বিএনপি “ধোপার বাড়ির গাধার মতো” অনেক নর্তন কুর্দন করেছে। দিল্লি সম্পর্কে তাদের আগের সুর ঘুরিয়েছে। মোদী তাতে প্রভাবিত হননি। তিনি ক্ষমতায় বসেই বুঝতে পারেন, ভারতের নিজের স্বার্থ ও নিরাপত্তার জন্য নিকট প্রতিবেশী বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক ও সেকুলার সরকারের ক্ষমতায় থাকা প্রয়োজন। এবং সেই সরকারটি হাসিনা সরকার। পাকিস্তানের আইএসআই দ্বারা প্রভাবিত এবং জামায়াতের মতো উগ্র ধর্মান্ধদের দ্বারা সমর্থিত বাংলাদেশের কোনো সরকার ভারতকে—বিশেষ করে তার পূর্বাঞ্চলকে কোনো নিরাপত্তা দিতে পারবে না; অতীতেও তারা দেয়নি। এজন্যেই বিএনপি’র অতি আশায় তপ্ত কড়াইয়ে ঠাণ্ডা পানি ঢেলে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদী ক্ষমতায় বসার সঙ্গে সঙ্গে তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজকে ঢাকায় পাঠান বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন এবং দেশটির সঙ্গে বিভিন্ন বিরোধ আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত মিটিয়ে ফেলার আশ্বাস জানাতে। মোদী কথা রেখেছেন। ভারতের ‘ইকোনমিক টাইমস’ পত্রিকা খবর দিয়েছে, এ বছর ১৬ ডিসেম্বরের আগেই এই চুক্তির আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিতে প্রধানমন্ত্রী বিশেষভাবে আগ্রহী। দ্বিতীয় ধাপে তিস্তার পানি নিয়েও বাংলাদেশের সঙ্গে কার্যকর চুক্তি সম্পাদনে তিনি এগুবেন। এই দু’টি চুক্তি বাংলাদেশ ও ভারতের জন্য কী বিশাল কল্যাণ বহন করবে, সেই সম্ভাবনাকে কোনো গুরুত্ব না দিয়ে বাংলাদেশে বিএনপি ও তাদের সমর্থক একশ্রেণির মিডিয়া চেষ্টা করেছে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি আরো বাড়াতে। শেখ হাসিনার সফল চীন সফর এবং চীনের সঙ্গে বিশাল অঙ্কের সাহায্য ও সহযোগিতার চুক্তি করার পর বাজারে গুজব ছড়ানো হয়েছিল, চীনের দিকে ঢাকা একটু বেশি ঝুঁকে পড়ায় মোদী সরকার অসন্তুষ্ট হয়েছেন এবং হাসিনা সরকারের প্রতি আগের মনোভাবের উষ্ণতা আর নেই। তা শীতল হয়ে পড়েছে। ফলে মোদী সরকারের কাছে বিএনপি’র সুয়ো রানী হওয়ায় সম্ভাবনা বেড়ে গেছে। লন্ডনে এমন গুজবও ছড়ানো হয়েছিল যে, এখানে বসে দিল্লিতে ‘কাকাবাবুর’ (uncle) সঙ্গে তারেক রহমানের যোগাযোগ বাড়ছে। বিএনপি’র এ আশার গুড়েও বালি পড়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পাদিত স্থল সীমান্ত চুক্তি ১৬ ডিসেম্বরের আগেই অনুমোদন এবং তিস্তা চুক্তি সম্পাদনেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগত আগ্রহ প্রকাশ ও উদ্যোগ গ্রহণে মনে হয়, বাংলাদেশের হাসিনা সরকারের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন ও সম্পর্ক রক্ষায় মোদী সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। দু’দেশের বৃহত্তর স্বার্থেই তারা এটা করতে চান। স্থল সীমান্ত ও তিস্তার পানি নিয়ে যদি দু’দেশের মধ্যে একটা সুমীমাংসা হয়, তাহলে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা দ্বারা অন্য সমস্যাগুলো মেটাতেও দেরি হবে না। দু’দেশের মধ্যে এই সমস্যাগুলোর মীমাংসা হয়ে গেলে বাংলাদেশে ভারত-বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িকতা প্রচারকে যারা রাজনৈতিক মূলধন করে দেশের গণতান্ত্রিক আবহাওয়াকে বিষাক্ত করছেন, তারা সেই সুযোগ আর পাবেন না। তিস্তার পানি নিয়ে উদ্ভূত সমস্যার সমাধান কিভাবে করা যায়, সে সম্পর্কে এক পত্রলেখক কলকাতার দৈনিক স্টেটম্যান পত্রিকায় (১১ আগস্ট সোমবার) একটি প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘ভারত কিংবা বাংলাদেশ কেউই বর্ষাকালে তিস্তার জলের ভাগ চায় না। ভাগ চায় গ্রীষ্মকালে। বর্ষাকালে জল সঞ্চয় করে না রাখলে গ্রীষ্মকালে উভয় দেশ কিভাবে জল পাবে কেউ তা বলছে না। এই সমস্যা সমাধানের জন্য ভারত ও বাংলাদেশের উচিত বর্ষাকালে জল সঞ্চয় করে রাখা। পাহাড়ি এলাকায় নদীর মধ্যে আড়-বাঁধ (Run-off-river) দিয়ে নদীর মধ্যেই জল ধরে রাখা যায়। ভারতবর্ষে দামোদর নদের মধ্যে এমন আড়-বাঁধ ব্রিটিশরা পশ্চিমবঙ্গে রনডিয়ায় (বর্ধমান জেলা, ভায়া পানাগড়) এবং বিহারে (এখন ঝাড়খন্ডে) রামগড় জেলায় একাধিক তৈরি করে সেচের ও পানীয় জলের সমস্যার সমাধান করেছিল। অথচ স্বাধীন ভারতে এসবের কোনো উদ্যোগ নেই। নদীর মধ্যে (এখানে তিস্তা) বাঁধ বা আড়-বাঁধ তৈরি না করলে (বাংলাদেশের কিছু মানুষের দাবি তাই) পশ্চিমবঙ্গ জল পাবে কিভাবে? উভয় দেশ উভয়ের জল সমস্যা নিয়ে একসঙ্গে বসে গঠনমূলক চিন্তা করলে ভালো করবে। শুধু তিস্তা নয়, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত সকল নদী-সমস্যা নিয়েই বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে উভয় দেশের মধ্যে বৈঠক ও আলোচনা হওয়া উচিত। ফারাক্কা বাঁধ ও গঙ্গার পানি বণ্টনের সমস্যাটিও সৃষ্টি করে গিয়েছিল পূর্বতন পাকিস্তান সরকার—তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে ভারত-বিদ্বেষী রাজনীতি জিইয়ে রাখার উদ্দেশ্যে। পশ্চিম পাকিস্তানে সিন্ধু অববাহিকার (Indus basin) পানি সমস্যা নিয়ে যখন ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় বৈঠক হয়, তখন পূর্ব পাকিস্তানের নদীগুলোর সমস্যাগুলো নিয়েও আলোচনা ও চুক্তি হওয়ার কথা ছিলো। পাকিস্তান সরকার তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের নদ-নদীর সমস্যা নিয়ে আলোচনাকে গুরুত্ব দেননি; কেবল সিন্ধু অববাহিকা চুক্তি করেই ভারতের সঙ্গে পানি-বিরোধ মিটিয়ে ফেলেন। আন্তর্জাতিক সংস্থার সাহায্যে পাকিস্তানের জন্য সিন্ধু নদের পানি সংরক্ষণের জন্য বিরাট অর্থ ব্যয়ে এক বিশাল রিজার্ভার তৈরি করা হয়। গঙ্গায় অনুরূপ রিজার্ভার তৈরি ও পানি ধরে রাখার উপর পাকিস্তান সরকার কোনো গুরুত্ব দেননি। তারা সমস্যাটিকে জিইয়ে রেখেছিলেন তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমানে বাংলাদেশ) তাদের ক্ষমতায় থাকার স্বার্থে ভারত-বিদ্বেষী রাজনীতি বহাল রাখার উদ্দেশ্যে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর জিয়াউর রহমানের সামরিক সরকার বাংলাদেশের মানুষের জীবন-মরণের সমস্যা এই পানি-বিরোধের কোনো সমাধানের চেষ্টা না করে সমস্যাটিকে তাদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার প্রয়াস চালান। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে একটি ফারাক্কা বাঁধ-বিরোধী লঙ মার্চের ব্যবস্থা করা হয়েছিল বাংলাদেশে জিয়া সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায়। তাতে বাংলাদেশ গঙ্গার পানির হিস্যা পায়নি। পেয়েছে বহু বছর পর হাসিনা সরকার ক্ষমতায় আসার পর শান্তিপূর্ণ আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে। বর্তমানেও হাসিনা সরকারের আমলেই তিস্তাসহ সকল নদ-নদী সমস্যা, টিপাইমুখ বাঁধ সমস্যা, সীমান্ত সংঘর্ষ, দু’দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে ভারসাম্য আনয়ন ইত্যাদি সমস্যাও শান্তিপূর্ণ মীমাংসার পথে দ্রুত এগুবে বলে আশা করা যায়। হাসিনা সরকারের কোনো ভারত-বিরোধী অপরাজনীতি নেই। অন্যদিকে প্রতিবেশী ছোট দেশ বাংলাদেশের দিকে সাহায্য ও সহযোগিতার হাত বাড়াতে ভারতের মোদী সরকারেরও কোনো দ্বিধা ও দ্বন্দ্ব নেই বলে দেখা যাচ্ছে। উপমহাদেশের রাজনীতিতে এটা একটা শুভ সূচনা। হাসিনা ও মোদী সরকারের মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন দ্বারা আমরা উপমহাদেশে শান্তি ও সমৃদ্ধির একটা নতুন যুগ শুরু হওয়ার আশা করলে তা অযৌক্তিক হবে কি? লন্ডন, ২৩ আগস্ট, শনিবার, ২০১৪