শিক্ষা

শিশুশিক্ষা ও আমাদের সংস্কৃতি

পথশিশুদের একটা স্কুল ভিজিট করার নিমন্ত্রণ পেয়েছিলাম কিছুদিন আগে। পথের জ্যাম ঠেলে পৌণে ১টায় গিয়ে হাজির হলাম আগারগাঁও বস্তির পাশে এক রিকশা গ্যারেজের ভেতরে ছোট্ট কুঁড়েঘরের ‘মজার স্কুল’-এ। ৩০জন শিক্ষার্থী আর ১৩জন কর্মী-শিক্ষক অপেক্ষা করছিল সেখানে। ‘পথকলি’সহ কিছু প্রতিষ্ঠান পথের শিশুদেরকে পুনর্বাসনের জন্য, শিক্ষিত বা প্রশিক্ষিত করার জন্য কাজ করছে। আরো কিছু প্রতিষ্ঠান ও মানুষ কাজ করছে তাদের নিজেদের মতো করে। এনজিও কর্মীরাও পিছিয়ে নেই। কিন্তু আমাদের সমস্যা তো অনেক। পথে পথে হাজারো অসহায় শিশুর আর্তনাদ! তবে, সমাজের বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তি ও উদ্যোগের মাধ্যমে হয়তো একদিন পথশিশুমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে উঠবে। তখন হয়তো কোনো শিশুকে পথে পথে ভিক্ষার জন্য হাত বাড়াতে হবে না। ফুল কিংবা পানির বোতল নিয়ে পথের ধারে, গাড়ির জানালায় হাত প্রসারিত করতে হবে না। অথবা বাবা-মায়ের অসুখের কথা বলে স্লিপ বিলিয়ে চকলেট বিক্রি করতে হবে না। আমরা সকলে মিলে হয়তো একদিন গড়ে তুলতে পারবো স্বপ্নের বাংলাদেশ। তার জন্য দরকার অপেক্ষার ও অংশগ্রহণমূলক কর্মকাণ্ডের। প্রয়োজন ছোট ছোট ও সমন্বিত প্রচেষ্টার। একদিনে কিংবা রাতারাতি তো আর সব কিছু পাল্টে নতুন সূর্য দেখা দেবে না। স্কুলটির নাম ‘মজার স্কুল’ কেন?—জানা গেল ওরা ‘খাদ্য-শিক্ষা-প্রযুক্তি’—এই শ্লোগানকে ধারণ করে স্কুল পরিচালনা করছে। শিক্ষার্থীরা কেউ না খেয়ে স্কুলে আসবে না। এরা খুবই দরিদ্র পরিবারের ছেলে-মেয়ে। ‘মজার স্কুল’-এর কর্মীরা কিছু শিশুর খাদ্য-নিরাপত্তা ও সামাজিক-নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়েছে। এরা টোকাই না হয়ে হয়তো একদিন সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে। জাতীয় উন্নয়নে তারাও অবদান রাখবে নিজেদের অবস্থান থেকে। শিক্ষা এবং খাবারের পাশাপাশি ‘মজার স্কুল’-এ শিশুদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য নিয়মিতভাবে তেল-সাবান, শ্যাম্পু প্রদান করা হয়। মাসিক মেডিক্যাল চেক-আপের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আছে পড়ার মজা, খেলার মজা, খাওয়ার মজা, ছবি আঁকার মজা। গলা ছেড়ে বর্ণ-শব্দ উচ্চারণ করে তারা, ছবিতে আঁকে স্বপ্ন। হয়তো মনের কোণে লুকিয়ে থাকা কোনো স্বপ্নও লালন করে চলে তারা এই ‘মজার স্কুল’-এ। প্রতি বৃহস্পতিবারে হচ্ছে সাংস্কৃতিক ক্লাস। আনন্দ-ফুর্তির মধ্য দিয়ে শিশুরা শিখছে। গান-নাচ-আবৃত্তি-নাটক-গল্প বলা— তাদের সাপ্তাহিক কার্যক্রমের অংশ। সেদিন তাদের অবসন্নতা ও ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলার দিন। এখানে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা-প্রদানের কার্যক্রম চলছে। স্কুলে আসার ব্যাপারে তাদের কোনো ভীতি নেই। আমরা এখনও শিক্ষা-ব্যবস্থায় আনন্দ-বিনোদনকে কিংবা সৃজনশীলতা বিকাশের পথকে ঠিকমতো স্থান দিতে পারিনি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সম্প্রতি চারু ও কারুকলা পাঠ্য করা হয়েছে। চিত্রকলা ও মানবিকবিদ্যা বিষয়ে শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণের ফলে তাদের মানবিক বিকাশের পথ প্রশস্ত হবে। তবে, অন্তত বিদ্যালয়-পর্যায়ে সাংস্কৃতিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে পারলে শিক্ষার্থীর মনন বিকাশে তা ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। সপ্তাহে একদিন চলতে পারে সাংস্কৃতিক পাঠ গ্রহণের ক্লাস। কেউ গান গাইবে, কেউ নাচবে, কেউবা কবিতা আবৃত্তি করবে। স্কুলে থাকবে হারমোনিয়াম, গীটার, তবলা, পিয়ানো, বাঁশি প্রভৃতি ইন্সট্রুমেন্ট। চলবে নাটকের মহড়া ও মঞ্চায়ন। অনুষ্ঠান উপস্থাপনার জন্য কেউ লিখবে স্ক্রিপ্ট। খবরের কাগজ বা টেলিভিশনের জন্য কেউ বা তৈরি করবে প্রেস রিলিজ। সাংস্কৃতিক সভা-আড্ডা-অনুষ্ঠানে তৈরি হবে দক্ষ-প্রশিক্ষিত ও যোগ্য নাগরিক। সাংস্কৃতিক আবহ থাকবে প্রতিটি বিদ্যানিকেতনে। আমরা কলেজে মিউজিক পড়াচ্ছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে সঙ্গীতে, নৃত্যে, নাট্যকলায় বড়ো বড়ো ডিগ্রি দিচ্ছি। কিন্তু ওইসব শিক্ষার্থীর ব্যাকগ্রাউন্ড কী? তারা কি সকলে স্কুলে সাংস্কৃতিক আবহে বেড়ে উঠেছে। হয়তো সকলে না। কেউ কেউ হয়তো পারিবারিক সহায়তায় বা পরিবেশের মধ্য থেকে নিয়েছে প্রাথমিক বা মধ্যবর্তী পাঠ। কলেজ পর্যায়ে অপশনাল কোর্স হিসেবে রাখা হয়েছে মিউজিক। কিছুকাল আগে ময়মনসিংহে কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছে। দাবি উঠেছে রবীন্দ্র-স্মৃতি বিজড়িত কুষ্টিয়ার শিলাইদহে, নওগাঁর পতিসরে, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের। ভিত নির্মাণ না করে তো আর বিরাট বহুতল ভবন তৈরি করা যায় না। গেলেও তা টেকসই হয় না। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক পর্যায়ে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম শিক্ষার ব্যবস্থা পরিচালনা করছে। স্কুল-কলেজে শিক্ষক হিসেবে সাংস্কৃতিক কর্মীদের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা হতে পারে। রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন যে ভাবধারা নিয়ে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, সে-চিন্তা সম্প্রসারণের জন্য ধারাবাহিকভাবে কোনো কাজ হয়নি। স্কুল-পর্যায়ে সাংস্কৃতিক ক্লাসের কার্যক্রম চালু হলে শিশুর শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক ভিত মজবুত হবে। তার মানসিক বিকাশে বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে এই সাংস্কৃতিক কোর্স বা ক্লাস। বিষয়ভিত্তিক পড়াশোনা করে বা বড়ো বড়ো ডিগ্রি হয়তো আজকের প্রজন্ম চাকরি-বাণিজ্য ও রাষ্ট্র-পরিচালনায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। কিন্তু মনের বিশালত্ব সৃষ্টির জন্য, সামাজিক ও প্রতিবেশগত প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলার জন্য মনের গভীরতা তৈরির জন্য সাংস্কৃতিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল থেকে বেড়ে উঠলে মানুষের গ্রহণক্ষমতা, ধৈর্য-সমঝোতা প্রভৃতি মানবিক গুণাবলী বৃদ্ধি পায়। লেখক : বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক