বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে সবুজ সুশোভিত ষড়্ঋতুর দেশ নামে খ্যাত বাংলাদেশের জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। ফলে গ্রীষ্মের তাপমাত্রা যেমন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে, তেমনি ঠান্ডাও অনুভূত হচ্ছে ব্যাপক। বেড়ে গেছে নানা রোগের সংক্রমণও। ঋতুচক্রে দেখা দিয়েছে বিশাল হেরফের। আগের মতো এখন আর প্রাকৃতিক নিয়ম মেনে যথাসময়ে ঋতুর আবির্ভাব ঘটছে না। ঋতুর সংখ্যাও হ্রাস পেয়েছে। এ কারণে গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত ছাড়া অন্য সব ঋতুর আমেজ উপভোগ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এছাড়া বিলম্বিত হচ্ছে শীত, বর্ষার আগমন অথবা অসময়ে ভারী বর্ষণ কিংবা ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে। যে কোনো এলাকা মরুকরণের প্রাথমিক আলামতই হচ্ছে এসব। আর এই আলামত পরিলক্ষিত হচ্ছে সমগ্র বাংলাদেশেই।
দেশের বরেন্দ্র অঞ্চল নামে খ্যাত নওগাঁ, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের আবহাওয়ায় মরুময়তার লক্ষণ অন্য সব এলাকার তুলনায় বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। অথচ একটা সময়ে এতদঞ্চলের আবহাওয়া ছিল নাতিশীতোষ্ণ। সেই সুষম আবহাওয়া এখন আর বিরাজ করছে না।
বাংলাদেশের বরেন্দ্র অঞ্চলের মরুকরণ নিয়ে বিশ্বের পরিবেশ বিশেষজ্ঞদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ হয়েছে; সতর্কবার্তাও পাঠিয়েছেন বাংলাদেশে। মার্কিন ভূবিজ্ঞানী ড. নারম্যান ম্যাকলিয়ও, যিনি সাহারা মরুভূমি নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন, তিনি জানিয়েছেন যে ‘সাহারা মরুভূমি শুরু থেকে যেভাবে মরুকরণের দিকে এগিয়েছে, ঠিক একই কায়দায় বাংলাদেশের বরেন্দ্র অঞ্চলের মরুকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বরেন্দ্র অঞ্চলের বাতাসেও সাহারা মরুভূমির ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের মতো আগুনের ফুলকি বেরোচ্ছে।’
মার্কিন ভূবিজ্ঞানীর দেওয়া এই তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা নিশ্চিত হতে পেরেছি যে, আমাদের বরেন্দ্র অঞ্চল ভয়াবহ পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা জানি, মরুকরণ প্রক্রিয়া তাত্ক্ষণিক ঘটে না, খুব ধীরে ধীরে সংঘটিত হয়। এ নিয়ে তর্কবিতর্কের যথেষ্ট সুযোগ থেকে যায়। মানুষকে তাত্ক্ষণিক বোঝানো কঠিন হয়ে পড়ে। বিশ্বাসের চেয়ে অবিশ্বাসই আঁচড় কাটে বেশি। কারণ একবার মরুকরণ প্রক্রিয়া শুরু হলেও দেখা যায় এটি পরিপূর্ণতা পেতে অর্ধশতাব্দী বা তারও বেশি সময় পেরিয়ে যায়। ফলে বিতর্ক লেগেই থাকে। অর্থাত্, মরুকরণের পরিপূর্ণতা দেখে যেতে হলে একটা মানুষের জীবদ্দশায় তা সম্ভব না-ও হতে পারে, আবার হতেও পারে। সেটি নির্ভর করবে পরিবেশ বিপর্যয়ের পরিমাণের ওপর।
জানা যায়, বিশ্বে প্রতি মিনিটে ৪৪ হেক্টর আবাদি ভূমি এবং ২০ হেক্টর বনভূমি মরুকরণ হচ্ছে। সেই হিসাব মোতাবেক দেখা যায়, বছরে ৭০ লাখ হেক্টর জমি মরুকরণ হচ্ছে। মরুকরণের প্রভাবে পড়ে উত্তর আমেরিকার ৪০ শতাংশ আবাদি ভূমি মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে সাহারার দক্ষিণ অংশে গত ৫০ বছরে ৬ লাখ ৫০ হাজার বর্গকিলোমিটার ভূমি গ্রাস করে নিয়েছে মরুভূমি। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে প্রতি বছর বিশ্বের কোনো না কোনো দেশে প্রায় দুই বর্গকিলোমিটার এলাকা মরুকরণ হচ্ছে। এটি সমগ্র বিশ্বের মানবগোষ্ঠীর জন্য একটি আতঙ্কজনক সংবাদ, যে সংবাদটার জন্য দায়ী কিন্তু মানবজাতিই; প্রকৃতি নয়। বিশেষ করে পরিবেশের বিপর্যয় ঘটিয়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বাড়িয়ে দেওয়ার নেপথ্য নায়ক ধনী ও শিল্পোন্নত দেশগুলো। বড় বড় শিল্পকারখানা, পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণ, নির্বিচারে বন উজাড়, নদী শাসন ইত্যাদির ফলে দারুণভাবে পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে সমগ্র বিশ্বে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধি পেয়ে মেরু অঞ্চলের বড় বড় বরফের চাঁই গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা একদিকে যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে মরুকরণ হচ্ছে পর্যাপ্ত জলের অভাবে অন্য এলাকাগুলো, যার অন্যতম প্রধান শিকার হচ্ছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ আক্রান্ত হবে দুইভাবে; যেমন—জল বৃদ্ধি এবং জল হ্রাস—এ দুটি সমস্যা দেশটিকে মহাদুর্যোগের দিকে ঠেলে দেবে।
আমরা যদি জলবায়ু পরিবর্তনে সতর্ক হতে পারি, তাহলে হয়তো বিপর্যয় কিছুটা ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আমাদের কিছু জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করে কার্বন নিঃসারণ শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে হবে। ব্যাপক হারে সবুজ বনায়ন সৃষ্টি করতে হবে। যদিও বন বিভাগ ব্যাপক হারে গাছের চারা রোপণ করে বনায়ন সৃষ্টি করেছে, তথাপি সামাজিক বনায়ন সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। প্রয়োজন রয়েছে বৃক্ষ নিধন বন্ধে গণসচেতনা বৃদ্ধিরও। তত্সঙ্গে কঠোর আইন প্রয়োগ করে বৃক্ষনিধনসহ বন্যপ্রাণী নিধনও বন্ধ করতে হবে। নদ-নদী দখল কিংবা জলাশয় ভরাটের ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে। প্রচুর বনায়ন সৃষ্টি করতে হবে, কঠোর আইন প্রয়োগ করে বৃক্ষ নিধনসহ বন্যপ্রাণী নিধন বন্ধ করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রকৃতির সৃষ্টি প্রতিটি সন্তানই কোনো না কোনোভাবেই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। নর্দমার কীট থেকে শুরু করে হাতি পর্যন্ত সবাইকে আমাদের প্রয়োজন পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে।
এই সত্য মানুষকে জানাতে হবে, বোঝাতে হবে। মরুকরণ রোধে পাখপাখালির ভূমিকাও যে অপরিসীম, তা-ও জানান দিতে হবে মানুষকে। পাখপাখালির কল্যাণে শুধু মরুকরণ রোধই নয়, আমরা পাচ্ছি নির্ভেজাল অক্সিজেন ফ্যাক্টরিও; সে বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে, জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। তাহলে হয়তো কিছুটা হলেও নিস্তার মিলবে আমাদের।
আরেকটি বিষয় হচ্ছে, কয়েক বছর আগে দেশের একটি জাতীয় দৈনিকের শিরোনাম নজর কেড়েছে আমাদের। শিরোনামটি ছিল, ‘২০৫০ সালের মধ্যে বাসভূমি হারাবে বাংলাদেশের ২ কোটি মানুষ।’
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটার বাড়লেই দেশের ৪ হাজার ৮০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা তলিয়ে যাবে। আর ২ মিটার বাড়লে তলিয়ে যাবে ১২ হাজার ১৫০ বর্গকিলোমিটার। প্রতিবেদনে আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। উক্ত প্রতিবেদন পাঠে আশঙ্কা সৃষ্টির পাশাপাশি আমাদের প্রশ্নবিদ্ধও হচ্ছে, আসলেই কি প্রিয় বাংলাদেশ তলিয়ে যাবে? কারণ এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৭৩-২০০০ সালের মধ্যে উপকূলীয় অঞ্চলের কোনো কোনো এলাকার ভূমিক্ষয় বৃদ্ধি পেলেও সমুদ্রে উচ্চমাত্রার পলির স্তরের আগমনে ভূমির পরিমাণ বাড়ছে। তাতে ভারসাম্যও বজায় থাকছে। গবেষণার সত্যতাও মিলেছে, যেমন—হাতিয়া অঞ্চলে বিশাল বিশাল চর জেগেছে ইতিমধ্যে। তবে এটা সত্যি, ভূমির পরিমাণের সঙ্গে সঙ্গে স্হায়ীভাবে জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সুতরাং আমরা সময় থাকতে সাবধান হই, নচেত এই দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠা ভীষণ কঠিন হবে।
লেখক :কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট।