একটি রাষ্ট্রের সভ্যতা পরিমাপ করা যায়- সেই রাষ্ট্রে মানুষ আইনকে বিশ্বাস করে, নাকি নিজের হাতে বিচার করিতে চাহে-এই প্রশ্নের উত্তরের ভিতরে। বাগেরহাটের মোংলায় কোস্ট গার্ড স্টেশনে হামলার সাম্প্রতিক ঘটনা সেই প্রশ্নটিকেই আবার সামনে আনিয়া দিয়াছে। এক জেলে নিখোঁজ হইবার অভিযোগকে কেন্দ্র করিয়া উত্তেজিত জনতার একটি অংশ কোস্ট গার্ডের স্টেশনে হামলা, ভাঙচুর এবং সংঘর্ষে জড়াইয়া পড়ে। ঘটনাটিতে কোস্ট গার্ড সদস্য আহত হন এবং পালটা শক্তি প্রয়োগের অভিযোগও উঠিয়াছে। ঘটনার সূত্রপাত জয়মনির ঘোল এলাকার জেলে মিরাজ শেখের নিখোঁজ হইবার ভিতর দিয়া।
পরিবার ও স্থানীয়দের অভিযোগ, তাহাকে কোস্ট গার্ড আটক করিয়াছিল। কিন্তু পরে তাহার কোনো খোঁজ পাওয়া যায় নাই। অন্যদিকে কোস্ট গার্ড বলিতেছে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে বাহিনীটির বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাইতেছে এবং স্টেশনটি সরাইয়া দেওয়ার উদ্দেশ্যে হামলা সংগঠিত করিয়াছে। এই দুই বক্তব্যের মধ্যে কোনটি সত্য-তাহা তদন্তের বিষয়। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট-অভিযোগের সত্যতা যাহাই হউক না কেন, কোনো অবস্থাতেই আইন নিজের হাতে তুলিয়া নেওয়া গ্রহণযোগ্য নহে। রাষ্ট্রের কোনো বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকিলে তাহা তদন্ত, বিচার এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নিষ্পত্তি হইতে হইবে। একটি কোস্ট গার্ড স্টেশনে হামলা, সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর কিংবা দায়িত্ব পালনরত সদস্যদের আক্রমণ করিয়া কোনো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় না। বরং তাহাতে আইন ও শৃঙ্খলার ভিত্তিই দুর্বল হয়।
তবে এইখানেই কথা শেষ নহে। কারণ এই ধরনের বিস্ফোরক পরিস্থিতি হঠাৎ করিয়া সৃষ্টি হয় না। মানুষের মনে যখন দীর্ঘদিন ধরিয়া অনাস্থা, অবিশ্বাস এবং বঞ্চনার অনুভূতি জমিতে থাকে, তখন কোনো একটি ঘটনা সেই জমাট ক্ষোভের বিস্ফোরণের কারণ হইয়া দাঁড়ায়। যদি সত্যই কোনো ব্যক্তি নিখোঁজ থাকেন এবং পরিবার দীর্ঘদিন ধরিয়া সন্তোষজনক উত্তর না পান, তাহা হইলে সেই হতাশা ও উদ্বেগকে অবজ্ঞা করা চলে না। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব কেবল আইন প্রয়োগ করা নহে-মানুষের নিকট নিজেদের জবাবদিহি ও বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রতিষ্ঠা করা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা একটি অমূল্য সম্পদ। সেই আস্থা এক দিনে গড়িয়া উঠে না, আবার একদিনে নষ্টও হয় না। আচরণ, স্বচ্ছতা, সংযম এবং পেশাদারিত্বের ধারাবাহিক চর্চার মাধ্যমে ইহা অর্জিত হয়। যদি কোনো বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে, তাহা হইলে তাহার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগকে গুজব বলিয়া উড়াইয়া দেওয়া যেমন সমাধান নহে, তেমনি অভিযোগের ভিত্তিতে জনতার আদালত বসানোও বিপজ্জনক।
মোংলার ঘটনাটি আরেকটি বাস্তবতাও স্মরণ করাইয়া দেয়। সুন্দরবনসংলগ্ন অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরিয়া বনদস্যু ও জলদস্যুদের তৎপরতার জন্য পরিচিত। কোস্ট গার্ডের দাবি, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে তাহাদের অভিযানের ফলে বহু দস্যু গ্রেফতার, জিম্মি উদ্ধার এবং অস্ত্র জব্দ করা সম্ভব হইয়াছে। বাহিনীটির মতে, এই চাপের কারণেই অপরাধী গোষ্ঠীগুলি কোস্ট গার্ডের উপস্থিতি অপছন্দ করে এবং হামলার পিছনে তাহাদের সম্পৃক্ততা থাকিতে পারে। যদি এই দাবি সত্য হয়, তাহা হইলে ঘটনাটির মধ্যে কেবল জনরোষ নহে, সংগঠিত অপরাধচক্রের স্বার্থও জড়িত থাকিতে পারে। সুতরাং তদন্ত হওয়া চাই তথ্যভিত্তিক ও নিরপেক্ষ। আমাদের মনে রাখিতে হইবে, রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও সীমাবদ্ধতা আছে, ভুলও হইতে পারে। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতার সমাধান আইন ভাঙিয়া নহে, বরং আইনকে শক্তিশালী করিয়া। একইভাবে নাগরিকদেরও বুঝিতে হইবে, গণরোষ কখনো বিচারব্যবস্থার বিকল্প নহে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখন জনগণ আইনকে অগ্রাহ্য করিতে শুরু করে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলিও জনগণের আস্থা হারায়, তখন অরাজকতার দরজা খুলিয়া যায়।
অতএব মোংলার ঘটনাকে কেবল একটি সংঘর্ষ বা হামলার সংবাদ বলিয়া দেখিলে ভুল হইবে। ইহা আমাদের সমাজের গভীরে জমিয়া থাকা অবিশ্বাসের একটি সতর্কসংকেত। প্রয়োজন সত্য উদ্ঘাটন, দায়ীদের জবাবদিহিতা এবং সঠিক তদন্ত। এবং একই সঙ্গে প্রয়োজন জনগণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার বিশ্বাসের সেতুটি পুনর্নির্মাণ করা।

