কড়াদের প্রথম ছেলে হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে চমক দেখিয়েছিলেন লাপোল কড়া। এবার তার হাত ধরেই কড়া পাড়ায় জ্বলেছে আরেক বাতিঘর, ‘কড়া পাঠশালা’। সম্প্রতি দিনাজপুরের বিরল উপজেলার ঝিনাইকুড়ি গ্রামে এক অনাড়ম্বর আয়োজনের মধ্য দিয়ে পাঠশালাটির উদ্বোধন করা হয়। যেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ইউসুফ হাসান অর্ক, বিশেষ অতিথি হিসেবে নাট্যাভিনেতা ও নির্দেশক সম্বিত সাহা সেতু, ভাবনার প্রধান নির্বাহী মুস্তাফিজুর রহমান রূপম সহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
কড়া পাঠশালার উদ্বোধনী বক্তব্যে ইউসুফ হাসান অর্ক কড়া শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘মূলধারার সঙ্গে তোমাদের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে আসতে হবে। তবে নিজেদের ভাষাটাকে হারিয়ে যেতে দেবে না। নিজেদের মধ্যে সবসময় নিজ ভাষায় কথা বলবে। তোমাদের গান, কবিতা, কিচ্ছা-কাহিনি রক্ষা করতে হবে এবং আমাদের দেখিয়ে দিতে হবে তোমরা একটি সমৃদ্ধ সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী।'
অনেক আগে থেকেই কড়াদের নিয়ে কাজ করছে মুস্তাফিজুর রহমান রূপমের প্রতিষ্ঠান ‘ভাবনা’। এইচএসসির পর লাপোলকে দিনাজপুরে নিয়ে আসা, থাকা-খাওয়া থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কোচিংয়ের ব্যবস্থাসহ সবকিছু করেছে ভাবনা। এবার তারা লাপোলের মতো শত শত লাপোলকে তৈরির উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠা করলো ‘কড়া পাঠশালা’। পাঠশালাটির উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সেই বার্তাটিই দিলেন রূপম।
তিনি বলেন, ‘শিক্ষায় এগিয়ে আনতে না পারলে সংখ্যালঘুদের মধ্যেও সংখ্যালঘু কড়াদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। নিত্যদিনের ক্ষুধার অন্ন সংস্থান করাই এখানে কঠিন লড়াইয়ের বিষয়। তবু অভিভাবকরা তাদের শিশুদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন। অবশ্য বাংলা ভাষার সঙ্গে অভ্যস্ত হওয়ার আগেই ঝরে পড়ে কেউ কেউ। নিজেদের তেমন শিক্ষাদীক্ষা নেই বলে অভিভাবকরা শিশুদের পাঠগ্রহণে সহযোগীর ভূমিকা নিতে পারেন না। গৃহশিক্ষক রাখার মতো সামর্থ্যও নেই এই অভিভাবকদের। তাই উন্নয়ন সংস্থা ‘ভাবনা’ কড়াদের গ্রামে একটি বিকল্প পাঠশালা প্রতিষ্ঠা করেছে।’
কড়াদের সবচেয়ে শিক্ষিত ছেলে লাপোল কড়া বলেন, ‘পড়াশোনা করার জন্য আমাকে যে কষ্ট করতে হয়েছে, আমার গ্রামের ছোট ভাইবোনদের তা করতে হবে না। প্রাইভেট টিউটরের বেতন জোগানোর জন্য আমাকে দিনমজুরি করতে হয়েছে। কিছু ভালো মানুষ এগিয়ে না এলে আমি এতদূর আসতে পারতাম না। তারা এখন আমাদের গ্রামের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদান সহজ করে দিতে এসেছেন।’
তিনি বলেন, ‘আপাতত অস্থায়ী একটি ঘরে এর কার্যক্রম শুরু হয়েছে। একে স্থায়ী রূপ দেওয়ার জন্য প্রয়োজন একটি ঘর। সেখানে চেয়ার-টেবিল, বেঞ্চ ও ব্ল্যাক বা হোয়াইট বোর্ডের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষকদের বেতন দেওয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির জন্য জায়গা দানকারীকে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়াসহ টিফিন পিরিয়ডে শিক্ষার্থীদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া এই শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পাবে, তাদের জন্য বৃত্তি প্রয়োজন। এজন্য অন্তত ১০ বছর মেয়াদী একটি প্রকল্প প্রণয়ন করতে হবে। ১০ বছর পর্যন্ত কড়া পাঠশালা পরিচালনা করা গেলে গ্রামটির নতুন প্রজন্ম শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে সক্ষম হবে।’
প্রসঙ্গত, সংখ্যাগত কিংবা শিক্ষাগত কোনো দিক দিয়েই সুবিধাজনক অবস্থায় নেই কড়ারা। বাংলাদেশে ২৮টি পরিবার রয়েছে তাদের। যেখানে সদস্য সংখ্যা ১০৪ জন। এর মধ্যে স্কুলগামী শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র ১০ জন।