ক্ষমতায় টিকে থাকার লড়াইয়ে ইমরান খান

রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। তিনি এখন ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য লড়ছেন। ইতিমধ্যে তিনি বিরোধীদের আনা অনাস্হা প্রস্তাবের পেছনে বিদেশি ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন। পরিস্হিতি নিয়ে পাকিস্তানের সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে একের পর বৈঠক করছেন। বৃহস্পতিবারও তিনি দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো—তার তেহরিক-ই-ইনসাফ পার্টির (পিটিআই) কয়েক জন সদস্যের দল ত্যাগ এবং জোট সরকার থেকে শরিক দলের সরে যাওয়ায় তার প্রধানমন্ত্রী থাকার আর কোনো সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

পার্লামেন্টে অনাস্হা ভোটের মাধ্যমে ইমরান খানকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে অপসারণের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে বেশ কিছু বিরোধী দল। বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ জাতীয় পরিষদে অনাস্হা প্রস্তাবের ওপর বিতর্ক শুরু হতেই ভোটাভুটির দাবি তোলেন বিরোধী আইনপ্রণেতারা। এ নিয়ে হট্টগোলের মুখে কয়েক মিনিটের মধ্যেই অধিবেশন মুলতুবি করেন ডেপুটি স্পিকার কাসিম সুরি। আগামী রবিবার আবারও অধিবেশন বসবে। আগামী ৪ এপ্রিলের মধ্যেই অনাস্হা প্রস্তাবের ওপর ভোটাভুটি হবে।

সরকার টিকিয়ে রাখতে হলে জাতীয় পরিষদে ইমরান খানের সদস্যের সমর্থন লাগবে। জিও নিউজের এক খবরে বলা হয়েছে, শরিকরা ত্যাগ করায় এবং তার দলের কয়েক জন আইনপ্রণেতা সরে যাওয়ায় ইমরান খানের প্রতি এখন ১৪২ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন রয়েছে। অন্য দিকে অনাস্হা প্রস্তাবের পক্ষে ১৯৯ জন আইনপ্রণেতা সমর্থন দিচ্ছেন। ফলে সবকিছু ঠিক থাকলে অনাস্হা ভোটে ইমরানের জয়ের কোনো সুযোগ নেই।

তার পরও ইমরান খান ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার তার বিশেষ সহকারী শাহবাজ গিল বলেন, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করবেন না। বরং সর্বশক্তি দিয়ে শেষ পর্যন্ত বিরোধীদের সঙ্গে লড়বেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ইমরান এক সাম্রাজ্যবাদীর বিরুদ্ধে লড়ছেন। স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি চাওয়ার জন্য জুলফিকার আলী ভুট্টোকে যে সাম্রাজ্যবাদী হত্যা করেছিল। বিরোধী দুর্নীতিবাজ নেতারা তার জন্য কোনো বিষয় নয়।

বিদেশি ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ইমরানের, নাকচ ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আর দুর্নীতি রোধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০১৮ সালের জুলাইয়ে ক্ষমতায় আসা ইমরান খান অবশ্য সহজে ক্ষমতা ছাড়ছেন না। তিনি এখনো কতটা জনপ্রিয়, তার প্রমাণ হিসেবে গত রবিবার ইসলামাবাদে বিশাল এক সমাবেশের আয়োজন করেন সাবেক এই ক্রিকেটার। ওই সমাবেশে ইমরান খান তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের ইঙ্গিত করে সমবেত মানুষের প্রতি একটি চিঠি প্রদর্শন করেন, যেটিতে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত চোর’দের সহায়তায় ‘বিদেশি চক্রান্েতর’ মাধ্যমে তার সরকার উত্খাতের চেষ্টার প্রমাণ রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

বুধবার কয়েক জন সাংবাদিকের কাছে চিঠির বিষয়বস্ত্ত প্রকাশ করেছে পাকিস্তান সরকার। যেখানে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের একটি বিদেশি মিশন থেকে কূটনৈতিক চ্যানেলে চিঠিটি এসেছে। বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ঐ দেশের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পাকিস্তানের দূতকে বলেছেন, ইমরান খানের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে। বিশেষ করে তার রাশিয়া সফর ও ইউক্রেন যুদ্ধে পাকিস্তানের অবস্হান নিয়ে।

ঐ দেশের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক ইমরান খানের অনাস্হা ভোটের ওপর নির্ভর করছে। এই অনাস্হা ভোটে ইমরান খান টিকে গেলে তার ফল গুরুতর হবে। এই বার্তা গত ৭ মার্চ আসে। এর এক দিন পরই বিরোধীদলগুলো পার্লামেন্টে ইমরান খানের বিরুদ্ধে অনাস্হা প্রস্তাব পেশ করে।

পাকিস্তানের সংবাদপত্র ডনের এক খবরে বলা হয়েছে, এই বার্তা পাঠিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের তখনকার রাষ্ট্রদূত আসাদ মাজিদ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী মন্ত্রী ডোনাল্ড লুর সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি এই বার্তা পাঠান। রাষ্ট্রদূত মাজিদ এখন ব্রাসেলসে নতুন দায়িত্বে যোগ দিয়েছেন। 

এক জ্যেষ্ঠ পাকিস্তানি কর্মকর্তা ডনকে বলেন, ঐ বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কথা-বার্তা অস্বাভাবিক রূঢ় ছিল। তবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে কোনো নির্দিষ্ট বার্তা দেওয়ার কথা অস্বীকার করেছে ওয়াশিংটন। মার্কিন পররাষ্টÌ মন্ত্রণালয় বলেছে, পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্হিতি পর্যবেক্ষণ করছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। পাকিস্তানে আইনের শাসনকে সমর্থন করে তারা। প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে আনা অনাস্হা প্রস্তাবের বিষয়ে বলেছে, পাকিস্তানের সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে সম্মান জানায় যুক্তরাষ্ট্র।

এদিকে বিবিসির এক খবরে বলা হয়েছে, অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন বর্তমান সংকটের শুরু অক্টোবরে, যখন ইমরান খান পাকিস্তানের প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্হা আইএসআইর নতুন প্রধানের নিয়োগপত্রে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানান। সিঙ্গাপুরভিত্তিক গবেষক আবদুল বাসিত মনে করেন, ইমরান খানের আত্মাভিমান ও অনমনীয়তা এই দ্বন্দ্বকে জনসম্মুখে নিয়ে এসেছে। যে দ্বন্দ্ব নিয়ে সবসময় লোকচক্ষুর আড়ালেই আলোচনা চলত।

ইমরান খান সেনাবাহিনীর টেনে দেওয়া সীমারেখা অতিক্রম করেছেন। পরবর্তীকালে যখন থেকে তিনি সেনাবাহিনীর পছন্দের লোককেই নিয়োগ দেন, তখন থেকে তার পতনের শুরুটা হয়। তবে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও ইমরান খান দুই পক্ষই নিজেদের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েনের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।

প্রসঙ্গত, পাকিস্তানের ৭৫ বছরের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত কোনো প্রধানমন্ত্রী তার মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। বর্তমান সরকার দেশের অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে বিপর্যয় ডেকে এনেছে অভিযোগ করে অনাস্হা প্রস্তাব দেয় বিরোধীরা। ৪ এপ্রিলের মধ্যে এই প্রস্তাবের ওপর ভোটাভুটি হবে।

পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে এর আগে দুবার দায়িত্বরত প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অনাস্হা ভোটের প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়েছে। তবে সেই দুবারই তত্কালীন প্রধানমন্ত্রীরা—১৯৮৯ সালে বেনজীর ভুট্টো এবং ২০০৬ সালে শওকত আজিজ—দায়িত্বে থেকে যেতে সক্ষম হন। কিন্তু পাকিস্তানের বর্তমান সংসদীয় সমীকরণ বলছে এই দফায় ইমরান খান বড় ধরনের পরাজয়ের সম্মুখীন হতে চলেছেন।