চট্টগ্রামের কর্ণফুলী-পটিয়ায় সুপেয় পানির সংকট

চট্টগ্রামের কর্ণফুলি ও পটিয়া উপজেলায় নদীর উপকূলীয় এলাকায় শিল্প কারখানায় পানির চাহিদা মেটাতে অসংখ্য গভীর নলকূপ বসানো হয়েছে। এক একটি শিল্প কারখানায় একাধিক নলকূপ রয়েছে। আবার সরকারিভাবে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে সুপেয় পানির চাহিদা মেটাতে অসংখ্য গভীর নলকূপ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।

পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে নিচে নেমে যাওয়ায় এসব এলাকায় বসবাসকারীদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে বসানো অগভীর নলকূপগুলোতে বিশুদ্ধ পানি মিলছে না। আবার পানিতে অতিমাত্রায় লবণাক্ততার কারণে পান করা যাচ্ছে না। ভূ-উপরস্থ পানি সরবরাহের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় কারখানাগুলোতে গভীর নলকূপ বসিয়ে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে এসব এলাকায় বসবাসকারীরা সুপেয় পানির তীব্র সংকটে পড়েছেন।

কর্ণফুলি নদীর দক্ষিণ ও পূর্ব তীরে ছোট বড় অনেক শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে। নদীর তীরবর্তী এসব এলাকায় শিল্পায়ন ক্রমশই সম্প্রসারিত হচ্ছে। শিল্প কারখানায়  বিশুদ্ধ পানির চাহিদা মেটাতে অসংখ্য গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। কোনো কোনো কারখানায় একাধিক নলকূপ বসানো হয়েছে। এ কারণে শিল্প কারখানার আশপাশের বিশাল এলাকা জুড়ে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যাওয়ায় এলাকায় অগভীর হাজারো নলকূপ অকেজো হয়ে পড়েছে। 
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, জুলধা, শিকলবাহা, বড়উঠান, চরলক্ষ্যাসহ আশপাশের কয়েকটি এলাকায় খাবার উপযোগী পানি পেতে ১ হাজার ফুটের বেশি গভীরে যেতে হচ্ছে। কিন্তু এসব গভীর নলকূপ বসানো অনেক ব্যয়বহুল। ফলে এলাকার বাসিন্দাদের অধিকাংশের পক্ষেই গভীর নলকূপ বসানো সম্ভব হচ্ছে না। 

পটিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, ‘কোলারগাঁও, হাবিলাইশদ্বীপ, কুসুমপুরা, শিকলবাহা, জুলধা এলাকায় নলকূপের পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বেশি হওয়ায় তা পান করা যাচ্ছে না। এসব এলাকায় শিল্পকারখানাগুলোতে অবৈধভাবে নলকূপ বসিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করা হচ্ছে। তারা পরিবেশ অধিদপ্তর বা সরকারি কোনো সংস্থা থেকে ছাড়পত্রও নিচ্ছে না। কিছু কারখানায় নলকূপের মাধ্যমে পানি উত্তোলনের পর তা বোতলজাত করে মিনারেল ওয়াটার নামে বিক্রি করা হচ্ছে। সুপেয় পানির চাহিদা নিরসনের জন্য সরকারিভাবে গভীর নলকূপ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। এর ফলেও এসব এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নেমে যাচ্ছে। এখানে অবৈধভাবে পানি উত্তোলন বন্ধ করতে হবে।’

পটিয়া উপজেলার সদর ও পশ্চিম পাশের এলাকা এবং কর্ণফুলি উপজেলায় বিশুদ্ধ পানির সংকট নিরসনের জন্য চট্টগ্রাম ওয়াসা প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে একটি পানি শোধনাগার নির্মাণের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করে। প্রকল্পটি বোয়ালখালী উপজেলার ভান্ডালজুড়ি এলাকায় নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পের অর্ধেক অর্থের জোগান দিচ্ছে কোরিয়ান এক্সিম ব্যাংক। বাকি অর্থের জোগান বাংলাদেশ সরকার দিচ্ছে। 

প্রকল্প সূত্র জানায়, শোধনাগার থেকে পানি এনে রাখার জন্য পটিয়া বাইপাস সড়ক এলাকায় ও কর্ণফুলি উপজেলার দৌলতপুর এলাকায় দুটি রিজার্ভার নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পের ১৩০ কিলোমিটার পাইপ লাইনের মধ্যে ১২০ কিলোমিটার পাইপ লাইন বসানো হয়েছে। ভান্ডালজুড়ি প্রকল্প থেকে পটিয়া পৌরসভা পর্যন্ত পাইপ লাইন বসানো হয়েছে। পটিয়া পৌরসভা এলাকায় বিতরণ লাইন বসানোর কাজ শেষ। ট্রিটমেন্ট প্লান্টের নির্মাণ কাজ চলছে। প্লান্টে এখন মেশিনারি বসানো হবে। কোরিয়ান ইপিজেডে পাম্প স্টেশন নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। 

ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মো. মাকসুদ আলম জানান, প্রকল্পের কাজ ৬০ শতাংশের বেশি শেষ হয়েছে। ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ রয়েছে। আশা করা যায়, নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা অনেকাংশে কমে যাবে।’

এদিকে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর কর্ণফুলি উপজেলার দৌলতপুর এলাকায় একটি প্রোডাকশন টিউবঅয়েল নির্মাণের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এতে উত্তোলিত পানি পাইপ লাইনের মাধ্যমে আবাসিক পর্যায়ে সরবরাহ করা হবে। 

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী সুমন রায় ইত্তেফাককে জানান, এই প্রোডাকশন টিউবঅয়েল থেকে দৈনিক ৩০০ থেকে ৪০০ পরিবারকে পানি সরবরাহ দেওয়া যাবে। প্রতি লিটার পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা ৬০০ মিলিগ্রামের কম হলে তা পান করা যায়। তবে কর্ণফুলি উপজেলার কিছু এলাকায় পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা অনেক বেশি।’