২০১৮ সালে ইস্তাম্বুলের কনস্যুলেটের ভেতরে সৌদি সাংবাদিক জামাল খাসোগজিকে হত্যা করা হয়েছিল। জামাল খাসোগজি হত্যার পরে বিশ্বব্যাপী আলোচিত হয় ঘটনাটি। ২০২০ সালে মিনিয়াপোলিস শহরে জর্জ ফ্লয়েডকে মাটিতে ফেলে এক পুলিশ হাঁটু দিয়ে গলা চেপে ধরে এবং ফ্লয়েড মারা যায়। একজন জামাল খাসোগজির হত্যা বা ফ্লয়েডের মৃত্যু বিশ্ববাসীর মনে যে আঘাত, আলোচনা এবং ট্রাজেডির সৃষ্টি করেছিল, ঠিক একই সময়ে সিরিয়া, ফিলিস্তিন কিংবা ইয়েমিনে হাজার হাজার নারী-পুরুষ এবং শিশুহত্যাও এতটা প্রভাব ফেলেনি। কারণ দীর্ঘ সময় ধরে চলা হত্যাকাণ্ড মানুষের মধ্যে ট্রাজেডির সৃষ্টি করে না। আবার গণহত্যার মধ্যে কিছু ঘটনা আছে, যা মানুষের হৃদয়ে নাড়া দেয়, সেটা কেবলই ব্যতিক্রম কোনো ঘটনা।
যেমন, সিরিয়ার শিশু আয়লান কুর্দির মৃত্যু। ৫১ বছর আগে পাকিস্তানি বাহিনী বাংলার মাটিতে বাংলার মানুষের ওপর গণহত্যা চালিয়েছিল। সেই ঘাতকদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়েছিল বাংলা মায়ের সূর্য সন্তানরা। প্রতিরোধ গড়তে গিয়ে অজস্র মানুষ হাসিমুখে মৃত্যুকে বরণ করে নেয়।
আমাদের সেই মহান যুদ্ধের সময়ের এক মায়ের কথা মনে পড়ছে। যিনি তার সন্তানের জন্য মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলেন। পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে বন্দি থাকা অবস্হায় ভাত খেতে পারেনি। মায়ের সঙ্গে দেখা হলে ভাত খাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিল। কিন্তু, মা পরদিন খাবার নিয়ে গিয়ে আর সন্তানের দেখা পাননি। ছেলে খায়নি, ছেলেকে খাওয়াতে পারেনি, এই কষ্টে পরবর্তী ১৪ বছর তিনি কখনো ভাত খাননি। যুদ্ধের সময়ে সন্তান হারানো এক মায়ের গল্প এটা। এমন সন্তান হারানো হাজারো মায়ের গল্প আমাদের হয়তো অজানা রয়েছে।
আধুনিক পৃথিবীতে মানুষ এখন সভ্য। মানুষ বনজঙ্গল ছেড়ে এখন আধুনিক সভ্য বাসিন্দা তারা। কিন্তু, আধুনিক সভ্যতায় এসে তারা এখনো যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় মেতে ওঠে। সবচেয়ে সভ্য জাতি যারা, তারা নিজেদের অস্ত্র ব্যবসায় মুনাফা বৃদ্ধির আশায় পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা খেলে। সভ্যতার সময়ে এসে এখনো মানুষ মানুষের থেকে নিরাপত্তার জন্য মারণাস্ত্র তৈরি করে। পৃথিবীতে যার কাছে যতবেশি মারণাস্ত্র আছে তাদের নিরাপত্তা এখন সবচেয়ে বেশি। তারা নিরাপত্তার নামে সমর বাহিনীর জোট গঠন করে। অন্যের ওপর কর্তৃত্ব খাটানো, প্রভাব বিস্তার করা আদিম পৃথিবীর আদিম সংস্কৃতি। কিন্তু এখনো পৃথিবীর অনেক দেশে কর্তৃত্ববাদীদের যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধ চলছে ইউক্রেনেও। গত ২৪ মার্চে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ১ মাস পূর্ণ হয়েছে।
যুদ্ধের মধ্যে ইউক্রেন হটলাইন খুলেছে। খবরে দেখেছি সেখানে রাশিয়ান সৈন্যদের পরিবারের সদস্যের অনেকেই ফোন দিয়ে কারো সন্তান, কারো স্বামী, কারো বাবার খবর জানতে চাচ্ছে। কিন্তু, সেখান থেকে তেমন কোনো সাড়াই পাচ্ছে না। কেউ তাদের খবর দিতে পারেনি। এদিকে ইতিমধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে দুপক্ষের বেশ কিছু আলোচনা হয়েছে। জাতিসংঘ যুদ্ধ বন্ধের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তুরস্কে আবারও আলোচনায় হয়েছে দুপক্ষের। তাদের সবার চেষ্টায় হয়তো একদিন যুদ্ধ বন্ধ হবে। অথবা কেউ একজন পরাজিত হবে এবং তারা বাহ্যিকভাবে পরাজয় বরণ করে নিবে। তার মধ্য দিয়ে তখন হয়তো যুদ্ধের সমাপ্তি হবে।
আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা একবার বলেছিলেন, ‘রাশিয়া বড় শক্তি, কিন্তু পরাশক্তি নয়।’ হয়তো নিজেকে পরাশক্তি হিসেবে প্রমাণ করার জন্য হলেও এই যুদ্ধে রাশিয়া জয়ের জন্য সবকিছু করবে। তার কিছুটা প্রমাণ আমরা প্রায়ই গণমাধ্যমে দেখি। এই কয়দিন আগে দেখলাম, রাশিয়ার অস্তিত্ব সংকটের সম্ভাবনা হলে রাশিয়া পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারে পিছুপা হবে না বলে হুমকি দিচ্ছে। এই শক্তির হিসেবে হয়তো রাশিয়ার জয় হবে।
একদিন বিজয়ের বেশে সৈন্যরা রাশিয়ার ব্যারাকে ফিরবে। তখন রাশিয়ান জাতি তাদের অভিনন্দিত করবেন। আর যারা ফিরবে না, তাদের দেওয়া হবে শহিদের সম্মান। বলা হবে, তারা রাশিয়ান জাতির বীর সন্তান, তারা রাশিয়ান জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, তারা রাশিয়ান জাতির সম্মান বাঁচাতে জীবন বিসর্জন দিয়েছে। তাদের স্মৃতি রক্ষার্থে বানানো হবে স্মৃতিসৌধ। প্রতি বছর ঐ দিবসে তাদের স্মরণ করে দেওয়া হবে ফুল। ফুল দিয়ে স্মরণ করার সময় বলবে, ‘তারা রাশিয়ান শ্রেষ্ঠ বীর ছিল’। কিন্তু যাদের স্মরণ করার সময় নামের সামনে বিভিন্ন উপমা দিয়ে স্মরণ করা হয়, তাদের মায়েরা জানে কেবল সে তার সন্তানকে হারিয়েছে। যেভাবে রাশিয়ানদের মনে করেছি।
যদি এর উল্টো হয়, যদি ইউক্রেন জয়ী হয়। তখন শরণার্থী ইউক্রেনবাসী ফিরবে তার স্বদেশে। চিরচেনা শহরে পুরোনো স্মৃতি হয়তো তাদের তাড়িয়ে বেড়াবে, যুদ্ধের গোলার আঘাতে ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে প্রিয় মানুষকে খুঁজবে। এ যুদ্ধে যারা মারা যাবে তাদের একইভাবে স্মরণ করা হবে। সবাই বাহ্যিক জয়ে উল্লাসে মেতে উঠবে। এই পৃথিবী আর কতটুকু সভ্য হলে পৃথিবী মানুষের জন্য নিরাপদ বাসযোগ্য হবে? পৃথিবীর আধুনিক সভ্যতায় যত বড় সত্য হোক না কেন, তার সপক্ষে মৃত্যুর মিছিল বা যুদ্ধ কখনোই মানবতার জন্য কাম্য নয়।
লেখক: শিক্ষার্থী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে, সিলেট