পরিবেশ বিপর্যয় রোধে তরুণ প্রজন্ম

আপডেট : ২০ মার্চ ২০২৪, ০৪:৩০

মানবজাতি আজ উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে যাচ্ছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে প্রবেশ করছি আমরা। ঠিক এই সময়ে আমরা মহাবিশ্বে আমাদের একমাত্র বাসযোগ্য গ্রহটিকে টিকিয়ে রাখার দুশ্চিন্তায় আতঙ্কগ্রস্ত। ধরিত্রীবিনাশী মানুষ্যসৃষ্ট অন্যান্য কারণের মধ্যে পরিবেশদূষণ সবচেয়ে বিধ্বংসী ভূমিকা পালন করছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ফিলিস্তিনে ইসরাইলি আগ্রাসন এবং এতদসংক্রান্ত ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কা নতুন মাত্রা যোগ করছে। বাংলাদেশসহ দরিদ্র দেশগুলোতে মাত্রাতিরিক্ত পলিথিন প্লাস্টিকের ব্যবহার এবং এগুলো মাটি ও পানিদূষণসহ নানা জটিলতা সৃষ্টির পাশাপাশি খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনেক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান পরিবেশদূষণ রোধসংক্রান্ত নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও আমরা সুফল ভোগ করছি খুব সামান্যই। বরং দিনে দিনে পরিস্থিতির অবনতিই হচ্ছে।

জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারলে এই পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। একই সঙ্গে প্রয়োজন পরিবেশসংশ্লিষ্ট আইনের যথাযথ প্রয়োগ। মাস দুই আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, আমার শিক্ষক, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. বিধান চন্দ্র দাস স্যার বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব পাশের ‘যমুনা রিসোর্ট’-এর ভেতরে অবস্থিত ‘বঙ্গবন্ধু আঞ্চলিক জাদুঘর’ পরিদর্শনে এসেছিলেন। স্যারের সঙ্গে আমিও উপস্থিত ছিলাম। আমাদের সঙ্গে ছিলেন মো. আমিনুল ইসলাম, যিনি ট্যাক্সিডার্মি স্পেশালিস্ট এবং জার্মানিতে একটি আঞ্চলিক জাদুঘরের প্রধান হিসেবে কর্মরত। ট্যাক্সিডার্মি হলো কোনো প্রাণীকে জাদুঘরে উপস্থাপন বা গবেষণার জন্য বিশেষ প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত করার বিদ্যা। মৃত প্রাণীর চামড়া নিয়ে একটি কৃত্রিম শরীরে এমনভাবে সংযোজন করা হয়, যাতে মনে হবে প্রাণীটি জীবিত। এর ফলে বিজ্ঞানীগণ বা জাদুঘরে আসা পরিদর্শকগণ দেখতে পারেন যে, প্রাণীটি জীবিতাবস্থায় আসলে কেমন ছিল।

বঙ্গবন্ধু আঞ্চলিক জাদুঘরটি আমাদের কাছে সমৃদ্ধ বলে মনে হয়েছে। প্রায় ৫ হাজার স্পেসিমেন আছে এখানে। এছাড়া ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত বেশ কিছু সংগ্রহ রয়েছে জাদুঘরটিতে। তরুণ প্রজন্ম এই জাদুঘর পরিদর্শন করে পরিবেশ-প্রতিবেশ সম্পর্কে অনেক ধারণা পাবে। দেশে এ ধরনের জাদুঘরের সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন।

উল্লেখ্য, প্রায় এক যুগ আগে অধ্যাপক ড. বি সি দাস তার এক গবেষণা প্রকল্পে কাজ করছিলেন। প্রকল্পটিতে ট্যাক্সিডার্মি-সংক্রান্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিল। সেতু বিভাগের কর্মকর্তা জুয়েল রানাসহ আরো বেশ কিছু প্রশিক্ষণার্থী এতে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তারা তাদের অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে এই জাদুঘরকে সমৃদ্ধ করেছেন। এখানে ট্যাক্সিডার্মি সম্পর্কে আলোচনার অবতারণা করা হলো এজন্য, যাতে আমাদের জাদুঘরগুলো আরো আকর্ষণীয় করার পাশাপাশি বিজ্ঞান ও ইতিহাস-ঐতিহ্য শিক্ষার ব্যাবহারিক ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে, যেখানে পরিবেশবিজ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করবে।

বলা বাহুল্য, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পরিবেশ পরিচিতি সমাজ, বিজ্ঞান বই থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে পরিবেশদূষণ, দূষণের কারণ, প্রতিকার বা প্রতিরোধের উপায় নিয়ে বিস্তর পাঠদান গবেষণা চললেও সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা আমাদের জেলা পর্যায়ের জাদুঘরগুলো প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের প্রকৃতি পরিবেশ, পরিবেশদূষণ, দূষণ প্রতিরোধের উপায় সংবলিত ব্যাবহারিক ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারি। মুক্তিযুদ্ধসহ আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের নিদর্শন এখানে থাকবে। সামান্য কিছু প্রচেষ্টার মাধ্যমেই বিদ্যমান জাদুঘরে অথবা জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে এ ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সফরের অংশ হিসেবে এই স্থানগুলোতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকসহ সফর করানো হলে বিনোদনের পাশাপাশি ব্যাবহারিক শিক্ষা সম্পন্ন হয়ে যেতে পারে। আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা গেলে তাদের শিখন অপেক্ষাকৃত দীর্ঘস্থায়ী এবং পরবর্তীকালে বাস্তব জীবনে তারা প্রয়োগ করতে পারবে। নতুন প্রজন্ম এভাবে পরিবেশদূষণ সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠবে।

উদাহরণস্বরূপ আমরা পলিথিন ও প্লাস্টিকের কথা বলতে পারি। এগুলো কীভাবে পরিবেশে আসছে, পরিবেশ দূষণ বা বিপর্যয় কীভাবে করছে, কীভাবে তা প্রতিরোধ অথবা এর প্রতিকার করা যায়, খুব সহজেই আকর্ষণীয় মডেলের মাধ্যমে জাদুঘরে প্রাকৃতিক পরিবেশের মতো করে উপস্থাপন করা সম্ভব। এতে আনন্দের সঙ্গেই তারা এগুলো শিখতে পারবে। উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের আশপাশের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে অথবা পরিবেশ বিপর্যয়ের অভিঘাতে জর্জরিত এলাকাগুলোয় শিক্ষা সফরের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে এলাকার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ শিক্ষকদের সহায়তা নেওয়া যায়। এতে আশাবাদী হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। আমরা সাতক্ষীরার অল্পশিক্ষিত যুবকের দূষণমুক্তভাবে পলিথিন থেকে জালানি তেল উত্পাদনের খবর পত্রিকায় দেখে থাকি। জালানিবিহীন গাড়ি উদ্ভাবনের খবরও পাই। এসব ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ তথা সরকারের যথাযথভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন।

আমাদের বিশ্ব উষ্ণায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন, উজান থেকে নেমে আসা পানির অভাবে নদনদী ও জলাশয়ের করুণ দশাসহ নানাবিধ অভিঘাত মোকাবিলা করে টিকে থাকতে হবে। এ জন্য আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টিসহ নানামুখী বিকল্প উদ্ভাবনের চিন্তাভাবনার উন্মেষ ঘটাতে হবে।

লেখক :পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, মাওলানা ভাসানী

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, টাংগাইল

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন