ছোটবেলায় এলাকার মেধাবী মুখ হিসেবে পরিচিতি থাকলেও সেরাদের সেরা হতে না পারার আক্ষেপটা সবসময় দগ্ধ করেছে সুকান্তকে। কিন্তু কে জানত— এই আক্ষেপই এক সময় তাকে পৌঁছে দেবে সফলতার সর্বোচ্চ শিখরে। স্কুল-কলেজে আশানুরূপ ফল আসেনি ঠিকই, কিন্তু ডিপার্টমেন্টের সর্বকালের সেরা ছাত্র হয়ে ক্যারিয়ার গড়ার সক্ষমতা দেখিয়েছেন বিশ্ববিখ্যাত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অ্যামাজনে।
সুকান্ত চৌধুরীর বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামের পাহাড়তলী থানার অন্তর্গত দক্ষিণ কাট্টলীতে। পড়ালেখা করেছেন স্থানীয় পিএইচ আমীন একাডেমিতে। আগে থেকেই চট্টগ্রাম কলেজে পড়ার প্রবল আগ্রহ ছিল সুকান্তের। কিন্তু মাধ্যমিকের ফল এতটাই খারাপ হলো যে, ফর্মই কিনতে পারলেন না। এরপর হাজী মহসিন কলেজের ভর্তি পরীক্ষাতেও সুবিধা করতে না পেরে ভর্তি হন আলহাজ মোস্তফা হাকিম ডিগ্রি কলেজে। ঠিক সে সময় এক দুর্বিষহ অন্ধকার নেমে আসে তার জীবনে। বাবার চাকরি চলে যায়, পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে। এতকিছুর পরও হাল ছাড়েননি, টিউশন করিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারেও সহযোগিতা করতে থাকেন।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনকে টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে মনে করেন তিনি। ২০০৫ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েই স্কুল-কলেজে না পারা সব আক্ষেপ ঘুচাতে থাকলেন। প্রথম থেকে শেষ বর্ষ পর্যন্ত ডিপার্টমেন্টে প্রথম হওয়ার কৃতিত্ব দেখালেন। এরপর স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে রেকর্ড মার্কস পেলেন। অবশ্য তখনো তাকে দিন-রাত টিউশন করে নিজের ও পরিবারের খরচ বহন করতে হচ্ছে। ডিপার্টমেন্টের সেরা ছাত্র হওয়ায় একটা সময় সেখানকার শিক্ষক হওয়ার অপেক্ষাতে ছিলেন। কিন্তু বিধি-বাম! শূন্য পদ না থাকায় তার সে আশা পূরণ হয়নি। সে সময় নিজ বিভাগ, ফলিত পদার্থবিজ্ঞানের আরিফ স্যারের পরামর্শে জিআরই, টোফেল’র প্রস্ত্ততি নিতে থাকেন এবং একসময় উড়াল দেন ইউনিভার্সিটি অব লুইসভিলে’র উদ্দেশ্যে।
গত বছর সবকিছু যখন স্বাভাবিক হওয়ার পথে, তখন তিনটি প্রতিষ্ঠানে (অ্যাপল, ফেসবুক ও অ্যামাজন) আবেদন করেন সুকান্ত। এর মধ্যে ফেসবুক ও অ্যামাজন তার প্রতি ইতিবাচক থাকলেও, শেষ পর্যন্ত অ্যামাজনকেই বেছে নেন তিনি। পাঁচ সপ্তাহে পাঁচটি ধাপ অতিক্রম করে অ্যামাজনের একজন সদস্য হিসেবে বিবেচিত হন সুকান্ত।
নিজের এই আকাশচুম্বী সাফল্য সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘শেষ যেদিন ইন্টারভিউ দিলাম, সেদিনই জবের ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলাম। সারারাত ঘুমাতে পারি নাই।’ এতদূর আসার পেছনে চাচা রনদীশ চৌধুরীর অবদানকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করলেন সুকান্ত। সেইসঙ্গে পথপ্রদর্শক হিসেবে শিক্ষক আরিফ ইফতেখার মাহমুদের কথাও স্মরণ করেন। বর্তমানে অ্যামাজনের অপটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন সুকান্ত। এখানে তার মূল কাজ অপটিক্যাল কম্পোনেন্ট ডিজাইন করা। অদূর ভবিষ্যতে নিজেকে আরও ছাড়িয়ে যেতে চান, পৌঁছাতে চান শীর্ষস্থানে। আসলেই কি তা সম্ভব! কোনো কিছুকে অসম্ভব মানতে নারাজ এই মেধাবী যুবক। তার মতে, লেগে থাকলে কিছু একটা তো হবেই।