হাওরের সোনালি ধানের সুরক্ষা নিশ্চিত হবে কি?

সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলার হাওরগুলো বোরো ধান উৎপাদনের অন্যতম উত্স। কিশোরগঞ্জ হাওর অঞ্চলের গেটওয়ে হিসেবে পরিচিত। বর্ষাকালে থৈ থৈ পানির নিচে নিমজ্জিত হাওর বোরো মৌসুমে নাড়ী উজাড় করে প্রসব করে সোনালি ধান, যা দিয়ে সারা দেশের মানুষের খাদ্যঘাটতি পূরণ হয়। কৃষকগণ তাদের পরিশ্রমের প্রতিদান হিসেবে পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তাসহ অন্যান্য খরচ মিটানোর জন্য অবলম্বন পায়।

হাওর অঞ্চলগুলোতে বোরো ধান হলো প্রধান ফসল। একটি ফসলের ওপর নির্ভর করে সারা বছরের পরিকল্পনা করেন কৃষকরা। বোরো ফসলের খরচ মিটাতে অনেকেই ধারদেনা করেন। ফসল উঠলে ধার পরিশোধ করে পুরো বছর নিশ্চিন্তে চলতে পারবেন সেই আশায়। বোরো ধান ভালোভাবে ঘরে তোলার ওপর ভরণপোষণ, সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা সব কিছু নির্ভর করে। কয়েক হাজার কৃষি শ্রমিক বোরো মৌসুমের অপেক্ষায় থাকে। ফসল মাড়াইয়ের কাজ করে উপার্জিত অর্থ দ্বারা তাদের সংসার চলে। কৃষিক্ষেত্রে সরকারের দূরদর্শী পরিকল্পনার ফলে কোভিড-১৯ মহামারিতেও দেশে খাদ্যঘাটতি হয়নি।

একমাত্র ফসল ঘরে তুলতে কৃষক-কিষানিরা দিন-রাত পরিশ্রম করে কৃষি জমিতে। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে তাদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় দোল খায় সোনালি ধান। স্বপ্ন বোনে কৃষক। কিন্তু হাওরে হঠাত্ পানি এসে ছিনিয়ে নিয়ে যায় তাদের সন্তানের মতো আদর-যত্নে তিল তিল করে ফলানো সোনার ধান। সর্বশেষ ২০১৭ সালে হাওরগুলোতে আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক ফসলহানি ঘটে। সারা দেশে এর প্রভাব পড়ে।

খাদ্যদ্রব্যের দাম চলে যায় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। চলতি বছরের বোরো ধানের ভালো ফলনের আশা করছেন কৃষক এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণ। সারা দেশে ২ কোটি ১১ লাখ টন বোরো ধান উৎপাদিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কিন্তু উজানের পানি হাওরে আসতে শুরু করেছে। মূলত মেঘালয় ও চেরাপুঞ্জির অতি বর্ষণের পানি বাংলাদেশে প্রবেশ করলে সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ কিশোরগঞ্জের হাওরগুলো বন্যার কবলে পড়ে। সম্প্রতি উজানের পানি হাওরে প্রবেশ শুরু করলে কৃষকগণ আতঙ্কিত হয়ে সন্তানতুল্য একমাত্র ফসল রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

মেঘালয়ের পানি হাওরে প্রবেশ করলে ৩ হাজার হেক্টর বোরো ধানের জমি পানির নিচে নিমজ্জিত হবে। ইতিমধ্যে হাওরের ফসল রক্ষার জন্য কৃষক, সুশীল সমাজসহ বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছে। কৃষকগণ সারা রাত জেগে থেকে বাঁধগুলো পাহারা দিচ্ছে, যাতে বাঁধ ভেঙ্গে হাওরে উজানের পানি প্রবেশ করতে না পারে। তা সত্ত্বেও কিছু কিছু এলাকায় পানি প্রবেশ করেছে।

বিভিন্ন এলাকায় মসজিদে মাইকিং করে লোকদের মাটি কেটে বাঁধ রক্ষার জন্য পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কেউ কেউ তাদের আধা পাকা ধান পানির নিচ থেকে কাটতে বাধ্য হচ্ছে। আর মাত্র কয়েক দিন পরই শুরু হতো ধান মাড়াইয়ের মহাযজ্ঞ। তার পরিবর্তে হাওর এলাকায় মানুষের দিন যাচ্ছে আতঙ্কে এবং অনিশ্চয়তায়।

চলতি বছরে উজানের পানির জন্য ফসলহানি তথা বোরো ধান নষ্ট হলে এলাকায় হাহাকার দেখা দিতে পারে। ফসলহানি হতে খুব বেশি সময় লাগে না। বাঁধগুলো ভেঙে গেলে এক দিনের মধ্যেই সমস্ত হাওর পানির নিচে চলে যেতে পারে। ফলে দেশের প্রত্যাশিত ধান উৎপাদন কমে যাবে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বমুখি দামের সঙ্গে বিষফোঁড়া হিসেবে দেখা দিতে পারে চালের দাম। হাওর এলাকার মানুষ হারাবে তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। ছোট কৃষক বা বর্গাচাষিগণ তাদের ধার-দেনা পরিশোধে অক্ষম হয়ে পড়বে। তাদের আগামী বোরো ধানের অপেক্ষায় থাকতে হবে। অর্থাৎ কষ্টে পতিত হবে পুরো একটি বছর।

সরকারের সংশ্লিষ্টমহল হাওরের ফসল রক্ষায় যথার্থ পদক্ষেপ দ্রুত গ্রহণ করলে হয়তো হাজার হাজার হেক্টর ধানের জমি অপ্রত্যাশিত বন্যার কবল থেকে রক্ষা পাবে। কৃষকগণ তাদের ঘামের বিনিময়ে ফলানো সোনার ধান আনন্দের সঙ্গে ঘরে তুলতে পারবে; মিটাতে পারবে দেশে খাদ্যঘাটতি।

লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়