গবেষণাই উচ্চশিক্ষার মূলমন্ত্র

মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো শিক্ষা। ভলতেয়ারের ভাষায় ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড’। কোনো জাতিকে উন্নতির স্বর্ণ শিখরে আরোহণ করাতে হলে প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার পাশাপাশি উচ্চ শিক্ষার সুযোগও তৈরি করে দিতে হবে। উচ্চ শিক্ষাকে এক কথায় বিশ্লেষণ করলে বলতে হয় গবেষণানির্ভর ও সৃজনশীলতাভিত্তিক শিক্ষা। একটি দেশের আর্থসামাজিক থেকে শুরু করে সব ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন সাধনে উচ্চশিক্ষা অনন্যসাধারণ ভূমিকা রাখে। উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা প্রদানকারী দেশসমূহ অন্যান্য দেশ থেকে প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতে এগিয়ে থাকে। উচ্চ শিক্ষা বলতে স্নাতক, স্নাতকোত্তর, এম ফিল ও পিএইচডি স্তরের পড়াশোনাকে বুঝায়। আর আমাদের বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো হলো বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন কলেজসমূহ। এই দুই ধরনের প্রতিষ্ঠান থেকে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা তাদের উচ্চ শিক্ষা সম্পন্ন করে থাকে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের দেশের এই ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চ শিক্ষা সরবরাহে কতটুকু সক্ষম? এসব প্রতিষ্ঠান কী উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা কিংবা প্রয়োজনীয় পরিবেশ দিতে পারে? গবেষণায় শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করা কিংবা গবেষণার মেটেরিয়ালস বা প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিতে তারা কতটুকু সক্ষম? শিক্ষার্থীদের কী দক্ষ করে গড়ে তোলার জন্য তারা কি ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে? উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের বিশ্বমানের করে গড়ে তোলার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো রূপরেখা কি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর রয়েছে? এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা যদি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তৈরি করা না যায় তাহলে উচ্চশিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়।

দেশে বর্তমানে ৫৮টি সরকারি ও ১০৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চ শিক্ষার জন্য কিছুটা উপযুক্ত পরিবেশ থাকলেও দেশের অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই পরিবেশ নেই। এমনকি অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে টাকার বিনিময়ে সার্টিফিকেট বিক্রি করার অভিযোগও রয়েছে, যা নিশ্চিতভাবেই কোনো একটি দেশের জন্য লজ্জাজনক! গবেষণার উপযুক্ত পরিবেশ না থাকায় এম.ফিল ও পিএইচডি লেভেলের প্রোগ্রামগুলো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুমোদন দিচ্ছে না ইউজিসি। সরকার গবেষণাভিত্তিক উচ্চ শিক্ষা বাস্তবায়ন করতে চাইলেও দেশে ৬০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা কার্যক্রম নেই। গত বছর এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বাবদ কোনো বরাদ্দই ছিল না। ৫৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল না কোনো প্রকাশনা। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক কোনো জার্নালে প্রবন্ধ, সাময়িকী বা কোনো গবেষণাপত্রও প্রকাশ করতে পারেননি।

সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) তাদের ৪৬তম বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা খাতের এমন বেহাল দশা উঠে এসেছে। এসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগতমান সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায় QS World Ranking এদের অবস্থান দেখলে। তখন স্বাভাবিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয় দেশের উচ্চশিক্ষা। অন্য দিকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উচ্চশিক্ষার জন্য কিছুটা পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারলেও এদেরQS World Ranking হতাশ করে আমাদের। এসব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের Ranking বলে দেয় বিশ্বের অন্যান্য দেশের উচ্চশিক্ষার পরিবেশের ও গুণগত মানের তুলনায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গুণগতমান কত নগণ্য। আমাদের দেশের সবচেয়ে প্রাচীনতম ও সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় QS World Ranking (১-৮০০) এর মধো জায়গা করে নিতে পারেনি। অথচ এই বিদ্যাপীঠ আমাদের দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ও গর্বের জায়গা। অন্যদিকে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের ১৬টি বিশ্ববিদ্যালয় ও পাকিস্তানের চারটি বিশ্ববিদ্যালয় ছঝ ডড়ত্ষফ জধহশরহম (১-৮০০) এর মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে।

উচ্চশিক্ষা মানেই গবেষণানির্ভর শিক্ষা। উচ্চ শিক্ষা গ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা গবেষণার মাধ্যমে নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও নতুন কিছু সৃষ্টি করবে। আর এসব প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের এই সুযোগ দেবে এমনটাই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা আর হচ্ছে কই? বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণার দিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সরকারকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। সরকার শিক্ষার্থীদের গবেষণার কাজে উদ্বুদ্ধ করবে। গবেষণার পরিবেশ সৃষ্টি করতে সহায়তা করবে। গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দিবে। সরকার সিভিল সার্ভিস কর্মকর্তাদের জন্য যেমন বিশেষ সুযোগ-সুবিধা, ভাতা, সম্মান ইত্যাদি দিচ্ছে যার ফলে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা গবেষণায় আগ্রহ না দেখিয়ে সিভিল সার্ভিসে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। এর উত্কৃষ্ট প্রমাণ হচ্ছে, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়া ও এমবিবিএস ডাক্তাররাও এখন পররাষ্ট্র ও প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দিচ্ছে। যার জন্য শিক্ষার্থীদের কাছে স্নাতক পাশ করা মানে এখন বিসিএস পরীক্ষার্থী হওয়ার যোগত্যা অর্জন ছাড়া নিছক আর কিছু না। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় পযার্য়ের শিক্ষা কী এমন হওয়ার কথা ছিল? গবেষকদেরও যদি যথাযোগ্য সম্মান ও মূল্যায়ন করা হয়, গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়, উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা হয় তাহলে হয়তো উচ্চ শিক্ষা গ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা গবেষণায় উদ্বুদ্ধ হবে, যা দেশকে বহু দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়