কুমিল্লার মনোহরগঞ্জে পত্রিকা সরবরাহ বন্ধ। এতে পাঠকরা পড়েছেন বিড়ম্বনায়। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি পর্যায়ে পত্রিকাপ্রিয় মানুষের অনেকেই এমন অভিযোগ করেছেন। জানা যায়, বৈশ্বিক মহামারি করোনার সময়ে এই এলাকায় পত্রিকা আসা বন্ধ হয়ে যায়। করোনা শুরুর প্রথম দিকে অধিকাংশ জাতীয় দৈনিক মফস্বল এলাকায় না আসায় বেকার হয়ে পড়েন স্থানীয় হকাররা। দীর্ঘ সময় বেকার বসে থাকার পর তাদের অনেকেই পালটেছেন পেশা।
মনোহরগঞ্জের পেশাদার হকারদের একজন সাইফুল। তার সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, করোনার প্রথম ৩ মাস এজেন্টের কাছে সাপ্তাহিক ও জাতীয় দৈনিক কোনো ধরনের পত্রিকা না আসায় তিনি বেকার ও অলস সময় কাটান। বন্ধ হয়ে যায় আয় রোজগারের পথ।
তিনি বলেন, ‘পত্রিকা বিক্রির আয় দিয়েই চলতো আমার সংসার, ছেলে-মেয়ের পড়ালেখার খরচ। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন সকালে সাইকেলের প্যাডেল চেপে ৮ কিলোমিটর দূরে লাকসাম উপজেলা থেকে এজেন্টের কাছ থেকে পত্রিকা সংগ্রহ করতাম, সারাদিন ৩০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে গ্রাহকের কাছে পত্রিকা পৌঁছে সন্ধ্যায় ফিরতাম বাড়ি।’
সাইফুল জানান, করোনা পরিস্থিতিতে পারেননি এজেন্টের পাওনা বকেয়া টাকা পরিশোধ করতে, আদায় হয়নি গ্রাহকের কাছে থাকা নিজের বকেয়া পাওনাও। এমন পরিস্থিতিতে গ্রাহকদেরও কেউ আর খোঁজ নেননি। পাননি প্রণোদনা অথবা আর্থিক সহায়তা। জীবন সংগ্রামে নিরুপায় এ হকার হকারি ছেড়ে মনোনিবেশ করেছেন কৃষিকাজে।
উপজেলার নাথেরপেটুয়া এলাকার অন্য হকার জমির উদ্দিন ও গোলাম তফুরেরও একই অবস্থা। বর্তমানে অর্থাভাবে হকারদের অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করছেন। করোনার ধকল কাটিয়ে উঠতে পারেননি অনেকেই।
উপজেলা সদরের বাসিন্দা নিয়মিত দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার পাঠক জহির রায়হানের সঙ্গে কথা হলে তিনি গত ২ বছর থেকে পত্রিকা পড়তে না পারায় হতাশার কথা জানান। তিনি বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পরও এ এলাকায় পত্রিকা না আসায় পাঠকদের মাঝে এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। পত্রিকা পড়তে আমি স্মার্টফোন ব্যবহার করেছি। স্বাচ্ছন্দ্যে নিজের সামনে রেখে পত্রিকা পড়তে না পারায় আক্ষেপ রয়ে গেলো।’ তিনি এ এলাকায় নিয়মিত পত্রিকা সরবরাহ করতে গণ্মাধ্যমকর্মীসহ সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
পত্রিকা এজেন্ট আব্দুর রহিমের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, নতুন হকার নিয়োগের মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধান করা যেতে পারে। এতে জাতীয় দৈনিকসহ সব পত্রিকা নতুন করে পাঠকের হাতে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
মনোহরগঞ্জ প্রেসক্লাবের আহবায়ক আব্দুর রহিম বলেন, ‘বর্তমানে পত্রিকায় কোনো নিউজ প্রকাশিত হলে পত্রিকার ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখতে হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে (ফেসবুকেই) থাকে এর সীমাবদ্ধতা।’ হকার না থাকায় ও পত্রিকা প্রাপ্তিতে চরম বিড়ম্বনার কথা উল্লেখ করে তিনি শিগগিরই হকার সংকট নিরসনে সংবাদকর্মীদের পাশাপাশি প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেন।
আব্দুর রহিম আরও বলেন, ‘মনোহরগঞ্জে সরাসরি সংবাদপত্রের গাড়ি না আসায় প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে লাকসাম উপজেলায় গিয়ে মনোহরগঞ্জের হকারদের পত্রিকা সংগ্রহ করতে হয়। এতে তাদের আরও বিড়ম্বনা হয়। পত্রিকা বিক্রির কমিশন ছাড়া অন্য কোনো আয় না থাকায় মাস শেষে তাদের কষ্ট বিফলে যায়।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোহেল রানা বলেন, ‘জেলা শহরসহ অন্যান্য উপজেলায় অন্যরা যেভাবে পত্রিকা পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন, সেখানে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। মূলত হকার সংকটেই এ সমস্যা হচ্ছে।’ সংকট উত্তোরণে সাংবাদিক ও হকারদের সমন্বয়ে শিগগিরই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের কথা জানান তিনি।