শান্ত মিয়া একজন রিকশাচালক। তার গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলায়। সেখানে তিনি স্ত্রী ও চার সন্তান নিয়ে বসবাস করতেন। কোনোরকমে রিকশা চালিয়ে যা উপার্জন করতেন, তা দিয়েই সে তার সংসার চালাতেন। পরিবারকে নিয়ে শুধু একটু ভালো থাকার উদ্দেশ্যে তিনি তার স্ত্রী, সন্তানদের নিয়ে ইট পাথরে ঘেরা শহরে পাড়ি জমান। শহরে এসে তিনি নিউমার্কেট এলাকায় বাসা ভাড়া করে ২০১৯ সাল থেকে বসবাস শুরু করেন। রিকশা চলিয়ে যে টাকা উপার্জন করেন , এতে বাসা ভাড়া, খাওয়া-দাওয়া ও ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালাতেই হিমশিম খান। একদিন অসুস্থ হয়ে রিকশা চালাতে না পারলে ঐদিন পরিবারের সবাইকে উপোস করতে হয়। এর মধ্যে ২০২০ সালে হানা দেয় মরণঘাতি করোনা ভাইরাস। এতে তার আয়-রোজগার একেবারেই কমে যায়।
করোনা ভাইরাসের প্রকোপ যেতে না যেতেই শুরু হয় দেশে অর্থনৈতিক মহামন্দা। পরিবারের সদস্যদের মুখে দুইবেলা অন্ন তুলে দিতে হিমশিম খাচ্ছেন শান্ত মিয়ার মতো হাজারো রিকশাচালক, দিনমজুর থেকে শুরু করে নিম্ন পেশার মানুষ। এর ওপর আবার লাগামহীন ভাবে বাড়তে থাকা পণ্যদ্রব্য ক্রয় করা দুস্হ পরিবারের পক্ষে অসম্ভব। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর মূল্য বাড়লেও বাড়েনি নিম্নআয়ের মানুষদের আয়-রোজগার। এরকম শান্ত মিয়ার মতো নিম্ন আয়ের মানুষদের সংখ্যা কতো তার নির্দিষ্ট কোনো হিসাব নেই।
নিম্নবিত্ত পরিবারের অবস্থা যে শুধু শোচনীয় তা নয়, পাশাপাশি মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষদের অবস্থাও শোচনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যবিত্তের মানুষরাও দিশেহারা । করোনা ভাইরাসের কারণে আগে থেকেই দ্রব্যমূল্য অধিকাংশ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গিয়েছিল। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ মূল্য পরিস্থিতিকে রীতিমতো ভয়াবহ করে তুলেছে। যাদের আয় ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকার মধ্যে, তাদের পক্ষে বাসা ভাড়াসহ প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য কেনাও অসম্ভব হয়ে উঠেছে। এর উপর আছে সংসারের অন্যান্য খরচ। করোনা ও অন্যান্য কারণে অনেকের চাকরি চলে গেছে, আবার অনেকের আয়-রোজগার আগের চেয়ে কমেছে। তাদের কিভাবে দিন কাটছে কল্পনাও করা যায় না।
চাল,ডাল, তেল,চিনি,আটা থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় এমন কোনো পণ্যদ্রব্য নেই যার মূল্য বাড়েনি। সরকার সয়াবিন তেলের ওপর আমদানি ভ্যাটমুক্ত করে দিয়েছে। কিন্তু বাজারে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করতে গিয়ে ব্যবসায়ীরা অনেক সময় আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির দোহাই দেন। কিন্তু তারা আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে বরং আরো কয়েক গুণ বেশি মূল্য বৃদ্ধি করেন। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে জিনিসপত্রের দাম কমলেও আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা সহজে জিনিস-পত্রের দাম কমাতে চান না। ব্যবসায়ীরা নানা ছল-চাতুরীর আশ্রয় নিয়ে বর্ধিত মূল্য বহাল রাখার চেষ্টা করেন। এতে করে নিম্ন আয়ের সাধারণ মানুষকেই এসব দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
সম্প্রতি সিলেট সহ অন্যান্য জেলা,উপজেলাগুলো বন্যার ভয়াবহতার শিকার হয়। ঐ সব অঞ্চলগুলোতে ফসলি জমি, ঘরবাড়ি সব বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। যেখানে এসব এলাকাতে বন্যাদুর্গত মানুষদের বসতি ঘরবাড়ি পুনঃনির্মাণ করা কষ্ট হয়ে যাচ্ছে. সেখানে তাদের পক্ষে উচ্চমূল্যে পণ্যসামগ্রী ক্রয় করা সাধ্যের বাইরে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির যেসব কারণ রয়েছে তার মধ্যে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থা, চাহিদার ওঠানামা ও আমদানি রপ্তানি ব্যয়। আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্য ও খাদ্যসামগ্রী। এখন ভরা মৌসুম। আমাদের দেশে খাদ্যসশ্যের দাম বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই।
ক্রয়মুল্যের কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ানোর কথা বলা হয়। কিন্তু শাকসবজি সহ অন্যান্য দেশজ দ্রব্যাদির মূল্য বৃদ্ধির কোনো যৌক্তিকতা নেই বলে মনে করি। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বি আইডিএস), পিপিআরসি ও সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর গবেষণা ও জরিপে দেখা গেছে, করোনাকালে দেশে দরিদ্রের সংখ্যা বেড়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায়। তাদের মতে, দারিদ্র্যের এই হার করোনাপূর্ব ২১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪১ শতাংশ হয়েছে। যদিও সরকার বারবারই বলছে, এ হার অনেক কম। কিন্তু সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) কাছে এর সমর্থনে কোনো তথ্য নেই। ২০২০ সালের অক্টোবরের বিবিএস-এর এক জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশের মানুষের আয় ২০ শতাংশ কমে গেছে। একদিকে আয় কমেছে ২০ শতাংশ, অপরদিকে ব্যয় বেড়েছে ৩৬ শতাংশ। তার মানে হলো, ১০০ টাকার আয় কমে ৮০ টাকা হয়েছে আর ১০০ টাকার ব্যয় বেড়ে ১৩৬ টাকা হয়েছে। আয়-ব্যয়ের ব্যবধান হলো ৫৬ শতাংশ। এ বিশাল ঘাটতি মেটানোর উপায় সাধারণ মানুষের জানা আছে কি?
মহামারি করোনা এরই মধ্যে আমাদের অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে, আমাদের অনেককে নিঃস্ব করে দিয়েছে। কমবেশি সবার মধ্যেই পড়েছে এর বিরূপ প্রভাব। অনেকে সবকিছু হারিয়ে অর্থকষ্টে দিনযাপন করছে। অন্তত সাধারণ জনগণের কথা ভেবে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রগুলোর যেন ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ করা হয় এবং তা যেন সবার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, সেদিকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। সহনশীল মাত্রায় মূল্য নির্ধারণের জন্য বাজার নিয়ন্ত্রণকারীদের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও ব্যবস্থা নিতে হবে। বিভিন্ন অজুহাতে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির মূল চক্রের বিরুদ্ধে আমাদের বিবেককে জাগ্রত করি। সাধারণ মানুষের কথা ভেবে তাদের পাশে দাঁড়াই। কোনো অজুহাতে কেউ যেন কখনো ইচ্ছেমতো কোনো জিনিসের দাম বাড়াতে না পারে, সেদিকে দৃষ্টি দিই।
লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ