জাহাজশিল্পের সংকট কাটাতে হবে 

২০০৮ সালের পর বাংলাদেশ জাহাজ নির্মাণ শিল্পে যে পরিমাণ সম্ভাবনা ও সমৃদ্ধির দ্বারোন্মোচন করেছে তা ছিল বিস্ময়কর। ডেনমার্কে রপ্তানির মধ্য দিয়েই মূলত জাহাজ রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে পরিচিতি পাই আমরা। এক যুগেরও বেশি সময় পার করা এই খাতে সাম্প্রতিক সময় খুব একটা ভালো কাটছে না, বিশেষ করে রপ্তানিতে। 

কাঁচামালে ব্যয়বৃদ্ধি, নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ করতে না পারা, দীর্ঘসূত্রিতা, চাহিদা অনুযায়ী আন্তর্জাতিকমান ঠিক রাখতে না পারা, করোনা চলাকালে চ্যালেঞ্জ ইত্যাদি নানামুখী সমস্যায় বিগত দুই বছরেও কোনো রপ্তানি কার্যাদেশ পাইনি আমরা। যদিও ২০০৮ সালের পর এ পর্যন্ত ৪০টি জাহাজ রপ্তানি হয়েছে ইউরোপ-আফ্রিকা-এশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে। সর্বশেষ ২০২০ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ থেকে জাহাজ রপ্তানি হয়েছে।

জাহাজ নির্মাণে যেহেতু বেশির ভাগ কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, সেক্ষেত্রে পুরো নির্মাণ কাজে আমাদের অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজন হয়। প্রতিযোগী দেশগুলো এই জায়গায় আমাদের থেকে এগিয়ে। বাংলাদেশের রপ্তানিবাণিজ্যে বর্তমানে সব থেকে বড় প্রতিযোগী ভিয়েতনাম। ভিয়েতনাম আমাদের তুলনায় অনেক কম সময়ে মানসম্পন্ন জাহাজ নির্মাণে সক্ষমতা অর্জন করেছে। তাছাড়া আমাদের জাহাজ ডিজাইনিং প্রক্রিয়ায়ও আমরা পিছিয়ে রয়েছি, কালক্ষেপণ হওয়ার এটিও অন্যতম একটি কারণ। 

বাংলাদেশে জাহাজনির্মাণ তুলনামূলক কোরিয়া, চীন, জাপান, ভারতের থেকে অধিক ব্যয়বহুল। যার অন্যতম কারণ সাপ্লাই চেইনের সীমাবদ্ধতা। এই খাতকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজন কিছু ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের উপস্থিতি, যা আমাদের নেই বললেই চলে। এতে ব্যয়ও কমে আসে কিছুটা। আমাদের প্রয়োজনীয় কাঁচামালের প্রায় সবটুকুই আমদানি করতে হয়। ব্যাকওয়ার্ড শিল্পের ভূমিকা এক্ষেত্রে প্রতিযোগী দেশগুলোকে অতিরিক্ত সুবিধা দিচ্ছে। তাছাড়া বর্তমানে বাংলাদেশের অধিকাংশ জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠান মূলত দেশীয় বাজারের চাহিদা মেটাতে কাজ করছে, যা আমাদের অর্থনীতির জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু রপ্তানিকারক হিসেবে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়া, কৃষিজাত পণ্যের পাশাপাশি যদি ভারী শিল্পে উন্নতি করতে পারে তবে তা দীর্ঘমেয়াদে সুফল বয়ে আনবে। 

বৈচিত্র্যময় রপ্তানি খাত যে কোনো দেশের অর্থনীতিকে টেকসই এবং মজবুত করে। রপ্তানিতে অতীতে সম্ভাবনা দেখানো জাহাজ নির্মাণশিল্পের বর্তমান সংকট স্থায়ী হলে দেশের অর্থনীতি বড় রকমের সুযোগ হাতছাড়া করবে। রপ্তানিবহুমুখীকরণ করতে উত্পাদনমুখী শিল্প থেকে নির্মাণ বা ভারী শিল্পে বিশেষ নজর রাখা অতি গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতি বৈচিত্র্যময় হলে বিভিন্ন সময়ে উদ্ভূত নাজুক পরিস্থিতি মোকাবিলা অনেকাংশে সহজতর হয় এবং টেকসই অর্থনীতি তৈরিতে তা প্রধান প্রভাবক হিসেবে অবদান রাখে। বর্তমান শ্রীলঙ্কা তাদের একমুখী অর্থনীতি তৈরির মাশুল গুনছে। তাই সম্ভাবনা জাগানো এবং সুযোগ থাকা খাতগুলোর যথাযথ পরিচর্যা করা একান্ত প্রয়োজন।

বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের শক্তির জায়গা হচ্ছে প্রধানত সস্তা শ্রম এবং বিশাল জনগোষ্ঠী। আর তাই জাহাজ রপ্তানিতে এবং নির্মাণে বহির্বিশ্বে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ রয়েছে আমাদের। প্রয়োজন কেবল দক্ষ ব্যবস্থাপনা, দক্ষ লোকবল এবং অভ্যন্তরীণ অনুকূল পরিবেশ। আমাদের এখন আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন জাহাজ নির্মাণ এবং নির্দিষ্ট বাজারকেন্দ্রিক চাহিদা অনুযায়ী জাহাজ সরবরাহে অধিক মনোনিবেশ করা প্রয়োজন। সময়সীমা যেহেতু আন্তর্জাতিক বাজারে কিংবা প্রফেশনালিজম রক্ষার্থে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। তাই এদিকেও বেশ সতর্কতা অবলম্বন জরুরি। যথাসময়ে সরবরাহ করা না গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রহণযোগ্যতা হারাবো আমরা। একই সঙ্গে এই শিল্পের যথাযথ ব্র্যান্ডিং ও প্রচার-প্রসারে পর্যাপ্ত উদ্যোগ গ্রহণ করে সে অনুযায়ী কাজ করা উচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর।

মন্ত্রিসভা ‘জাহাজ নির্মাণশিল্প উন্নয়ন নীতিমালা ২০২১’-এর খসড়ার অনুমোদন দিয়েছে। জাহাজরপ্তানিতে বর্তমানের ১ বিলিয়ন ডলারের মার্কেট থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বছরে ৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। চলমান সংকট কাটানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন পরিকল্পনা হাতে নিলেও সেগুলোর ধীরগতির বাস্তবায়ন বড় একটি সমস্যা হিসেবে দেখা যায়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে হলে সবদিকেই সক্ষমতা দেখাতে হবে। প্রতিযোগী দেশগুলো যদি আমাদের বাজার ইতিমধ্যে দখল করে নেয়, তবে পুনরায় তা পুনরুদ্ধার করা মোটেই সহজ কাজ হবে না। সেদিক বিবেচনায় দেশের বড় কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের উচিত প্রয়োজনীয় সবধরনের সহায়তা প্রদান করা। জাহাজশিল্পে দক্ষ জনসম্পদ নিয়োগে সরকারিভাবে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আয়োজন করলে একদিকে বেকারত্ব কমবে, অন্য দিকে নির্মাতাপ্রতিষ্ঠানের জন্যেও তা সুবিধার হবে। উত্পাদনের ব্যয় কমাতে আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে এবং ব্যাকওয়ার্ড শিল্পের বিকাশে নজর দিতে হবে। সঠিক পরিকল্পনা ও সহায়তা ছাড়া রপ্তানি বহুমুখীকরণে জাহাজ শিল্পের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর কোনো বিকল্প নেই।

লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়