সিলেট ও সুনামগঞ্জে 'ডাকাত আতঙ্ক'

বন্যার চরম দুর্ভোগের মাঝে সিলেট ও সুনামগঞ্জ শহরের বিভিন্ন এলাকায় 'নৌকায় করে ডাকাতির উপদ্রব' দেখা দেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়েছে। এই প্রতিবেদককে এসএমএস-এর মাধ্যমেও এমন খবর জানিয়েছেন সেসব এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা। তবে দুই-একটি স্থানে চুরির ঘটনা ঘটলেও এখন পর্যন্ত বড়ধরনের কোনো ডাকাতির ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়নি। বরং চুরির ঘটনাগুলোই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চক্রাকারে শেয়ার হতে থাকায় 'ডাকাত আতঙ্কে' পড়েছেন ওই অঞ্চলের মানুষ।

এদিকে সিলেটের অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ নেই। দীর্ঘসময় ধরে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় সুনামগঞ্জের অধিকাংশ এলাকায় ফোনের নেটওয়ার্ক কাজ করছে না। বেশিরভাগ মানুষের ফোনে চার্জও নেই। ফেসবুকের মাধ্যমে 'ডাকাতির খবর' জেনে অনেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করছেন। সংযোগ না পেলে নিজে আতঙ্কিত হয়ে আতঙ্ক ছড়াচ্ছেন অন্যদের মাঝে। এতে 'সিরিয়াল ডাকাতি'র খবর ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ডাকাতির ব্যাপারে অসংখ্য ফোনকল পেলেও বাস্তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে বলে জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা। দুই-একটি বিচ্ছিন্ন চুরির ঘটনা ঘটেছে।

শনিবার (১৮ জুন) দিবাগত রাতে বিভিন্নজনের ফেসবুকে স্ট্যাটাসে সিলেট শহরের বাগবাড়ি, বর্ণমালা পয়েন্ট, আখালিয়া, কানিশাইল, শামীমাবাদ সহ বিভিন্ন এলাকায় 'ডাকাত দলের হানা'র খবর ছড়িয়ে পড়ে। তবে এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এছাড়া সুনামগঞ্জ শহরের বাঁধনপাড়া, মরাটিলা, ময়নার পয়েন্ট, নতুনপাড়া, হাজিপাড়া ও হাসন নগরের বিভিন্ন বাসায় ডাকাতরা হানা দিয়েছে, এমন খবরও ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুকে।

আখালিয়া ঘাট এলাকা থেকে রাতুল রাহা নামের এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী জানান, এলাকায় ডাকাতি হতে পারে ভেবে মসজিদ থেকে মাইকিং করে সবাইকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

বন্যা পরিস্থিতির কারণে নিচু বাসাবাড়িগুলো ছেড়ে অনেকেই বহুতল ভবনে আশ্রয় নিয়েছেন। এদিকে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো ডুবে যাওয়ায় বিদ্যুৎও নেই। ফলে অন্ধকারে ডুবে থাকা শহরের বিভিন্ন ঘরবাড়িতে চুরি হওয়ার আশঙ্কা করেছেন অনেকে। মূলত এই ভীতির ফলেই 'ডাকাতির' ঘটনা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ফেসবুকে এসব পোস্ট দেখে ক্রমাগত জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করতে থাকেন অনেকে। পুলিশও টহল বাড়ায়। তবে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে পুলিশ ডাকাতির প্রমাণ পায়নি। যারা মাইকিং করেছেন, তারাও নিজ চোখে এমন কোনো ঘটনা দেখেননি, অন্যের মাধ্যমে জেনেছেন। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, যেহেতু এধরনের দুর্যোগে অনেকেই দুষ্কৃতির সুযোগ নিতে পারে, তাই সতর্ক থাকা উচিত। তবে শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে ডাকাতির খবর না ছড়ানোর অনুরোধ করেছেন তারা।

সুনামগঞ্জের বাসিন্দা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী সৌরভ দাস পার্থ বলেন, 'ডাকাতির ব্যাপারে পরিচিতজনরা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছে। আত্মীয়-স্বজনদের অনেকেও ফোন করে এমনটা জানিয়েছেন।' সেসময় পুলিশের সাথে যোগাযোগ করতে না পেরে তিনি সিলেট সদরে সেনাবাহিনীর উদ্ধারকারী দলের দায়িত্বে থাকা ক্যাপ্টেন ফয়সলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ক্যাপ্টেন ফয়সলও এ ব্যাপারে বেশকিছু ফোনকল পেয়েছেন বলে জানান।

সুনামগঞ্জের বাসিন্দা ও প্রাইমএশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র দূর্বার শামিত আদি জানান, কিছুক্ষণ আগে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। তারা জানিয়েছেন, সুনামগঞ্জে থানা পুলিশের পক্ষ থেকে মাইকিং করে সবাইকে সতর্ক থাকতে বলা হচ্ছে। জাতীয় জরুরিসেবার নম্বরেও কথা বলেছেন আদি। সেখানকার অপারেটর জানিয়েছেন, থানার কর্মকর্তারা ডাকাতির 'সলিড এভিডেন্স' পাননি। কোনো ভিক্টিম পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। তবে শহরে পুলিশের পাহাড়া চালু থাকবে।

এর আগে সুনামগঞ্জ শহরের হাসন নগরের ও জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট রবিউল লেইস রোকেস ইত্তেফাক অনলাইনকে জানান, হাসন নগর থেকে হাজীপাড়া পর্যন্ত শহরের দক্ষিণাংশে ডাকাতি হওয়ার খবর পেয়েছেন তিনি। পুলিশের সুপারের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন। সুনামগঞ্জ সদর থানার ওসির সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। মোবাইল নেটওয়ার্কের সমস্যা হওয়ায় যে কারোর সঙ্গে যোগাযোগে বেগ পেতে হচ্ছে। এদিকে শহরের ময়নার পয়েন্টে পৌর কাউন্সিলর আব্দুল্লাহ আল নোমানের বাসায় ডাকাতির চেষ্টা চালিয়েছে কয়েকজন। নোমানের সঙ্গে কথা হয়েছে।

তবে এ ব্যাপারে জানতে ইত্তেফাক অনলাইন থেকে কাউন্সিলর আব্দুল্লাহ আল নোমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সংযোগ পাওয়া যায়নি।

অ্যাডভোকেট রোকেস আরও জানান, তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় জরুরি সেবা-৯৯৯ এ কল দিয়ে সাড়া পাননি তিনি। 'হয়তো একসঙ্গে অনেক চাপ সামলাতে না পেরে তাদের লাইনটি ব্যস্ত আছে। স্থানীয় থানাপুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না নেটওয়ার্কের সমস্যার কারণে' —এমনটাই বলেছেন তিনি।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার গৌতম দেব গণমাধ্যমকে বলেন, এখন পর্যন্ত সিলেট শহরে ডাকাতির কোনো সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিচ্ছেন, কোথাও কোথাও মসজিদে মাইকিং করা হচ্ছে। প্রত্যেক এলাকায় পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে। আতঙ্কের কিছু নেই। তারপরও কোথাও ডাকাতি বা এ ধরনের কোন সঠিক সংবাদ পাওয়া গেলে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ এর কন্ট্রোল রুম (০১৩২০০৬৯৯৯৮) অথবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে জানালে পুলিশ ব্যবস্থা নেবে।

সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার (সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্ত অতিরিক্ত ডিআইজি) মো. মিজানুর রহমান ডাকাতির ব্যাপারে বেশকিছু ফোন পেয়েছেন বলে নিশ্চিত করেন। তিনি সংশ্লিষ্ট থানার কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন বলে জানান।

সিলেট ও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় ডাকাতির ব্যাপারে একাধিক অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পুলিশের সিলেট রেঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মফিজ উদ্দিন আহমেদ। তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট থানাগুলোর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাজ করছে।