গ্রীষ্মের কাঠফাটা রোদ্দুর শেষে বর্ষা নেমেছে প্রকৃতিতে। বৃষ্টির ছিটেফোঁটা পেয়ে প্রকৃতি আবার সজীবতা ধারণ করছে। প্রকৃতি চিরায়ত সুন্দর। তবে এই প্রকৃতির মধ্যে অযাচিত কর্মকাণ্ড সম্পাদন করতে গেলেই বাধে বিপত্তি। যদিও একথা ঠিক যে, বিপত্তি সাধ করে বাধে না। মানুষের প্রয়োজনেই বাধে। কিন্তু সে প্রয়োজনের নিরিখে যে প্রকৃতির মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খেতে হবে, ব্যাপারটা এমন না। বলছি, প্রকৃতির অবিচ্ছেন্দ্য অংশ ‘পাহাড়’ নিয়ে।
বাংলাদেশে পাহাড়ি অঞ্চল প্রধানত দুটি বিভাগে অবস্থিত। একটি সিলেট বিভাগে এবং অন্যটি বৃহত্তর চট্টগ্রামে বিভাগে অবস্থিত। বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতিতে এই দুই বিভাগে ছোট-বড় অনেক পাহাড় ও টিলা দেখা যায়। বাংলাদেশ নদীমাতৃক হওয়ার কারণে বেশির ভাগ অঞ্চলই প্লাবনভূমির গঠন লাভ করেছে। এই অঞ্চল ৮০ শতাংশ। অন্য দিকে পাহাড়ি অঞ্চল রয়েছে মোটে ১২ শতাংশ। এই ১২ শতাংশ অঞ্চলের ওপরেই যেন অজস্র অত্যাচার! এ অত্যাচারে মানুষ বা পশুপাখি যেমন তাদের শরীরে চিহ্ন বহন করে নিয়ে বেড়ায় ঠিক তেমনই চিহ্ন বহন করে নিয়ে বেড়াচ্ছে পাহাড়ও। জনসংখ্যার প্রাদুর্ভাবে হু হু করে কমছে পাহাড়ি অঞ্চল। এক সময় পাহাড়ে বসবাস করত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বিভিন্ন জাতিসত্তা। কিন্তু বর্তমানে বাঙালিরাও বসবাস করা শুরু করে দিয়েছে। প্রকৃতিনির্ভর তারা আর ঠিকমতো খাদ্যের সংস্থান করতে পারছে না। কেননা তাদের জুম চাষ করার অঞ্চল পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, নতুন করে স্থাপত্য নির্মাণ করা হচ্ছে, যা পাহাড় এবং পাহাড়িদের ওপর অত্যাচারের দৃষ্টান্ত বহন করে।
পাহাড় তাদেরই লালন করে যারা তাকে ধারণ ও যত্ন করে। কিন্তু বাংলাদেশে পাহাড়গুলোর বেশ অযত্ন পরিলক্ষিত হচ্ছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ঘটছে প্রতিনিয়ত পাহাড়ধস। বর্ষা এলেই এদেশে পাহাড় ধস বেড়ে যায়। এভাবে পাহাড় কেন ধসে যায় তা কারো অজানা নয়। বসতবাড়ির আঙিনা ভরাটসহ নানা কাজে পাহাড়ের পাদদেশ থেকে মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে মানুষ। এতে পাহাড় ধস বহুলাংশে বেড়ে যায়। অন্য দিকে পাহাড় কেটে সমতল ভূমি বানানোর চিত্রও ক্রমবর্ধমান। মানবসৃষ্ট নানা কার্যকলাপের কারণে পাহাড়ে বৃষ্টি যেন এক ভয়ানক ফাঁদ। বৃষ্টির পানিতে পাহাড়ের আলগা মাটি আরো আলগা হয়ে ধসে পড়ে। পাহাড়ের গাছ নির্বিচারে কেটে জ্বালানির ব্যবস্থা করা হয় বলে পাহাড়ধস আরো ত্বরান্বিত হয়েছে।
বাংলাদেশে স্মরণকালের ভয়াবহ পাহাড়ধস ঘটে ২০০৭ সালের ১১ জুন। সেদিন চট্টগ্রামের সাতটি এলাকায় পাহাড় ধসে মারা যায় ১২৭ জন। এরপর দীর্ঘ ১৫ বছর পার হয়েছে, তবু থামেনি পাহাড় ধসে মৃত্যুর মিছিল। গত ১৫ বছরে চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে প্রায় ৪ শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এরপর ২০১৭ সালের ১২ ও ১৩ জুন রাঙামাটিসহ বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাঁচ জেলায় পাহাড় ধসে প্রাণ হারান ১৫৮ জন। ২০১৮ সালের ১৪ অক্টোবর নগরীর আকবরশাহ থানাধীন ফিরোজশাহ কলোনিতে পাহাড় ধসে মারা যান চার জন।
২০১৯ সালে কুসুমবাগ এলাকা পাহাড় ধসে এক শিশুর মৃত্যু হয়। বিচ্ছিন্ন দুই-এক বছর বাদ দিয়ে প্রতি বছরই অল্পসংখ্যক হলেও কোনো না কোনোভাবে পাহাড় ধসে প্রাণহানি ঘটেছে এবং ঘটছে। পাহাড় রক্ষায় ২০০৭ সালের ধসের পর সরকারের গঠিত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি ৩০টি সুপারিশ করেছিল, যা আজও বাস্তবায়ন হয়নি। এরপর ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের সমন্বয়ে আরো একটি কমিটি গঠিত হয়েছিল। সেই কমিটি তাদের প্রতিবেদনে পাহাড় ধসের ২৮টি কারণ চিহ্নিত করে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে ৩৬টি সুপারিশ করেছিল।
সুপারিশগুলোর মধ্যে বেশির ভাগই রয়ে গেছে কাগজে-কলমে। পরিতাপের বিষয় এই যে, যখনই কোনো বড় দুর্যোগ নেমে আসে তখনই সেই সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা হয় এবং সব পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় কিন্তু কিছুদিন পরে আবার আমরা সবকিছু ভুলে যাই। এভাবেই কোনো সমস্যার শেষ না হয়ে আরো সমস্যাটা বৃহৎ আকার ধারণ করে। এই ব্যাপারে নাগরিক সমাজ ও সরকারের উচ্চমহলের এখনই সময় পাহাড় ধসের ক্ষয়ক্ষতি এবং জানমালের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিতে কারণগুলো আমলে নিয়ে উপরোক্ত সুপারিশসমূহে কর্ণপাত করা। তাহলেই হয়তো ঘুমের ঘোরে তাজা প্রাণ বেঘোরে ঝরে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পায়।
লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়