গত ১৯ জুলাই বগুড়ার কাহালু উপজেলার একটি গ্রামে ঘটে এক আজব ঘটনা। হঠাৎ একটি পুকুরের পানি বিপুলসংখ্যক মাছসহ উধাও হয়ে যায়। চাঞ্চল্য ছড়ালে এলেকাবাসী ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখতে পায় পুকুরের মাঝবরাবর একটি গোলাকার সুড়ঙ্গের সৃষ্টি হয়েছে। সেই সুড়ঙ্গপথে মাছ আর পানি হারিয়ে গেছে অতল গহ্বরে। বিজ্ঞানের ভাষায় এই ঘটনাকে বলে ‘সিঙ্কহোল’।
প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট নানা কারণে ভূপৃষ্ঠের নিচের অংশ ফাঁকা হয়ে তৈরি হয় এমন সুড়ঙ্গ পথ। একে অনেকে ‘নরকের দরজা’ হিসাবেও আখ্যায়িত করে থাকে। বাংলাদেশে সিঙ্কহোল সচারচর দেখা যায় না বটে, তবে সম্প্রতি কয়েক বছর ধরে এই দানবাকৃতির গর্ত বিশ্ব জুড়ে ভূতত্ত্ববিদদের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঝড়বৃষ্টি, ভূমিধসের ন্যায় অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো দিনকে দিন বেড়ে চলেছে সিঙ্কহোলের ঘটনা। রাস্তায়, খেলার মাঠে, খেতেখামারে, পুকুরে, উন্মুক্ত প্রান্তরে এমন কি বসতবাড়ির নিচেও তৈরি হচ্ছে দানবাকৃতির এসব গর্ত। ভূগর্ভ থেকে প্রচুর পরিমাণ পানি, বালু ও খনিজ পদার্থ উত্তোলন করলে ভূত্বকের নিচের স্তরে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়, তা পূরণের জন্য এমন সুড়ঙ্গ বা গর্ত তৈরি হয়। বিশেষ করে মাটির অভ্যন্তরে কঠিন শিলা রয়েছে এমন সব এলাকায় সাধারণত ভূমির উপরিভাগের পানি ধীরে ধীরে শিলার অভিমুখে প্রবেশ করে। দীর্ঘ সময় পরে সেখানে তৈরি হয় লবণ, চুনাপাথর, কপার ও জিপসামের মতো খনিজ স্তর। এই খনিজ পদার্থের উত্তোলন করা হলে মাটির অভ্যন্তরে ফাঁপা জায়গা তৈরি হয়। এক সময়ে এই ফাঁপা অংশ দেবে গিয়ে সিঙ্কহোল তৈরি হয়। বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাপমাত্রা। কমছে পানির স্তর, দেখা দিচ্ছে খরা। ফলে ভূগর্ভস্থ ফাঁপা অংশের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়াও শহর অঞ্চলে অপরিকল্পিত সুয়ারেজ লাইন বা মাটির নিচে নির্মাণ কাজকে সিঙ্কহোল বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসাবে চিহ্নিত করছেন বিজ্ঞানীরা।
একেকটি সিঙ্কহোল আয়তনে কয়েক ফুট থেকে কয়েক শ ফুট পর্যন্ত হতে পারে, যা তৈরি হতে সময় লাগে কয়েক দশক থেকে শতাব্দী পর্যন্ত। প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট সিঙ্কহোলগুলো মাটির গঠন ও এর অভ্যন্তরে থাকা বিভিন্ন ধরনের খনিজ ও শিলার ওপর ভিত্তি করে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের হতে থাকে। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় সিঙ্কহোলের সন্ধান পাওয়া গেছে পশ্চিম সাইবেরিয়াতে। সেখানে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে তৈরি হয়েছে বিশাল গর্ত। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সিঙ্কহোল তৈরি হয় যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে। এর পরের অবস্থানেই আছে তুরস্কের কেনিয়া। মাত্র এক বছরেই দেশটিতে দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে দানবগর্ত। চীনেও আছে বিশালাকার বেশ কিছু দানবগর্ত। সিঙ্কহোলের প্রভাবে আবাদি জমি থেকে শুরু করে বাসস্থানসহ বিপুল জায়গা ব্যাপক হারে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিপন্ন হচ্ছে জনজীবন। এমন করে যদি সিঙ্কহোলের পরিমাণ বাড়তে থাকে, তাহলে পৃথিবী একসময় বসবাসের জন্য অযোগ্য হয়ে উঠবে।
বগুড়ার ঘটনাটি বাংলাদেশের জন্য নতুন করে চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে যে হারে বনজঙ্গল উজাড় হচ্ছে, নদনদী, খালবিল ভরাট করা হচ্ছে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ হচ্ছে তাতে অচিরেই দেশে ব্যাপক আকারে সিঙ্কহোলের মতো ভয়ংকর ঘটনা দেখা দিতে পারে। তাই এখনই এ ব্যাপারে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে; তা না হলে ভবিষ্যতে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। যদিও সিঙ্কহোল সৃষ্টি হওয়া পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়, তথাপি ব্যক্তি, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টি এবং সুষ্ঠু কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে সিঙ্কহোলের রাশ টানা সম্ভব।
লেখক : শিক্ষার্থী, ড্রাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি