অর্থনীতিতে জ্বালানি মূল্যস্ফীতির প্রভাব

জ্বালানি তেল শুধু বিশেষ কোনো খাতেই নয় বরং বহুলাংশে অবদান রেখে আসছে দেশের অর্থনীতিতে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম কিছুটা কমে এলেও দেশে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেনের দাম ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ৫২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি আপামর জনগণের পাশাপাশি অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে।

কেননা এর ফলে পরিবহন ব্যয় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির মূল্য আরো বৃদ্ধি পাবে। কারণ জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি সরাসরি জনস্বার্থ তথা ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। জ্বালানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে দেশের প্রধানতম রপ্তানি খাত নিট সেক্টরসহ দেশের সামগ্রিক শিল্প খাতে বিরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। এই কঠিন সময়ে শিল্পকারখানার সকল কর্মে ব্যাঘাত সৃষ্টির ফলে রপ্তানি আয় কমে আসবে। বিশেষ করে ডিজেল, অকটেনের মূল্যবৃদ্ধি বিদু্যত্, পরিবহনসহ দেশের সকল উপখাতগুলোতে প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের দাবি, কিছুদিন ধরে কারখানাগুলোতে গ্যাসের সরবরাহ ঠিকমতো হচ্ছে না।

এটি উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত করছে, যা উদ্যোক্তাদের ব্যাপক চাপে ফেলছে। এতে বিশ্ববাজারে রপ্তানির প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়বে। একইভাবে শিল্প খাতে জ্বালানির এই অস্বাভাবিক দাম মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে উঠবে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শিল্প খাতে পণ্য উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় আরো বাড়িয়ে দেবে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যয় বাড়বে, পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাবে। ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ অর্থনীতিতে পিছিয়ে পড়বে এবং স্থানীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে। এভাবে চলতে থাকে দেশের অর্থনীতি চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।

বিবিএসের তথ্য বলছে, গত এক বছরে মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়েছে ৯১ শতাংশ। বহু স্থানে পরিবহন বন্ধ রেখেছে মালিকপক্ষ। এই অবস্থার মধ্যে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি পেল; যার ফলে গণপরিবহনে ভাড়া বাড়বে এবং জনসাধারণের ওপর যেমন এর বিরূপ প্রভাব পড়বে তেমনি পরিবহন খাতে ঘটবে ব্যাঘাত। এতে জনজীবনে দুর্ভোগ নেমে আসবে। পরিবহন খাতে খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় সার্বিকভাবে বাড়বে ‘মূল্যস্ফীতি’। জ্বালানি তেলের বাজারমূল্য বৃদ্ধি কৃষির উৎপাদনে বড় রকমের প্রভাব ফেলবে। এ বছর বন্যা, অতিবৃষ্টি ও খরার ফলে এমনিতেই ব্যাপক ফসলহানি ঘটেছে। তার ওপর ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে নিত্য ব্যবহার্য সকল কৃষি পণ্যের দাম উর্ধ্বমুখী। গত ১ আগস্ট ইউরিয়া সারের দাম কেজিপ্রতি বাড়ানো হয় ছয় টাকা যার ধাক্কা কাটতে না কাটতেই গত ৫ আগস্ট রাত ১২টার পর লিটারপ্রতি ডিজেল ৩৪ টাকা, কেরোসিন ৩৪ টাকা, অকটেন ৪৬ টাকা ও পেট্রোলের দাম বাড়ানো হয় ৪৪ টাকা, যা সরাসরি প্রভাব ফেলবে সেচকাজে। এমন অবস্থায় উৎপাদন ধরে রাখতে দিশেহারা হয়ে পড়বে কৃষকরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে সামনের বোরো ও রবি শস্য আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ মোট বার্ষিক ধান উৎপাদনের ৬০ শতাংশই বোরো, যা মূলত সেচনির্ভর। দেশে সেচযন্ত্রের সংখ্যা ১৬ লাখ ১০ হাজার, এর মধ্যে ১৩ লাখ ৪০ হাজার ডিজেলচালিত। বাকি ২ লাখ ৭০ হাজার চলে বিদু্যতে। কৃষির উৎপাদনে প্রায় ৫০ শতাংশ ব্যয়বৃদ্ধি পাবে যেক্ষেত্রে উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব পড়বে এবং উৎপাদন কমে যাবে, অথচ এই খাত আমাদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

খাত সংশ্লিষ্টদের দাবি, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি শুধু একটি পণ্যের দামের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় বরং এর সঙ্গে পরিবহন, ওষুধশিল্প, নির্মাণ শিল্প, পোশাকশিল্প, সব ধরনের খাদ্যদ্রব্য সামগ্রীসহ রপ্তানিমুখী শিল্প খাতের ভোক্তা ও ব্যবহারকারী সম্পর্কিত। অর্থাত্ নিম্ন থেকে শুরু করে উচ্চস্তর সকল পর্যায়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। বর্তমানে দেশে জ্বালানি মজুতের যে ক্ষমতা তা আরো দীর্ঘায়িত করে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে একটি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতিমালা প্রণয়নের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে জ্বালানি উত্তোলন করতে হবে। সর্বোপরি, দেশের অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে যে কোনো অবস্থাতেই স্থানীয় বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি হ্রাস করার কোনো বিকল্প নেই।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়