হারিয়ে যাচ্ছে বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটির ঘর 

প্রাচীন ঐতিহ্যের নিদর্শন মাটির ঘর। অতীতে বরেন্দ্র অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষই মাটির ঘরে বসবাস করত। অবস্থাসম্পন্ন মানুষ মাটির দোতালা ঘর বানাতেন। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে বরেন্দ্র অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী চিরচেনা মাটির ঘর। দেড় যুগ আগেও রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, বগুড়াসহ বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রতিটি জেলায় গ্রামাঞ্চলে মাটির ঘর ছিল চোখে পড়ার মতো। আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন, মানুষের আয় বৃদ্ধি, সরকারি পাবলিক লিমিটেড ব্যাংকসহ বিভিন্ন এনজিওর ঋণ প্রদানের কারণে এ অঞ্চলের কায়িক পরিশ্রম করা নিম্নআয়ের পরিবারগুলো এখন তৈরি করছে ছোট্ট আকারে দালান। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যদের ততটা সামর্থ্য না থাকলেও অন্ততপক্ষে টিনের বেড়া আর টিনের চালা দিয়েও হলেও বানাচ্ছে ঝকঝকে সুন্দর ঘরবাড়ি। আবার দীর্ঘস্থায়ীভাবে অনেক লোকের নিবাসকল্পে ইট, বালু আর সিমেন্টের ব্যবহারে দালানকোঠা-অট্টালিকার কাছে হার মানছে এই ঐতিহ্যবাহী মাটির ঘর।

প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ মাটির ঘরে বসবাস করে আসছে। শীত বা গরমে থাকার জন্য বেশ আরামদায়ক। মাটির ঘরে শীতের দিনে ঘর থাকে উষ্ণ, আর গরমের দিনে শীতল। তাই মাটির ঘরকে ‘গরিবের বালা খানা’ বলা হয়ে থাকে। মাটির সহজলভ্যতা, প্রয়োজনীয় উপকরণ আর শ্রমিক খরচ কম হওয়ায় আগের দিনে মানুষ মাটির ঘর বানাতে বেশ আগ্রহী ছিল। এসব মাটির ঘর তৈরি করতে কারিগরদের সময় লাগত দেড় থেকে দু-মাস। কিন্তু বর্তমানে এর চাহিদা না থাকায় কারিগররাও এই পেশা ছেড়ে অন্য অন্য পেশায় জড়িয়ে পড়ছে।

মাটির ঘর

মাটির ঘর নির্মাণ কৌশলও অনন্য। মাটি, খড় ও পানি ভিজিয়ে কাদায় পরিণত করে ২০ থেকে ৩০ ইঞ্চি চওড়া করে দেওয়াল তৈরি করা হয়। দেওয়ালে কাঠ বা বাঁশের সিলিং তৈরি করে তার ওপর খড়কুটা অথবা ঢেউটিনের ছাউনি দেওয়া হতো। আবার অনেক সময় দোতলা পর্যন্তও করা হতো এই মাটি দিয়েই। মাটির দেওয়ালেই গৃহিণীরা বিভিন্ন রকমের আল্পনা এঁকে ঘরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতেন। এভাবে নির্মিত হয় মাটির ঘর।

মানুষের আধুনিক জীবনযাপনের ইচ্ছা ও আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সবাই মাটির ঘর ভেঙে টিন আর ইটের পাকা বাড়ি তৈরি করেছেন। তবে এ অঞ্চলের গ্রামগুলোতে এখনো মাটির বাড়ি লক্ষ করা গেলেও কালের বিবর্তনে আর কেউ নতুনভাবে মাটির বাড়ি তৈরি করতে আগ্রহী হচ্ছে না। মাটির বাড়ি বসবাসের জন্য আরামদায়ক হলেও অধিক নিরাপত্তা ও স্বল্প জায়গায় দীর্ঘস্থায়ীভাবে বেশি লোক বসবাসের জন্য পাকা বাড়ি বানাচ্ছে মানুষ। দুঃখজনক বিষয় হলো, মাটির বাড়ি বানাতে গেলেও আগের মতো মাটি পাওয়া যায় না।

মাটির ঘর বরেন্দ্র অঞ্চলের একটি ঐতিহ্য। ইটের দালান বাড়ির তুলনায় মাটির ঘর কোনো অংশে কম নয়। মাটির ঘরে গরমের সময় ঠান্ডা ও আরামদায়ক এবং শীতের সময় বেশ গরম অনুভূত হয়। ভূমিকম্প বা বন্যা না হলে একটি মাটির বাড়ি শত বছরেরও বেশি স্থায়ী হয়। কিন্তু সময়ে সঙ্গে সঙ্গে এ অঞ্চলের মাটির ঘর বিলুপ্তির পথে। চিরায়ত বাংলার এই ঐতিহ্য রক্ষার বিষয়ে আমাদের ভাবতে হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, রাজশাহী কলেজ