নিরাপত্তার স্বার্থে ‘শক্তিশালী পাসওয়ার্ড’

সাইবার জীবনের মূল চাবিকাঠি হলো নিরাপদ এবং শক্তিশালী পাসওয়ার্ড। পত্রপত্রিকা, টেক্সট বুক বা ম্যাগাজিন যেখানেই সিকিউর পাসওয়ার্ড সম্পর্কে আলোচনা করা হয়, সেখানে তালাচিহ্ন ব্যবহার করতে দেখা যায়। ‘তালা’ আমরা মূলত চোর-ডাকাতের হাত থেকে নিজেদের সম্পদ রক্ষা করার জন্য ব্যবহার করি। কিন্তু সাইবার দুনিয়ায় আমরা তালা ব্যবহার করি ভদ্র লোকদের জন্য। কারণ একাধিক গবেষণা বলছে, প্রোগ্রামিংসংক্রান্ত বিষয়ে টাই-কোট পরা অভিজ্ঞ ও ভদ্র জনগোষ্ঠীই ঘরে বসে সাইবার দুনিয়ার তালা ভেঙে লুট করে নিচ্ছে হাজারও মানুষের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।

বিবিসির তথ্য মতে, ২০১৯ সালে সারা পৃথিবীতে প্রায় ৫৩ কোটির বেশি ফেসবুক ব্যবহারকারীর তথ্য চুরি হয়ে যায়। যা ২০২০ সালের এপ্রিল মাসে একটি হ্যাকিং ওয়েবসাইটে ব্যবহারকারীদের ফোন নম্বর ও ইমেইলসহ প্রকাশ করা হয়। এসব হ্যাকিংয়ের বড় একটি কারণ হচ্ছে চাঁদাবাজি বা ব্লাকমেইলিং করা। শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বে এই অপরাধীচক্র ছড়িয়ে পড়েছে। সাইবার দুনিয়ায় নিরাপত্তা বাড়াতে আমাদের উচিত সিকিউর পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা। অর্থাৎ এমন পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা যেগুলো খুবই ইউনিক এবং যা সহজে ভাঙা যায় না।

সিকিউর পাসওয়ার্ড নিশ্চিত করার জন্য আমাদের কিছু করণীয় আছে। যেমন : বর্ণ বা সংখ্যার কম্বিনেশন দিয়ে পাসওয়ার্ড তৈরি করা এবং ছোট বা বড় হাতের বর্ণ ব্যবহার করা, প্রতীকী চিহ্ন (#,*,৳ ইত্যাদি) এবং নন-ডিকশনারি শব্দ ব্যবহার করা। এছাড়াও, কমপক্ষে আট থেকে বারো ডিজিট দিয়ে পাসওয়ার্ড তৈরি করা এবং নিয়মিত পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করা। কোথাও নিজের ফেসবুক, জিমেইল বা সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে লগ ইন করলে, কাজ শেষে লগ আউট করে দেওয়া। ক্ষেত্র বিশেষে, কোনো একটি নন-ডিকশনারি শব্দকে উলটো করে ব্যবহার করেও পাসওয়ার্ডকে শক্তিশালী করা যায়। 

নিরাপদ এবং শক্তিশালী পাসওয়ার্ড নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমাদের কতকগুলো বিষয় থেকে দূরে থাকা উচিত। যেমন :কমন পাসওয়ার্ড ব্যবহার না করা এবং একই পাসওয়ার্ড অনেক অ্যাকাউন্টে ব্যবহার না করা, নিজস্ব তথ্য (মোবাইল নম্বর, জন্মতারিখ, ঠিকানা ইত্যাদি) দিয়ে পাসওয়ার্ড তৈরি না করা। কারোর সঙ্গে মেসেজ আদানপ্রদান মিডিয়াতে পাসওয়ার্ড শেয়ার না করা। পাসওয়ার্ড মনে রাখার জন্য ফাইলে পাসওয়ার্ড লিখে আমরা গুগল ড্রাইভে আপলোড করে রাখি। এটা থেকেও নিজেদের বিরত থাকা। কেউ কেউ জিমেইলের পরিবর্তে ফোন নম্বর ব্যবহার করে সোশ্যাল অ্যাকাউন্ট তৈরির ক্ষেত্রে। এতে করে খুব সহজেই হ্যাকার তার উদ্দেশ্য হাছিল করতে পারে। অনেক সময় দেখা যায়, প্রয়োজনে পড়ে আমরা অন্যের ডিভাইসে নিজেদের অ্যাকাউন্টে লগইন করি। তখন ব্রাউজার থেকে নোটিফিকেশন আসে আপনার সাইটটি অটো সেইভ করুন। এ বিষয়টিও অন্তত গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। এছাড়াও ব্যবহারকৃত পাসওয়ার্ড পুনরায় ব্যবহার করার অভ্যাসটি পরিবর্তন করতে হবে। কারণ ব্যবহারকারীদের মধ্যে এই অভ্যাসও কমবেশি দেখা যায়। 

পাসওয়ার্ড শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, পাসওয়ার্ড কোথাও লেখা যাবে না। ফলে আমরা পাসওয়ার্ড ভুলে যায় অধিকাংশ সময়। এক্ষেত্রে পাসওয়ার্ড সহজে মনে রাখার জন্য আমাদের উচিত কোনো গান বা কবিতার লাইন, বইয়ের কোটেশন পাসওয়ার্ড হিসাবে ব্যবহার করা অথবা আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ এমন একটা লাইন ব্যবহার করা, যা অন্যের কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ না। এরকম পাসওয়ার্ড ব্যবহার করলে সহজে মনে রাখা যায়, আবার এগুলো সহজে হ্যাক হওয়ার ভয়ও থাকে না। ইনস্টিটিউট অব ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ার্স (আইইই) থেকে জানা যায় যে, একজন হ্যাকার আট ডিজিটের বেশি WPA-2 PSK( Pre Shared Key) যুক্ত একটি শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ভাঙতে চাইলে তার ৬৫ হাজার বছরের বেশি সময় লাগবে। হ্যাকারদের হাত থেকে নিজস্ব তথ্য নিরাপদ রাখার জন্য এবং সাইবার দুনিয়াতে ঝুঁকিমুক্ত জীবন যাপনের জন্য শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহারের বিকল্প নেই।

লেখক : শিক্ষার্থী, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়