যোগাযোগ কিংবা বাণিজ্যের একদম শুরুটা যেখানে ছিল পায়ে হাঁটা, বিবর্তনের ধারায় সেই যোগাযোগ ব্যবস্থা পে্ৗছে যায় পা থেকে চাকায়, গরুর গাড়ি থেকে ঘোড়ার গাড়ি, তারপর যন্ত্রযান। শুধু এখানেই থেমে নেই। সভ্যতার উন্মেষে এসেছে আরও নতুন নতুন যন্ত্র, হয়েছে নতুন নতুন প্রযুক্তির আবির্ভাব। বিস্তৃত আকাশও আজ দেশ হতে দেশান্তরে পাড়ি দেওয়ার এক স্বনির্ভরশীল পথ। যোগাযোগের এই সহজলভ্যতা ক্রমেই শহরগুলোকে করে তুলেছে জনাকীর্ণ। যন্ত্রযানের ভিড়ে কমে এসেছে বাংলাদেশের অন্যতম ব্যস্ত নগরী ঢাকার গতি। ট্রাফিকজ্যাম এই শহরের নিত্যদিনের সঙ্গী।
দৈনিক জ্যাম, ভোগান্তি, সড়কেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা নাকাল হওয়ার হাত থেকে নিষ্কৃতি পেতে দেশে বাস্তবায়নের প্রায় শেষ পর্যায়ে মেট্রোরেল প্রকল্প। মেট্রোরেলের নান্দনিক স্টেশনগুলোতে থাকছে যাত্রীদের অত্যাধুনিক সেবার সব সুবিধা। স্থায়ী পাশ ব্যবহারকারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়ারও পরিকল্পনা রয়েছেরেল কর্তৃপক্ষের। সর্বোপরি মেগা প্রজেক্ট হিসেবে দেশের অর্থনীতিতে একটা বিশেষ অবদান রাখতে চলেছে এই মেট্রোরেল।
উত্তরার দিয়াবাড়ী থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২০.১ কিলোমিটার মেট্রোরেলের দিয়াবাড়ী আগারগাঁও অংশে ১১.৭৩ কিলোমিটার পথ চালু হতে যাচ্ছে চলতি বছরের ডিসেম্বরে। মোট ১৭টি স্টেশনের ৯টি স্টেশনে চলবে প্রথম দফায় চলবে মেট্রোরেল। এতে মেট্রোরেলের প্রকল্প ব্যায় দাঁড়াল ২৯ হাজার ৪৮৫ কোটি টাকা। স্টেশনগুলোতে থাকবে বিপণিবিতান, যাত্রীদের সময় কাটানোর জন্য থাকবে হোটেল, রেস্টুরেন্ট, কফিশপ এবং বিনোদনকেন্দ্র। আধুনিক বিশ্বের আদলে তৈরি এই মেট্রোরেল শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থায় নয়, ঢাকার মানুষের জীবনমান পরিবর্তনেও আনবে ব্যাপক পরিবর্তন।
মেট্রোরেল বাংলাদেশের অন্যতম ব্যস্ত শহর ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন এক দর্পণ। সারা পৃথিবীতে যত উন্নত দেশ রয়েছে এবং যাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা সবচেয়ে উন্নত, মেট্রোরেলই ছিল তাদের প্রথম শুরু। এখন পর্যন্ত আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে শুধুমাত্র ভারতই পেরেছে মেট্রোরেল সার্ভিস চালু করতে। উন্নতির এই তালিকায় এবার যুক্ত হতে যাচ্ছে আমাদের বাংলাদেশ। মেট্রোরেল সারা পৃথিবী জুড়েই উন্নত এবং দীর্ঘমেয়াদি যোগযোগ ব্যবস্থা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হবে না। যে মেট্রোরেলের স্বপ্ন আজ বাস্তবে পরিণত হতে চলেছে, তার প্রাথমিক কর্মযজ্ঞ শুরু হয়ে গিয়েছিল ২০১২ সাল থেকেই। সম্ভাব্যতা যাচাই, ট্রাফিক জরিপ, ভূপ্রযুক্তিগত সমীক্ষা, প্রকল্পের সাহিত্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব, মাটির নিচে গ্যাস এবং বৈদ্যুতিক লাইন স্থানান্তর, এবং মেট্রোরেলের ওপরের অংশে বিদ্যুৎ চলাচলের নির্বিঘ্নতাসহ বিশাল এই সমীক্ষা গুলো সম্পাদন করতেই সময় লেগে যায় দুই বছর। ২০১৬ সালের ২৬ জুন মেট্রোরেলের প্রথম দফা কাজ শুরু হয়, আর যেটা ছিল মাটির নিচের গ্যাস, ইলেকট্রিসিটি ও পানির লাইন স্থানান্তর। বিশাল একটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পর আজ ২০২২ সালে এসে আমরা মেট্রোরেল উদ্বোধনের একেবারে দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছি।
উল্লেখ করার মতো বিষয়, মেট্রোরেলের পুরো লাইন জুড়েই থাকবে এক ধরনের ‘নয়েজ ব্যারিয়ার ওয়াল।’ এই ব্যারিয়ারের ফলে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ এলাকা যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বায়তুল মোকাররমের মতো এলাকাগুলোতে শব্দদূষণের মাত্রাও কমে আসবে। ঘণ্টায় ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার বেগে চলা মেট্রোরেল প্রতি ঘণ্টয় ৬০ হাজার লোককে যাতায়াত সুবিধা প্রদান করবে। আপাতদৃষ্টিতে উত্তরা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেলের শেষ ঠিকানা মনে হলেও বর্তমানে আন্ডারকনসট্রাকশনে থাকা ২১ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রোরেলের মতো করে আরও সাতটি মেট্রোরেল প্রজেক্ট সরকারের হাতে রয়েছে। সবগুলো লাইন মিলে ঢাকার আশেপাশে জুড়ে মোট ১৩০ কিলোমিটারও বেশি রেললাইন তৈরি করা হবে মাটির নিচ দিয়ে।
সর্বোপরি ঢাকা শহরের যানজট নিরসনে এক নতুন দর্পণ হতে চলেছে এই মেট্রোরেল। যা নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য গর্বের। দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সঠিক ব্যবহার ও সব নিয়মনীতি মেনে চলা নাগরিক হিসেবে আবশ্য কর্তব্য। মেট্রোরেলের এই নতুন হাওয়া ছড়িয়ে পড়ুক যানজটের এই শহরে—নিরাপদ হোক সড়ক, জীবন হোক সহজ।
লেখক : শিক্ষার্থী, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়