বন্ধ হোক অবৈধ হাসপাতাল-­ক্লিনিক

আমাদের দেশে যেখানে-সেখানে গড়ে উঠছে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সংখ্যা বাড়লেও বাড়েনি চিকিৎসাসেবার মান। চিকিৎসাক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফেরানোর লক্ষ্যে সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অভিযানে গবেষণা জরিপের ফল প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র আইসিডিডিআর,বি। জরিপ বলছে, দেশে বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকের কেবল ৬ শতাংশ বৈধ। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৫৯ শতাংশ নতুন লাইসেন্স পেতে কিংবা নবায়ণের আবেদন করেছে, যদিও পায়নি এখনো। ৩৫ শতাংশ লাইসেন্স না নিয়ে কিংবা নবায়নের আবেদন না করেই চলছে।

পৃথিবীতে মানবসেবার যত পেশা রয়েছে, তার মধ্যে চিকিৎসা অন্যতম। কিন্তু একশ্রেণির অর্থলোভী মানুষ এ মহান পেশার সুযোগ নিয়ে গড়ে তুলছে অবৈধ ক্লিনিক ও হাসপাতাল। বাংলাদেশের বেশির ভাগ লোক দরিদ্র এবং অধিকাংশ লোক গ্রামে বাস করছে। যেখানে এ দেশের অনেক মানুষ এখনো দুবেলা পেট ভরে খেতে পারে না, সেখানে রোগব্যাধি যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। দরিদ্র জনগোষ্ঠী গ্রাম্য ডাক্তারের কাছে সেবা নিয়ে সুস্থ না হলে সরকারি হাসপাতালে যান; এবং সেখানে ভালো চিকিৎসা না পেলে অবৈধ ক্লিনিকগুলোর চটকদার সাইনবোর্ড দেখে বাঁচার আশায় যান তাদের কাছে। ফলস্বরূপ একদিকে জীবন বাঁচাতে তারা তাদের ভিটে মাটি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন, অন্য দিকে ভুল চিকিৎসায় অকালে হারাচ্ছেন প্রাণ ।

আমাদের দেশের অধিকাংশ লোক দরিদ্র। কিন্তু তার পরও দেখা যায়, বর্তমানে দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ স্বাস্থ্যসেবার জন্য নির্ভর করে বেসরকারি হাসপাতালের ওপর; কেননা দেশের সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা মানসম্পন্ন নয়। অধিকাংশ হাসপাতালে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের ব্যবস্থা নেই, নেই জেনেটিক বা বায়োমলিকুলার ল্যাব। আইসিইউ সুবিধা অপর্যাপ্ত। সব মেডিক্যাল কলেজে নেই হার্টে রিং পরানোর ব্যবস্থা কিংবা কিডনি ডায়ালাইসিসের সুবিধা। এসব সীমাবদ্ধতাকে পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী মহল গড়ে তুলেছে অসংখ্য অবৈধ হাসপাতাল। তারা ব্যবসার উদ্দেশ্যে সাইনবোর্ড ব্যানারে সর্বাধুনিক চিকিৎসা ও প্রযুক্তির ব্যবহারের নিশ্চয়তা ও দেশি বিদেশি ডিগ্রিধারী চিকিৎসকের কথা বলে থাকে।

অবৈধভাবে গড়ে ওঠা হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে কোনো নিয়ম মেনে তৈরি করা হয় না। সেই হাসপাতাল ও ক্লিনিকে না থাকে রোগীর জন্যে সুস্থ পরিবেশ, থাকে না পর্যাপ্ত পরিমাণে অভিজ্ঞ ডাক্তার। তাদের কাছে মানুষের জীবনের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে অর্থ। সুস্থ হতে এসে সঠিক চিকিৎসার অভাবে অনেক মানুষকে আলিঙ্গন করতে হয় মৃত্যুকে। প্রায়ই ভুল অস্ত্রোপচারে নবজাতকের মৃত্যু, ভুল চিকিৎসায় শিশুর মৃত্যুসহ নানা সংবাদ শোনা যায়।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব দেশের মানুষের জান ও মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আমাদের দেশে সরকারি পর্যায়ে চিকিৎসার মান যদি ভালো হতো, তাহলে অবৈধ হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে জনসাধারণ ভিড় করত না। বিভিন্ন কারণে আমাদের দেশের সরকারি হাসপাতালের সেবা নিয়ে নিয়ে সংশয় ও যথেষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে, এ কথা স্বীকার করতেই হবে। এক্ষেত্রে যদি যৌথ বা ব্যক্তিমালিকাধীন পর্যায়ে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক গড়ে ওঠে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু চিকিৎসার মতো মহান পেশার আড়ালে যারা অবৈধ হাসপাতাল ও ক্লিনিক তৈরি করে প্রতারণা করছে এবং মানুষের জীবন নিয়ে খেলছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। যথোপযুক্ত আইন প্রণয়ন করে এই অপরাধী চক্রকে নির্মূল করতে হবে। সরকারি চিকিৎসাসেবার মান বাড়াতে হবে। তবেই দেশের নিম্নবিত্ত এবং সীমিত আয়ের ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষেরা পাবে সঠিক ও পর্যাপ্ত চিকাত্সাসেবা।

লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়