অনলাইন ব্যাংকিং ও বাংলাদেশ

ব্যাংক একটি মুনাফাভোগী আর্থিক প্রতিষ্ঠান। ব্যাংক যুগ যুগ ধরে গ্রাহকদের আস্থা ও সুষ্ঠু সেবা নিশ্চিত করে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন হয়েছে ব্যাংকের গ্রাহকসেবার মান। একবিংশ শতাব্দীর এ যুগে তথ্য প্রযুক্তির ক্রমাগত উন্নতিতে গ্রাহকের সেবায় একটি নতুন উন্নত মাত্রা যোগ করেছে ‘অনলাইন ব্যাংকিং’। তবে তথ্যপ্রযুক্তির আগমনে সারা বিশ্বে অনলাইন ব্যাংকিং উন্নত গ্রাহকের সেবায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এর তেমন একটা ব্যাপকতা লক্ষ করা যায় না। বলা যায়, বেশির ভাগই অপরিচিত এই অনলাইন ব্যাংকিংয়ের সুবিধা ও অসুবিধা সম্পর্কে।

১৯৯০ সালে অনলাইন ব্যাংকিং সিস্টেমটি চালু হওয়ার মাত্র বছরখানেকের মধ্যেই এই ব্যাংকিং সিস্টেমটি সারা বিশ্বে ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও সাড়া ফেলতে থাকে। এখন ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের সব দেশেই বড় বড় ব্যাংকগুলো উন্নত গ্রাহকসেবায় এবং সেবার মান বৃদ্ধিতে চালু করছে অনলাইন ব্যাংকিং সিস্টেম।

বিশ্বায়নের যুগে তথ্যপ্রযুক্তির অপার এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অনলাইন ব্যাংকিং গ্রাহকদের কষ্ট এবং ঝুঁকি এড়ানোর জন্য নানাবিধ সুবিধা প্রদান করছে। উল্লেখযোগ্য কিছু সুবিধা—যেমন :অনলাইন ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অর্থ স্থানান্তরে ব্যাংক নির্দিষ্ট চার্জের বিনিময়ে অতি দ্রুত ও নিরাপদে গ্রাহকের টাকা গ্রহণ করে এবং গ্রাহকের ইচ্ছানুযায়ী তা অন্য শাখায় নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রেরণ করে থাকে। কোনো প্রকার চেক না লিখেই অনলাইনে বিভিন্ন ধরনের বিল পরিশোধ করা যায়। অ্যাকাউন্ট সর্তকতা ও অনুস্মারক সেট আপ করে প্রতিটি লেনদেনের আপডেট জানা যায়। গ্রহণকৃত সব চেকের ছবি ও ট্রানজেকশন হিস্টরি দেখা যায়। কেনাকাটার বিল অনলাইন মারফত পরিশোধ করা যায়। অনেক ব্যাংক অনলাইনে ঋণ গ্রহণ ও ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের সুবিধাও দিয়ে থাকেন। এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের সুবিধা অনলাইন ব্যাংকিং সিস্টেম গ্রাহকদের প্রদান করে থাকে।

আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে উন্নত দেশের ব্যাংকিং লেনদেন অনলাইননির্ভর হলেও তুলনায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। দেশের মধ্যে বিদেশি ব্যাংকগুলোর শত ভাগ শাখা অনলাইনে। সরকারি ব্যাংকগুলো ৯৯ শতাংশ, বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ৯৭ শতাংশ ও বিশেষায়িত সরকারি ব্যাংকগুলোর ২৫ শতাংশ শাখা অনলাইনে। অনলাইনের আওতায় সব থেকে বেশি গ্রাহকসেবা দিয়ে থাকে প্রাইভেট ব্যংকগুলো। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যাংক হলো, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড চাটার্ড ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ইবিএল, শাহজালাল ব্যাংক, এবি ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, সাউথ ইস্ট ব্যাংক ইত্যাদি। শুধু অনলাইন বা ই-ব্যাংকিং সেবায় গত ডিসেম্বরে গ্রাহক ছিল ২০ লাখ ৪০ হাজার। ঐ এক মাসে লেনদেন হয়েছিল ২ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা। ১ কোটি ৫৪ লাখ ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডে গত ডিসেম্বরে লেনদেন হয়েছে ১৩ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা। সারা দেশে এটিএম বুথ রয়েছে ১০ হাজার ৩৫৫। কেনাকাটার জন্য পয়েন্ট অব সেলস রয়েছে ৪৫ হাজার ৮৯৬টি। দেশের ১০ হাজার ১০৯ শাখার মধ্যে ৮ হাজার ৮৯৯ ব্যাংক শাখাই অনলাইনের আওতায়। বর্তমানে দেশে সব মিলিয়ে ৫৯টি ব্যাংক কার্যক্রমে আছে। এর মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি ব্যাংক ছাড়া সব ব্যাংকই অনলাইন ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে। এর মধ্যে কেউ দিচ্ছে পুরোপুরি ব্যাংকিং সেবা, কেউ-বা অল্প কিছু সেবা।

যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ প্রযুক্তিতে অনেকটা উন্নতি করেছে। বর্তমানে আইসিটির বদৌলতে ব্যাংকিং খাতে নতুন নতুন অনেক গ্রাহকসেবা যোগ হয়েছে, বেড়েছে কর্মদক্ষতা, কর্মসংস্থান। সে তুলনায় দেশের বিশেষায়িত সরকারি ব্যাংক অনলাইন ব্যাংকিংয়ে অনেক পিছিয়ে। এ অবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যাংকিংপদ্ধতি নীতিমালায় আনা জরুরি। না হলে তথ্যপ্রযুক্তির অপার সম্ভাবনাময় যুগে অনলাইন ব্যাংকিং সেক্টরে দেশ ও সরকার অনেক পিছিয়ে থাকবে, যা বিশ্বায়নে দেশের জন্য মঙ্গলজনক নয়।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়