বিষণ্ণতা দূর করুন

জ্বর, সর্দি, মাথাব্যথা, গ্র্যাস্ট্রিক ইত্যাদির ওষুধ নিত্যদিনের সবজি বাজারের মতো আমরা রিজার্ভ রাখি, যাতে অসুস্থ না হই। কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারে আমরা কতটুকু সচেতন? অথচ শরীর এবং মন দুটোই একই মুদ্রার বিপরীত দিক। অর্থাৎ মানসিক স্বাস্থ্য খারাপ থাকলে শারীরিক স্বাস্থ্যের প্রতি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এমনকি মানুষের সুপ্ত ও সৃজনশীল সম্ভাবনাকে ব্যাহত করে মানসিক স্বাস্থ্যের নেতিবাচক দিক। আমরা যদি একটি কম্পিউটারের সঙ্গে মানুষকে তুলনা করি তাহলে হার্ডওয়্যার বা বিভিন্ন যন্ত্রাংশ হবে শারীরিক স্বাস্থ্য এবং সফটওয়্যার হবে মানসিক স্বাস্থ্য। হার্ডওয়্যার পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকলেও সফটওয়্যারবিহীন হার্ডওয়্যার মূল্যহীন। তা থেকেও উপলব্ধি করতে পারি মানসিক স্বাস্থ্য কতটা জরুরি।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ডিপ্রেশন একটি বিরাট ইস্যু। শিক্ষাব্যবস্থা কর্মমুখী না হওয়ার ফলে পড়াশোনা শেষে দীর্ঘ সময় শিক্ষার্থীরা বেকার থাকে। অনেকেই আইডেনটিটি ক্রাইসিসের কারণেও মানসিক বিষণ্ণতায় ভোগে। এছাড়াও বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের কাছে ডিপ্রেশনের অন্যতম কারণ সম্পর্কের অবনতি। আমাদের আবেগ বড্ড ঠুনকো। তাইতো বিশ্বাস, অনুভূতি ও নৈতিকতার বোধগুলোও শূন্য। তরুণ প্রজন্মের কাছে সম্পর্কের সংজ্ঞায়ন অনেকটা তরল পদার্থের মতোই পাত্র অনুযায়ী আয়তনের পরিবর্তন ঘটে। বেশির ভাগ সম্পর্কগুলো ‘জাস্ট ছিল’র মধ্যে সীমাবদ্ধ। তবে এক্ষেত্রে মিডিয়ার সহজলভ্যতা অস্বীকার করার উপায় নেই। অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রায় ৬০ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়। অনলাইনে আপত্তিকর ছবি, মন্তব্য, ভিডিও, কল রেকর্ডের মাধ্যমে অনেক বড় বড় ব্যক্তিরাও প্রতিনিয়ত সমস্যায় পতিত হয়।  এক তথ্যমতে, প্রতি পাঁচ জনে তিন জন সাইবার বুলিংয়ের শিকার হন। সাইবার বুলিংয়ের কারণে অনেকেই সামাজিকভাবে হেনস্তার ফলে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। অনলাইন আসক্তি মানসিক বিষণ্ণতার সহায়ক। গবেষকরা বলেছেন, ৩০ মিনিটের বেশি সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যয় করলে তা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, কিন্তু আমরা নির্বিকার চিত্তে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনলাইনে সময় ব্যয় করি। এছাড়াও পারিবারিক চাপ, অর্থনৈতিক সমস্যা, সাংস্কৃতিক ব্যবধান, কর্মক্ষেত্রে হেনস্তা, পরীক্ষার খারাপ ফলাফল তরুণ প্রজন্মের মানসিক ডিপ্রেশনের কারণ।

আঁচল ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, এ বছরে শুধু মে মাসে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয় জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। আক্ষরিক অর্থে মৃত্যু জীবনের মুক্তি নয়। বরং লড়াই করে বেঁচে থাকতে হবে। এখন সময় এসেছে লাগাম টেনে ধরার। মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কলেজ পর্যায় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সেমিনারের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজন যথাযথ কাউন্সেলিং। শুধু তাই নয়, যেসব কারণে মানসিক সমস্যার উত্থান হয় সেই প্রতিবন্ধকতা রোধকল্পে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। পাঠ্যক্রমে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করলে শিক্ষার্থীদের জানার পরিধি বৃহৎ হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর