১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর। দিনটি আর ১০ দিনের থেকে আলাদা তাত্পর্যময়। ইতিহাসের কালজয়ী মহানায়ক, স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি, বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের কোল জুড়ে এদিন বাঙালি জাতির জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি এসেছেন অন্ধকারে আলোকবর্তিকা হয়ে।
শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর আদরের হাসু। তার রক্ত ও আদর্শের সুযোগ্য উত্তরসূরি। চিন্তা ও কর্মে বঙ্গবন্ধুর প্রতিচ্ছবি। বাইগার নদীর তীরে টুঙ্গিপাড়ায় চিরায়ত গ্রাম-বাংলার সবুজ প্রকৃতির সান্নিধ্যে দুরন্ত শৈশব-কৈশোর কাটানো আর ধুলোমাটি ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে বেড়ে ওঠা একজন নির্ভেজাল বাঙালি নারী তিনি। ব্যক্তি ও রাজনৈতিক জীবনের নানা চড়াই-উত্রাই পেরিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন সততা, সাহসিকতা, আত্মবিশ্বাস আর আত্মমর্যাদার এক সুউচ্চ শিখরে। অসাধারণ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা, আপসহীন নেতৃত্ব, উচ্চকিত প্রত্যয়, মানবিক মূল্যবোধ, সংগ্রামী চেতনা আর সর্বজনীন চিন্তন তাকে আসীন করেছে বিশ্ব নেতৃত্বের আসনে।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও বড় বড় সংস্থা থেকে পেয়েছেন অনবদ্য অবদান ও কৃতিত্বের স্বীকৃতি। শান্তির প্রচার, অনুসন্ধান ও সুরক্ষার জন্য ইউনেসকো থেকে পেয়েছেন ‘হুপে-বোয়ানি’ শান্তি পুরস্কার। অর্জন করেছেন ‘মেডেল অব ডিস্টিনকশন’ ও ‘হেড অব স্টেট’ পদক। বিশ্বশান্তির দূত হিসেবে সর্বভারতীয় শান্তিসংঘ থেকে পেয়েছেন ‘মাদার তেরেসা পুরস্কার’। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় দূরদর্শী ভূমিকার জন্য বিশ্বের পরিবেশবিষয়ক সর্বোচ্চ স্বীকৃতি ‘চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ’ অর্জন করেছেন। খাদ্য ও কৃষিক্ষেত্রে দীর্ঘকালীন প্রতিশ্রুতি তাকে এনে দিয়েছে ‘দ্য সিরিস মেডেল’। মিয়ানমারের বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে ভূষিত হয়েছেন ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ সম্মানে। অর্জন করেছেন জাতিসংঘের ‘আইসিটি টেকসই উন্নয়ন পুরস্কার’। নারীর ক্ষমতায়নে অবদান রাখায় নারী রাজনীতিবিদদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক উইমেন পলিটিক্যাল লিডার্স প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভূষিত করেছে ‘রিজিওনাল লিডারশিপ’ অ্যাওয়ার্ডে। নারী ও কন্যাশিশুদের শিক্ষা প্রসারে অবদানের স্বীকৃতি ‘পিস ট্রি’ অ্যাওয়ার্ড, শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার হ্রাস এবং ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি সাউথ-সাউথ পুরস্কার, নারীর ক্ষমতায়নে অসামান্য অবদানের জন্য ইউএন উইমেন প্রদত্ত ‘এজেন্ট অব চেঞ্জ’ পুরস্কার ও ‘প্ল্যানেট ৫০-৫০ চ্যাম্পিয়ন’ অ্যাওয়ার্ড রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার অর্জনের মুকুটে এক একটি জ্বলজ্বলে পালক। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, সামাজিক নিরাপত্তা প্রদান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে রাষ্ট্রনায়কোচিত ভূমিকা রেখে তিনি হয়ে উঠেছেন ‘স্টেট ম্যান’। বিশ্ব নেতৃত্ব শেখ হাসিনাকে বলেছেন ‘স্টার অব ইস্ট’। শিশুদের টিকাদান কর্মসূচির সাফল্যে তিনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ‘ভ্যাকসিন হিরো’ সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। জাতিসংঘের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সলিউশনস নেটওয়ার্ক তাকে ‘এসডিজি অগ্রগতি পুরস্কার’ প্রদান করে ‘মুকুট মণি’ অভিধায় ভূষিত করেছে। তিনি বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে প্রভাব বিস্তারকারী শীর্ষ পাঁচ ‘ডিলমেকারস’ নেতার একজন। ২০২১ সালে কপ-২৬ সম্মেলনের সময় বিবিসি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বলেছেন ‘The voice of the Vulnerable’।
অথচ দেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতির জ্যেষ্ঠ কন্যার জীবন চলার পথ কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। বিপত্সংকুল আর ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ পথচলায় তাকে হোঁচট খেতে হয়েছে বারবার। বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ২০০৪ সালের ২১ আগস্টসহ অন্তত ২০ বার তাকে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবু তিনি জেগে উঠেছেন ফিনিক্স পাখির মতো। এ দেশের মানুষের সংকটে পরিত্রাণদাত্রীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন বারবার। তার জন্যই বাংলাদেশ আজ বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তার নেতৃত্বেই বাংলাদেশ আজ বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। বাংলাদেশকে নিয়ে আজ গর্বভরে বলা যায়, ‘সাবাশ বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়/জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার, তবু মাথা নোয়াবার নয়।’
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যার পর দুঃসহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে ছয় বছর ছোট বোন শেখ রেহানা, স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়া, পুত্র জয় ও কন্যা পুতুলকে নিয়ে দীর্ঘ প্রবাসজীবন কাটাতে হয়েছে বঙ্গবন্ধু কন্যাকে। ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশনে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নের দৃঢ় অঙ্গীকার, সপরিবারে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতা হত্যার বিচার, স্বৈরতন্ত্রের চির অবসান ঘটিয়ে জনগণের হূত গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সংসদীয় পদ্ধতির শাসন ও সরকার প্রতিষ্ঠার বজ্র শপথে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচন করা হয়। সে সময় বঙ্গবন্ধু তনয়া বলেছিলেন, তিনি নিহত হওয়ার আশঙ্কায় শঙ্কিত নন। এমনকি যে সরকারের মোকাবিলা করবেন তার শক্তিকে তিনি বাধা বলে গণ্য করবেন না। ঢাকা বিমানবন্দরে লাখ লাখ মানুষ তাকে স্বাগত জানাতে সেদিন হাজির হয়েছিলেন। ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয়েছিল ঢাকার আকাশ বাতাস। ‘শেখ হাসিনার আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম’, ধ্বনিতে মুখরিত হয়েছিল রাজধানী ঢাকা।
দীর্ঘ চার দশক দলের এবং প্রায় ১৯ বছর সরকারের নেতৃত্বে আছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। তার নেতৃত্বাধীন সরকার টানা তৃতীয় মেয়াদসহ চতুর্থ বার দেশ পরিচালনা করছে। বাংলাদেশ আজ বিশ্বের ৪১তম বৃহত্ অর্থনীতির দেশ। ব্রিটেনের অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ বলছে—২০৩৫ সালে বাংলাদেশ বিশ্বের ২৫তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হবে। এসব সাফল্যের কারিগর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বর্তমান বিশ্বে অন্যতম মানবিক রাষ্ট্রনায়ক বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৈশ্বিক এই দুর্যোগের সময়েও তিনি শুধু মানবিকতার গুণে হয়ে উঠেছেন অনন্য। আপন মহিমায় শেখ হাসিনা হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের নতুন ইতিহাসের নির্মাতা। তিনি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে মানবতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন অবলীলায়। মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর কথা সবারই জানা। অসহায় রোহিঙ্গাদের মানবতার চাদরে আচ্ছাদন করে রেখেছেন তিনি। দেখিয়েছেন নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন। তাদের আশ্রয় দিয়ে জীবন বাঁচিয়েছেন, খাবার দিয়ে ক্ষুধা নিবারণ করছেন। এজন্য বিশ্ব পরিমণ্ডলে তিনি ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ খ্যাতি অর্জন করেছেন। রোহিঙ্গা-সংকট নিরসনসহ এর স্থায়ী সমাধানে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশনে পাঁচ দফা এবং ৭৪তম অধিবেশনে চার দফা প্রস্তাব রেখেছেন। চলতি বছর জাতিসংঘের ৭৭তম অধিবেশনেও আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে রোহিঙ্গা-সংকট সমাধানের উপায় খুঁজতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আহ্বান জানিয়েছেন। বিশ্ব মানবতার জন্য যেমন তিনি উদার ও মানবিক, ঠিক তেমনি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তার উদারতা ও সহনশীলতা সর্বমহলে প্রশংসিত। ফৌজদারি অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিতের মেয়াদ সম্প্রতি আরো ছয় মাস বাড়ানোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন শেখ হাসিনা। এ উদ্যোগ নিয়ে তিনি উদারতা ও মানবিকতার অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। করোনা মহামারিতে দেশের প্রায় সব শ্রেণি-পেশার দরিদ্র ও অসহায় মানুষকে মানবিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় এনেছেন মানবিক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বঙ্গবন্ধুকন্যার নিরলস প্রচেষ্টায় স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের চূড়ান্ত সুপারিশ ইতিমধ্যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ অনুমোদন করেছে। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেতে যাচ্ছে। এটি বাংলাদেশের সক্ষমতা ও সামর্থ্যের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন। শুধু এখানেই থেমে যাননি দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা। ২০২৫ সালের মধ্যে অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, ২০৩০ সালে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জন, ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা এবং ২১০০ সালে বদ্বীপ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন অদম্য প্রত্যয়ে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে তিনি বদ্ধপরিকর। সে লক্ষ্য নিয়েই সব প্রতিকূলতা পেছনে ফেলে তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন।
সাম্প্রতিক কালে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রভাবশালী রাজনীতিক ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের নাম শেখ হাসিনা। রাষ্ট্র পরিচালনা এবং বৈশ্বিক দুর্যোগ ও সংকটের ন্যায্য ও শান্তিপূর্ণ সমাধানে তার সোচ্চার কণ্ঠ ও অনবদ্য নেতৃত্ব সারা বিশ্বে প্রশংসনীয় স্থান করে নিয়েছে। রাজনীতির দূরদর্শিতায়, নেতৃত্বের উৎকর্ষে, রাষ্ট্র পরিচালনার অতুলনীয় দক্ষতায়, আপসহীন দৃঢ়তায়, মানবিকতার অপূর্ব সৌন্দর্যে আর বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার অসাধারণ প্রচেষ্টায় তিনি আজ অনন্য উচ্চতায় আসীন। তার ৭৬তম জন্মদিনে আমাদের প্রত্যাশা—তিমিরবিদারী জ্যোতির্ময় হয়ে তিনি আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকুন দীর্ঘজীবন। তিনি যেন ভালো থাকেন। কারণ তিনি ভালো থাকলে বাংলাদেশ ভালো থাকবে। তিনি ভালো থাকলে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা আরো একধাপ এগিয়ে যাবে, জয় হবে মানবিক বিশ্বের। তাই তো আমাদের দৃঢ়প্রত্যয়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের ভাষায় সার্থকভাবেই বলা যায়, ‘ভেঙেছ দুয়ার, এসেছ জ্যোতির্ময়/তোমারি হউক জয়/তিমিরবিদারী উদার অভ্যুদয়/তোমারি হউক জয়।’
লেখক : মন্ত্রী, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়