ডিপ্রেশন কোনো নাটক নয়, ডিপ্রেশড মানেই পাগল নয়। এটি একটি মানসিক ইমব্যালেন্সড সিচুয়েশন। এটি সাইকোলজিরই একটি অংশ। যার পরিণতি হয় অত্যন্ত ভয়ংকর। অথচ খুব সহজেই করা যায় এর চিকিৎসা। আমরা ডিপ্রেশন শব্দটাকে যতটা সহজভাবে নিতে পারি সাইকোলজিক্যাল ডিসওর্ডার শব্দটাকে ততটা সহজে এখনো এক্সসেপ্ট করতে পারিনি। এর সঙ্গে মানুষের পরিচিতিও খুবই কম। কেননা শরীরের অসুখ হলে আমরা মানুষকে জানাতে যতটা পছন্দ করি মনের অসুখ মানুষের কাছে গোপন রাখতে তার চেয়েও বেশি পছন্দ করি। এজন্যই বোধহয় সাইকোলজি শব্দটা আমাদের কাছে আজও অপছন্দনীয়।
বর্তমান সময়ে আমরা প্রতিনিয়ত সাইকোলজির ভেতর দিয়ে জীবনযাপন করে থাকলেও সবাই সেই সাইকোলজি বুঝি না। যদিও সাইকোলজি নিয়ে গবেষণা বাড়ছে দিন দিন। মজার বিষয় হলো, আমরা সাইকোলজিক্যাল বেশ কিছু ফ্যাক্ট নিজের জীবনে নিজের অজান্তেই প্রয়োগ করে ফেলি। আবার অনেকেই সেগুলোকে কুসংস্কারও বলে থাকি।
জীবনের লক্ষ্য যখন কাউকে বলে দেওয়া হয় তখন মানবমস্তিষ্ক থেকে এমন কিছু হরমোন নিঃসৃত হয়, যা মস্তিষ্ককে সেই কাজে সফলতার আনন্দ দেয়। মস্তিষ্ক তখন সেই কাজটি কর?তে মানুষকে ডিমোটিভেট করে। ফলে সেই কাজ করার আগ্রহ ক্রমেই কমে যায়। যার ফলে আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছানোর সম্ভাবনা কমে যায়। একটু লক্ষ করলেই একটি বিষয় দেখা যায়, আমরা যখন নিজেদের মাতৃভাষায় কথা বলি, তখন ভেবে কথা বলি না। কিন্তু যখন বিদেশি কোনো ভাষা অর্থাৎ ইংরেজি বা হিন্দি ভাষায় কথা বলি, তখন অনেক ভেবেচিন্তে কথা বলি। কেননা অন্য ভাষায় কথা বলতে গেলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা আমাদের মস্তিষ্ককে সচেতন করে। ফলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বিদেশি কোনো ভাষায় সিদ্ধান্ত নিলে সেটি বেশি যুক্তিসঙ্গত হয়। ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর এক সমীক্ষায় দেখা যায়, যখন আমরা মাতৃভাষায় কোনো সিদ্ধান্ত নিই, তখন আমাদের অবচেতন মন আবেগকে বেশি প্রাধান্য দেয়। কিন্তু দ্বিতীয় কোনো ভাষায় চিন্তা করলে মস্তিষ্ক লজিককে প্রাধান্য দেয়। তাই আমাদের উচিত গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় দ্বিতীয় কোনো ভাষায় চিন্তা করা।
একবার আমার এক বান্ধবী দুপুর ১২টায় ঘুম থেকে ওঠে আমাকে বলেছিল, আমি অনেক ক্লান্ত, প্লিজ আজকের রান্নাটা করে ফেলেন। কথাটি শুনে প্রচণ্ড রেগে গিয়েছিলাম। তবে পরে সাইকোলজিক্যাল ফ্যাক্ট গুলো নিয়ে পড়তে গিয়ে জানলাম, রুটিনমাফিক জীবন থেকে বেরিয়ে এক দিন ১০/১১ ঘণ্টা ঘুমিয়ে যখন আমরা ঘুম থেকে উঠি, তখন শরীর বেশ ক্লান্ত লাগে। কেননা অতিরিক্ত ঘুম আমাদের শরীর ও ব্রেনে না ঘুমানোর সমান প্রভাব ফেলে। এ অবস্থায় আমাদের মনে হয়, আমাদের ঘুম হয়নি আরো ঘুমের প্রয়োজন। আসলে অতিরিক্ত ঘুম আমাদের বায়োলজিক্যাল ক্লককে নষ্ট করে দেয়, ফলে এমন অনুভূতি হয়। এর পর আর বান্ধবীর ওপর রাগ ছিল না। এর পর ওকে বলে দিয়েছি প্রতি দিন নিয়মমাফিক সাত-আট ঘণ্টা ঘুমাতে।
অনেকের মুখে প্রায়ই শোনা যায়, সারা দিন বাড়ি থেকে বের হইনি শরীরটা ঝিম ঝিম করছে, মন ভালো নেই। এ কথা শুনে অনেকেই বলে বসেন যতসব ঢং। কিন্তু জানেন সূর্যের আলো শরীরে পড়লে এক ধরনের হরমোন নিঃসৃত হয়, যার ফলে মন ভালো হয়ে যায়। সূর্যের আলো হাড় এবং মন দুটির জন্যই উপকারী। তাই সারা দিন ঘরে বসে কাজ না করে সময় করে কিছুক্ষণের জন্য সূর্যের আলোয় বের হয়ে যাওয়া উচিত। এতে শরীর ও মন ভালো থাকে। কাজ করার আগ্রহও বেড়ে যায়।
আমাদের অনেকেরই অনেক বড় একটি সমস্যা হলো, আমরা একবারে অনেক কাজ করে ফেলতে চাই। ফলাফল স্বরূপ কোনো কাজই ঠিক মতো হয় না। আমরা দুই-তিনটি কাজ একসঙ্গে শুরু করে মনে করি, আমরা মাল্টিটাস্ক করছি। আসলে তখন মস্তিষ্ক এক কাজ থেকে অন্য কাজে স্থানান্তর করে। বিশেষ করে যেসব কাজে ব্রেনের সক্রিয়তা প্রয়োজন, সেসব কাজ ব্রেন কখনোই একসঙ্গে করতে পারে না। এখন অনেকেই বলতে পারেন, আমরা খাবার খাওয়ার সময় টিভি দেখি একসঙ্গে দুটি কাজ করা হলো। এক্ষেত্রে অনেক দিনের অভ্যাসের ফলে কাজ দুটি এক সঙ্গে করা হলেও মস্তিষ্কের খুব বেশি সক্রিয়তার প্রয়োজন হয় না। তাই আমরা কাজগুলো করতে পারি।
কারণে-অকারণে মিথ্যা বলা আমাদের অভ্যাস। বর্তমানে অকারণে মিথ্যা বলতেই আমরা বেশি পছন্দ করি। এই ধরুন, আপনার বন্ধুর সঙ্গে সকাল ৯টায় দেখা করার কথা ছিল। দেরিতে ঘুম থেকে উঠে আপনি আপনার বন্ধুকে বললেন—‘দোস্ত, আমি তো রাস্তায়, আসতেছি।’ যদিও এই মিথ্যা বলবার কোনো প্রয়োজন ছিল না। তবু আপনি বলছেন। কে আপনার সঙ্গে মিথ্যা বলছে, সেটি কিন্তু একটু খেয়াল করলেই আপনি বুঝতে পারবেন। কোনো ব্যক্তি মিথ্যা বলার সময় তার হাত-পা নাড়াতে থাকে। আর চোখের দিকে তাকিয়ে সে কখনোই মিথ্যা বলতে পারে না। কেননা মিথ্যা বলার সময় তার মস্তিষ্কের নিজের অজান্তেই অপরাধী অনুভূত হয়। আর যদি এমন কেউ থেকে থাকে যে, চোখের দিকে তাকিয়ে অনায়াসে মিথ্যা বলতে পারে, তাহলে তার থেকে যতদূর সম্ভব দূরে থাকুন।
অর্থাৎ, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সব কাজই আমাদের সাইকোলজির সঙ্গে জড়িত। এই সাইকোলজিকে আমরা অবচেতন মন বলে ব্যাখ্যা করি। আসলে সাইকোলজি আমাদের আবেগ বা অবচেতন মন নয়। এটি একটি বিজ্ঞান—যা প্রমাণিত। নতুন কিছু পড়তে-শিখতে-জানতে আমাদের মস্তিষ্ক কতটা ক্রিয়াশীল তা নিয়ে গবেষণা করছে নিউরোসাইকোলজি। তাই সাইকোলজিক্যাল বিষয়গুলো কোনো পাগলামি বা কুসংস্কার নয়, মানবমনের সুস্থতার নতুন দ্বার।
লেখক :শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়