পরিবেশ প্রকৌশল মূলত একটি পেশাদারি প্রকৌশল ক্ষেত্র, যেখানে পরিবেশ ও পরিবেশের বিভিন্ন উপাদানের বিশোধন, সংগ্রহণ, সংরক্ষণ, সর্বোপরি পুরো পরিবেশ রক্ষার উপায়সমূহ আলোচিত হয়। পরিবেশ প্রকৌশল এমন একটি শাখা, যা রসায়ন, জীববিজ্ঞান, পরিবেশবিজ্ঞান, ভূতত্ত্ব, জলবিদ্যা, অণুজীববিজ্ঞান ও গণিতের মতো বিচিত্র বৈজ্ঞানিক বিষয়ের সম্মিলনে জীবের স্বাস্থ্য রক্ষা এবং পরিবেশের মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় সমস্যা সমাধানের সন্ধান করে।
পরিবেশ প্রকৌশল হচ্ছে পরিবেশের উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বৈজ্ঞানিক ও প্রকৌশল নীতির প্রয়োগ, যাতে মানবস্বাস্থ্য রক্ষিত হয়, প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষিত হয় এবং মানবজীবনের মানোন্নয়ন সম্পর্কিত পরিবেশজনিত বিষয়ের উৎকর্ষসাধন ঘটে। পরিবেশ প্রকৌশলীরা বর্জ্য পানি ব্যবস্থাপনা, পানি ও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, পুনর্ব্যবহার, বর্জ্য নিষ্কাশন ও জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্ভূত সমস্যার সমাধান প্রদান করেন। তারা নগরের পানি সরবরাহ ও শিল্পের বর্জ্য পানি শোধনাগার ব্যবস্থার নকশা করেন। পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধ এবং শহুরে ও গ্রামীণ এলাকার স্যানিটেশন ব্যবস্থা উন্নত করার পরিকল্পনা করেন। তারা ঝুঁকির তীব্রতা মূল্যায়নের উদ্দেশ্যে বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মূল্যায়ন করেন, এগুলোর ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে উপদেশ প্রদান করেন এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধের জন্য নিয়মকানুন বিকশিত করেন।
পরিবেশ প্রকৌশল এমন সব কাজের নাম, যেগুলো সভ্যতার শুরুতেই মানুষ নিজের চাহিদা পূরণের জন্য পরিবেশগত অবস্থা পরিবর্তন ও নিয়ন্ত্রণ করতে শেখার সময় থেকে করে আসছে।
রোমে ৩১২ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে প্রথম নালা নির্মিত হয় এবং এরপর থেকে তারা খরার সময় সেচ ও সুপেয় পানি সরবরাহের জন্য নালা নির্মাণ অব্যাহত রাখে। এমনকি তারা খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীর শুরুতেই একটি ভূগর্ভস্থ নর্দমাব্যবস্থা নির্মাণ করেছিল, যা তাইবার নদী পর্যন্ত প্রবাহিত হয়ে জলাবদ্ধতা নিরসনের মাধ্যমে কৃষিজমি তৈরি এবং একই সঙ্গে শহর থেকে নর্দমা অপসারণ, উভয় কাজই করত। রোমের পতন থেকে ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে ক্রমবর্ধমান প্রচেষ্টা ছাড়া খুব সামান্যই পরিবর্তন লক্ষ করা যায়।
আধুনিক পরিবেশ প্রকৌশল ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে লন্ডনের গ্রেট স্টিংক ঘটনার পর জোসেফ বাজালগেটের প্রথম প্রধান নর্দমা নিকাশী ব্যবস্থা নকশার মাধ্যমে শুরু হয়। সে সময় শহরের নর্দমাব্যবস্থা টেমস নদীতে কাঁচা নর্দমা সরবরাহ করত, যে নদী আবার শহরের পানীয় জলের সিংহভাগের সরবরাহকারী, যার ফলে কলেরা মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে। শিল্পোন্নত দেশগুলোতে পানীয় জল শোধন ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার প্রবর্তন, পানিবাহিত রোগকে মৃত্যুর প্রধান কারণ থেকে বিরল কারণে পরিণত করেছে।
কূপ ও জলাশয় নির্মাণকারী একই মানুষ, যারা ছিলেন শহরের দেওয়াল ও অন্যান্য নির্মাণকারী। এই লোকেরাই প্রাচীনকালের প্রকৌশলী হয়ে ওঠেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গঠনমূলক বছরগুলোতে প্রকৌশলীরা বেশির ভাগই স্বশিক্ষিত ছিলেন অথবা নবগঠিত ইউনাইটেড স্টেটস মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষিত হয়েছিলেন। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার রাস্তা, সেতু, ভবন ও রেলপথের নির্মাতাকে নকশা ও নির্মাণের জন্য আহ্বান করা হয়েছিল শহরগুলোর জন্য জল সরবরাহ এবং ব্যবস্থাপনার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা প্রদান করতে।
পানি ও বায়ুদূষণ এবং অন্যান্য পরিবেশগত অবক্ষয় সম্পর্কে জনগণের ব্যাপক উদ্বেগের প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে পরিবেশ প্রকৌশল একটি পৃথক একাডেমিক শাখা হিসেবে আবির্ভূত হয়। সমাজ ও প্রযুক্তির জটিলতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এগুলো ক্রমবর্ধমানভাবে প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর অনভিপ্রেত প্রভাব সৃষ্টি করতে শুরু করে। একটি উদাহরণ হলো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের বছরগুলোতে কৃষিক্ষেত্রে কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণের জন্য কীটনাশক ডিডিটির ব্যাপক প্রয়োগ। ডিডিটির গল্প, যা রেচল কারসনের ‘সাইলেন্ট স্প্রিং (১৯৬২)’ গ্রন্থে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে, এটিকে আধুনিক পরিবেশ আন্দোলনের জন্মসূত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং সমাজের নিরাপদ পানীয় জল ও তরল ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে শুরু হয়েছিল। নগরায়ণ ও শিল্পায়ন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ গঠনে উল্লেখযোগ্যভাবে ভূমিকা রেখেছে অনেক এলাকায়। জনস্বাস্থ্য ও স্যানিটারি শব্দগুলো প্রথমে সেই ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য প্রয়োগ করা হয়েছিল। অতি সম্প্রতি বায়ু হ্রাস ও ভূমিদূষণ পরিবেশ প্রকৌশলীর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
দূষিত বায়ু বা পানি দ্বারা তীব্র রোগের সংক্রমণ হওয়া উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করেছেন স্যানিটারি ইঞ্জিনিয়াররা। গৃহস্থালির পণ্য থেকে শুরু করে মানুষের তৈরি রাসায়নিকের জটিল মিশ্রণের প্রভাব এবং বিভিন্ন বর্জ্য, ফার্মাসিউটিক্যালস, রাসায়নিক, মানুষের পরিবেশগত স্বাস্থ্য এবং নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলছে। তথ্যের অভাব তৈরি করছে উদীয়মান কিছু নতুন উপকরণ এবং দূষণ, যেমন ন্যানো পার্টিকেল। এই সমস্যাগুলো তীব্র হওয়ার আগেই বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা ব্যাপারগুলো বুঝতে চাইছেন যেখানে, পরিবেশ, শহর ও শিল্প ইন্টারঅ্যাকটিং সিস্টেম হিসেবে (অর্থাৎ, আন্তঃসংযুক্ত ইকোসিস্টেম হিসেবে, সামাজিক ব্যবস্থা এবং শিল্পব্যবস্থা) কিছু করার, যাতে আমরা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি এড়াতে পারি। আধুনিক পরিবেশের পেছনে একটি প্রধান চালিকাশক্তি প্রকৌশল।
লেখক : শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ