খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তায় করণীয়

প্রযুক্তি মানুষের গবেষণালব্ধ ফল, যার নিখাদ স্পর্শে মানুষের নিত্যনৈমিত্তিক জীবন সহজবোধ্য হয়ে উঠছে ক্রমশ। বিজ্ঞানের আশীর্বাদ পুষ্টিপ্রযুক্তি আরব্য উপন্যাসে বর্ণিত আলাদিনের চেরাগের জিনের ন্যায় মানুষের জীবনের নানা সমস্যা সমাধানের দূত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মানুষের জীবনধারণের জন্য অন্যতম মৌলিক চাহিদা খাদ্য। খাদ্যনিরাপত্তা বলতে সবার জন্য অবাধ খাদ্যসরবরাহ এবং সারা বছর খাদ্যের পর্যাপ্ত প্রাপ্যতা নিশ্চিতকরণ। খাদ্যনিরাপত্তার পাশাপাশি মানুষ তার জৈবিক চাহিদা অনুযায়ী পুষ্টি নিশ্চিতকরণ জরুরি। খাদ্যনিরাপত্তার মতো এত গুরুত্বপূর্ণ একটি সেক্টরও প্রযুক্তির ছায়াতলে প্রবেশ করেছে।

জনসংখ্যার দিক থেকে সারা বিশ্বে আমাদের দেশের অবস্থান অষ্টম; যা জনসংখ্যার ঊর্ধ্বগতির নির্দেশক। দিনের পালাবদলে ক্রমশ জনসংখ্যা বাড়ছে; কিন্তু সে তুলনায় আবাদি ভূমির পরিমাণ বাড়ছে না বরং সময়ের পরিক্রমায় নগরায়ণের প্রভাবে আবাদি জমির পরিমাণ প্রতি বছর ১ দশমিক ২ শতাংশ হারে হ্রাস পাচ্ছে। এমন সংকট পরিস্থিতিতে, আমাদের উত্তরণের একমাত্র অবলম্বন খাদ্যনিরাপত্তায় প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা।

আমাদের খাদ্যের চাহিদা পূরণ করতে হলে জীবপ্রযুক্তির (বায়োটেকনোলজি) অপার সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হবে। খাদ্যে জীবপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে; এর ফলে পুষ্টিমান ঠিক রেখে বেশি খাদ্য উত্পাদন সম্ভব। কৃষিবিজ্ঞানীদের অনুমেয় ধারণা, শুধু জৈবপ্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহারে অতিরিক্ত ৩ কোটি মেট্রিক টন খাদ্য উত্পাদন সম্ভব। জীবপ্রযুক্তির ব্যবহারে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট অনন্য অবদান রেখে চলছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট এ পর্যন্ত ১০৮টি (১০১টি ইনব্রিড ও সাতটি হাইব্রিড) উচ্চ ফলনশীল আধুনিক ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। উদ্ভাবনের দিক থেকে সবচেয়ে বড় সফলতা আসে ১৯৯৪ সালে ধানের উচ্চ ফলনশীল জাত ব্রি-ধান ২৮ ও ব্রি-ধান ২৯ উদ্ভাবনের মাধ্যমে। তাছাড়া ২০১৮ সালে বি আর ৮৮ এবং বি আর ৮৯ জাত উদ্ভাবন করে তারা যার জীবনকাল হবে বপন করা থেকে ধান কাটা পর্যন্ত ১৪৩ দিন এবং এর ফলন প্রতি হেক্টরে সাত টন হবে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ২০১৩ সালে জীবপ্রযুক্তি প্রয়োগের দ্বারা উদ্ভাবিত কীটপতঙ্গ প্রতিরোধী বিটি বেগুনের চাষ শুরু করেছে।

জৈবপ্রযুক্তির কিছু মূল্যবান ক্ষেত্র হলো বিভিন্ন ধরনের কম্পোস্ট সার। যেমন : কেঁচো সার, ট্রাইকো কম্পোস্ট, ভারমি কম্পোস্ট ইত্যাদি। সাধারণত গ্রামাঞ্চলে প্রতিটি বাড়িতেই প্রচুর পরিমাণে গৃহস্থালি বর্জ্য জমা থাকে। এই বর্জ্যের সঠিক পদ্ধতি ব্যবহার করে আমরা পেতে পারি মূল্যবান জৈবসার। জৈবসারের অন্যতম গুণ হলো তা ফসলের পুষ্টিগুণ নষ্ট করে না। ধানকাটা ও মাড়াইয়ের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার লক্ষণীয়। ধানকাটার যন্ত্র কম্বাইন্ড হারভেস্টরের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যন্ত্র ব্যবহারের ফলে ধান কাটায় কৃষকের খরচ ৪০ শতাংশ কম হবে। খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে খাদ্যসামগ্রীর প্রচুর উৎপাদনের পাশাপাশি তা সংরক্ষণ ও মজুত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সময়ে খাদ্য সংরক্ষণেও প্রযুক্তির ব্যবহার দৃশ্যমান।

রেফ্রিজারেশন বা হিমায়িতকরণের মাধ্যমে খাদ্যদ্রব্য সংরক্ষণ করা আমাদের দেশে বহুল প্রচলিত পদ্ধতি, যেখানে প্রযুক্তির ব্যবহার লক্ষ করা যায়। তাছাড়া পরমাণু গবেষণা কেন্দ্রের সহায়তায় তেজষ্ক্রিয়তার মাধ্যমে খাদ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব। কোবাল্ট-৬০ থেকে নিঃসৃত গামা রশ্মি খাদ্যসামগ্রীর ওপর প্রয়োগ করলে তা ব্যাকটেরিয়া, পরজীবী ও পোকামাকড় মেরে ফেলে। খাদ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে নিরাপদ। এতে খাদ্যসামগ্রীর সতেজতা এবং পুষ্টিগুণ নষ্ট হয় না। আমেরিকা, ব্রিটেন, কানাডা, ফ্রান্সসহ বিশ্বের ৪২টি দেশ ইতিমধ্যেই তেজষ্ক্রিয়তার মাধ্যমে খাদ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থায় ছাড়পত্র দিয়েছে। তাছাড়া, পাস্তুরাইজেশনের মাধ্যমেও খাদ্যের পুষ্টিগুণ রক্ষা করে খাদ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব; যেখানে মূলত তাপমাত্রার প্রয়োগে খাদ্যে অবস্থিত ইনঅ্যাকটিব প্রোটিন, এনজাইম ধ্বংস করা হয়। খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তায় আমাদের দেশে এ ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার এখনো অপ্রতুল; কিন্তু অতিসত্বর শুরু হবে এবং খাদ্যনিরাপত্তায় যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে, এটাই প্রত্যাশা।

লেখক : শিক্ষার্থী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ