বাংলাদেশের অর্থনীতি ও স্ট্যাগফ্লেশন

বিগত কয়েক মাস ধরে দেশি-বিদেশি অর্থনীতিবিদের আলোচনায় ‘স্ট্যাগফ্লেশন (Stagflation)’ শব্দটির সরব উপস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে।  স্ট্যাগফ্লেশনকে বাংলায় নিশ্চলতা-স্ফীতি বলা হয়। ১৯৬৫ সালে যুক্তরাজ্যের চলমান অর্থনৈতিক অবস্থা বোঝানোর জন্য ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ ইয়ান ম্যাক্লিওড প্রথম বারের মতো ব্যবহার করেন স্ট্যাগফ্লেশন শব্দটি। পরে সত্তরের দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অব্যাহত অর্থনৈতিক স্থবিরতার সময় এটা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।

স্ট্যাগফ্লেশন বলতে অর্থনীতির এমন একটি মিশ্র পরিস্থিতিকে বোঝায়, যা উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং উচ্চ বেকারত্বের সঙ্গে স্থবির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে একত্রিত করে। মুদ্রাস্ফীতির হার বেশি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার কম এবং বেকারত্বের হার বেশি এমন সময়কাল নির্ধারণের জন্য সাধারণত স্ট্যাগফ্লেশন শব্দটি ব্যবহার করা হয়। এটি এক অদ্ভুত উভয়-সংকটের পরিস্থিতি। কোনো দেশের অর্থনীতিতে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তা থেকে বের হয়ে আসতে সরকারকে বেশ বেগ পেতে হয়। কারণ মুদ্রাস্ফীতি কমানোর জন্য নেওয়া প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো উচ্চ বেকারত্বকে উসকে দেয়। অন্যদিকে বেকারত্ব কমানোর জন্য নেওয়া বেশির ভাগ পদক্ষেপগুলো মুদ্রাস্ফীতি আরো প্ররোচিত করে।

স্টাগফ্লেশনের কারণ হিসেবে অর্থনীতিবিদরা বেশ কিছু কারণ উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বহুল ব্যবহৃত পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি, কর হার বৃদ্ধি, অবকাঠামোর ত্রুটি, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অর্থনীতিতে বিভিন্ন ধরনের আঘাত; যেমন :প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি এবং কোনো বিশেষ সম্পদের জোগান একচেটিয়া প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নিয়ন্ত্রণের ফলে স্ট্যাগফ্লেশন সৃষ্টি হয়।

১৯৭০-এর দশকে সৃষ্ট স্টাগফ্লেশনে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো পালটা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল তেলকেই। অরগানাইজেশন অব পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ (ওপেক) তেলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর বেশির ভাগ পশ্চিমা দেশে রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। যার ফলে বিশ্ব জুড়ে তেলের দাম এক লাফে চার গুণ বৃদ্ধি পায় এবং দেখা দেয় অস্বাভাবিক তেল সংকট। কোনো কোনো দেশে তেলের দাম চার শত গুণেরও বেশি বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত যার প্রভাব পড়ে তখনকার সামগ্রিক অর্থনীতিতে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সে সময় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো সংকোচন নীতি গ্রহণ করে। যার ফলে বিশ্ব জুড়ে বেকারত্বের হার অস্বাভাবিক হারে বাড়তে থাকে। সেই সময়ের অর্থনৈতিক স্ট্যাগফ্লেশন সৃষ্টির একটি প্রধান কারণ হিসাবে বিবেচিত হয় একচেটিয়া প্রতিষ্ঠান কর্তৃক তেল নিয়ন্ত্রণ।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আর্থিক সংবাদ মাধ্যম ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’সহ বেশ কিছু দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম জানিয়েছে যে, চলমান অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ১৯৭০-এর দশকের স্ট্যাগফ্লেশনের পুনরাবৃতি হতে পারে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ধারণা করা যাচ্ছে যে, ইউরোপের অর্থনীতি ইতিমধ্যে ধীরে ধীরে স্ট্যাগফ্লেশনের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

কিছুদিন আগে বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত একটি বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, করোনা মহামারি এবং ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি মন্থর করে দিবে, যা উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবকে দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে। ইতিমধ্যে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ পাকিস্তানের অর্থনীতি স্ট্যাগফ্লেশনের চক্রে। তবে আমাদের অর্থনীতির চাকাও কি স্ট্যাগফ্লেশনের দিকে যাচ্ছে ? বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের এখনই ভাবা দরকার!

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল বিশ্বে স্ট্যাগফ্লেশনের প্রধান কারণগুলোর একটি হচ্ছে উচ্চমূল্যস্ফীতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, ২০২২ সালের জুলাই মাসে মুদ্রাস্ফীতির হার ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ বলে হিসাবকৃত হয়েছে। গত বছর জুলাইয়ে তা ছিল ৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য মতে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে খাদ্যদ্রব্যের ওপর ৬ দশমিক ২২ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতি হয়েছে, যা জানুয়ারিতে ছিল ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। এতে দেখা যায়, এক মাসে খাদ্য মুদ্রাস্ফীতির হার ৬২ বেসিস পয়েন্ট বেড়েছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর প্রকাশিত তথ্য মতে, শহরাঞ্চলে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ১২ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলে এই হার ১২ দশমিক ১০ শতাংশ।

এমতাবস্থায় চলতি বছরের জুন মাসে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি এবং আগস্ট মাসে রাতারাতি জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির এ সিদ্ধান্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন খাতে খরচ বৃদ্ধির মাধ্যমে সার্বিকভাবে মূল্যস্ফীতিকে আরো উসকে দিয়েছে। এছাড়াও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে তরলীকৃত গ্যাস বা এলএনজির আমদানি পর্যাপ্ত না থাকায়, গ্যাসভিত্তিক এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুতের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত জোগান না দিতে পারায় আমাদের শিল্প খাতে প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের অভাবে স্বাভাবিক উৎপাদন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে রপ্তানি বাণিজ্যে। যার ফলে ফের করোনা পরিস্থিতির মতো রপ্তানিকরণ প্রতিষ্ঠানগুলো সংকোচন নীতি অবলম্বন করতে পারে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। এছাড়া জ্বালানি তেলের সঙ্গে সম্পৃক্ত সব কিছুর এই দাম, পণ্য-উৎপাদন ও পণ্য-পরিবহন খরচকেও আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। অস্বাভাবিক হারে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং সম্প্রতি ইউরিয়া সারের মূল্য কেজিপ্রতি প্রায় ছয় টাকা বৃদ্ধি আমাদের কৃষি খাতকে প্রভাবিত করেছে। এই খাতগুলো আমাদের জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার পাশাপাশি দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে থাকে।

বাজারে গত কয়েক মাস ধরে চাল, ডাল ও ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যেভাবে বাড়ছে তাতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের ভোক্তারা বাড়তি খরচ সামাল দিতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। দেশে বছরে ভোজ্যতেলের চাহিদা প্রায় ২০ লাখ টন। বাজারে নানাবিধ ভোজ্যতেল, যেমন—সয়াবিন, সরিষা, পাম, সূর্যমুখী, রাইস ব্র্যান তেল পাওয়া গেলেও সবচেয়ে জনপ্রিয় সয়াবিন তেল। কারণ এটি দামে সাশ্রয়ী ছিল এবং সহজলভ্য। কিন্তু এখন প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৭৮ থেকে ১৮৫ টাকা, যা গত বছর ছিল ৮৫ থেকে ১০০ টাকা। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার পাশাপাশি নানা ধরনের টয়লেট্রিজ সামগ্রীর দামও ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

সম্প্রতি সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর এক সংবাদ সম্মেলনে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা পরামর্শ দেন যে, মহামারির ধাক্কা থেকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার অব্যাহত রাখতে সহায়তা করার জন্য সরকারকে কৌশলী ভূমিকায় বিষয়টি মোকাবিলা করতে হবে। অন্যথায় স্ট্যাগফ্লেশনের ঝুঁকি বাড়বে। সুতরাং অর্থনীতিতে স্ট্যাগফ্লেশনের নিয়ামকগুলোর অতি দ্রুত লাগাম টেনে ধরাই হবে আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য। 

 লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়