দেশে দেশে সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন, কোভিড মাহমারির কারণে জ্বালানি, খাদ্য এবং সারের মূল্যস্ফীতির মতো বিষয়গুলো বিশ্বব্যাপী ক্ষুধা নিবারণ কার্যক্রমকে অনেকাংশেই বাধাগ্রস্ত করেছে। এফএও, আইএমএফ, ডব্লিউএফপিসহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো একাধিক সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, নানামুখী অস্থিতিশীল পরিস্থিতি আগামীর দিনে বিশ্বব্যাপী খাদ্যের সংকটকে প্রকট করে তুলবে। বাড়বে খাদ্যনিরাপত্তাহীন মানুষের সংখ্যা। বাংলাদেশও যে এই সতর্কবার্তার আওতাভুক্ত তা বোঝা যায় সম্প্রতি প্রকাশিত বৈশ্বিক খাদ্য সূচক-২০২২-এর দিকে তাকালে। যেখানে ১২১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৪তম। ২০২১ সালের সূচকের তুলনায় তালিকায় আট ধাপ পিছিয়েছে আমাদের দেশ। এছাড়া আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইএফপিআরআই) বলছে, ২০৩০ সালে বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি ১৩ লাখ মানুষ ক্ষুধার ঝুঁকিতে থাকবে।
এই অবস্থায় প্রথমেই প্রয়োজন আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের খাদ্যোত্পাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে নজর দেওয়া। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ উর্বরভূমির দেশ। আমাদের মাটি কৃষি কাজের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এছাড়া আমাদের বৃহত্সংখ্যক কৃষিসংশ্লিষ্ট জনবল রয়েছে। যদিও আবাদি জমির পরিমাণ বর্তমানে কমছে। তবে দোফসলি এবং তিনফসলি জমি বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে উৎপাদন ব্যবস্থায় আমরা বেশি এগিয়ে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, গত চার দশকে প্রধান চারটি খাদ্যশস্যের হেক্টরপ্রতি ফলন বেড়েছে। ১৯৭০-৭১ অর্থবছরের সঙ্গে তুলনা করলে আউশের হেক্টরপ্রতি ফলন বেড়েছে তিন গুণ। আমন ও বোরো ধানের হেক্টরপ্রতি ফলন বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি এবং গমে তা বেড়েছে চার গুণ। পাশাপাশি আমরা যদি আবাদি জমির পরিমাণ বাড়াতে পারি এবং প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে অনাবাদি জমিকে আবাদি জমিতে পরিণত করতে পারি, তাহলে উৎপাদন ব্যবস্থায় আমরা আরো শক্তিশালী অবস্থান নিশ্চিত করতে পারব। এক্ষেত্রে আবাদি জমি ধ্বংস করে বাসগৃহ কিংবা শিল্পপ্রতিষ্ঠান নির্মাণে জনগণকে নিরুত্সাহিত করতে হবে।
ব্যক্তিপর্যায়ে ক্ষুদ্র উৎপাদন ব্যবস্থায় জোর দিতে হবে। বর্তমানে ছাদ কিংবা বারান্দা কৃষির জনপ্রিয়তা বেড়েছে। শহর কিংবা মফস্বলে যেখানে আবাদি জমির পরিমাণ কম এবং যারা অকৃষিজ পেশায় নিয়োজিত তারাও নিজেদের এক টুকরো ছাদ কিংবা খোলা বারান্দাকে রূপান্তরিত করতে পারে এক টুকরো সবজি বাগানে। ছাদে পানির জলাধারে করতে পারে মাছের চাষ। খুব সামান্য উৎপাদনেও দুই অথবা তিন জনের পরিবারের খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করতে পারে ছাদকৃষি। শুধু উৎপাদনই খাদ্যসংকট মোকাবিলার মূল কথা নয়। পর্যাপ্ত উৎপাদনের পাশাপাশি খাদ্যের সুষম বণ্টনও জরুরি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যেহেতু সম্পদের সুষম বণ্টন খুব একটা লক্ষ করা যায় না। তাই খাদ্যের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা একটি বৃহৎ চ্যালেঞ্জ। এক্ষেত্রে ব্যক্তিস্বার্থ পরিহার করে জাতীয় স্বার্থকে বড় করে দেখাটা জরুরি এবং তার জন্য প্রয়োজন ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা।
খাদ্যের অপচয় খাদ্যের সংকট সৃষ্টিতে অন্যতম ভূমিকা পালন করে। বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর যে খাদ্যের অপচয় হয় তা উৎপাদন করতে বিশ্বের মোট কৃষি জমির ২৮ শতাংশ ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়ে। ইউএন এনভাইরনমেন্ট প্রোগ্রামের ফুড ওয়াস্ট ইনডেক্স ২০২১-এর তথ্য মতে, বাংলাদেশে প্রতি বছর ১০ দশমিক ৬ মিলিয়ন টন খাদ্য অপচয় হয়। শুধু অপচয়ের কারণে চালের উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পরও প্রতি বছর বাংলাদেশকে গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টন চাল আমদানি করতে হয়।
খাদ্য গুদামজাতকরণ এবং বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে খাদ্যের পরিবহনেও বিপুল পরিমাণ খাদ্য নষ্ট হয়। কৃষি বিভাগের তথ্যানুযায়ী, দেশে বছরে ১১ মিলিয়ন টন শাকসবজি ও ফলমূল উৎপাদিত হয়। যার ৪৪ শতাংশ নষ্ট হয় খাবার টেবিলে পৌঁছানোর আগেই। সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে না পারায় অনেক সবজি ও ফল পচে যায়। আবার দুর্বল বাজার ব্যবস্থার কারণে দূরের বাজারে পণ্য পরিবহনেও এই অপচয় বাড়ছে। এই অপচয় রোধে এখনই সচেতন হতে হবে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাদ্যমজুত কিংবা তৈরি করা যাবে না। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নকে কাজে লাগে খাদ্যপরিবহনে নষ্ট হওয়ার হারকেও কমিয়ে আনতে হবে। এ ছাড়া যেসব খাদ্যে আমদানিনির্ভরতা রয়েছে সেগুলোর জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে।
বর্তমান সরকার খাদ্যসংকট মোকাবিলায় বেশ কিছু কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার সাশ্রয়ী হতে এবং উত্পাদনব্যবস্থা বৃদ্ধির জন্য তাগিদ দিচ্ছেন। সুতরাং খাদ্যসংকট নিয়ে ভাবার সময় এখনই এবং সেটা শুরু করতে হবে ব্যক্তি পর্যায় থেকেই।
লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়