আলোক দূষণ বন্ধে সচেতন হই

এই শিরোনাম দেখে কি অবাক হচ্ছেন? ভাবছেন আলোক দূষণ নামে আবার কোনো দূষণ আছে নাকি? স্বাভাবিকভাবে আমরা পরিবেশদূষণ, মাটি, পানি, বায়ু, শব্দ ইত্যাদি দূষণের কথা সবাই জানি। তবে আলোক দূষণ সম্পর্কে খুব একটা কথা হয় না। কিন্তু এটি আমাদের সমাজ এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

প্রথমে জানার চেষ্টা করি আলোক দূষণ আসলে কী? আলোক দূষণ হলো অবাঞ্ছিত, অনুপযুক্ত বা অতিরিক্ত কৃত্রিম আলোর উপস্থিতি। বর্ণনামূলক অর্থে আলোক দূষণ বলতে দিনে বা রাতে যে কোনো সময়ে পরিবেশে অত্যধিক মাত্রার দৃশ্যমান আলোর উপস্থিতিকে বোঝায়। অর্থাৎ দিনে বা রাতে অতিরিক্ত কৃত্রিম আলো যা জীববৈচিত্র্যে প্রভাব ফেলছে তাকেই আমরা আলোক দূষণ বলতে পারি। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, আলোক দূষণ কীভাবে জীববৈচিত্র্যে প্রভাব ফেলতে পারে। সিডনির অপেরা হাউজের ওপরে আকাশের মধ্যে প্রায়শই একটি ঘটনা লক্ষ করা যায়। রাতের বেলায় অপেরা হাউজের কৃত্রিম উজ্জ্বল আলোতে প্রলুব্ধ হয়ে কিছু পাখিকে এদিক-সেদিক উড়তে দেখা যায়। যারা মূলত পথভ্রষ্ট পাখি। উজ্জ্বল আলোতে দিগ্ভ্রান্ত হয়ে এরা নিজেদের বাসার রাস্তা হারিয়ে ফেলে। ফলে নির্দিষ্ট দিক খুঁজে পাবার জন্য এদিক-সেদিক বিভ্রান্ত হয়ে উড়তে থাকে। একটানা দিগ্ভ্রান্ত হয়ে উড়ার দরুন এরা প্রচণ্ড ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ক্লান্ত দেহ তাই আছড়ে পড়ে আশপাশের কোনো বিল্ডিংয়ের গায়ে। ফলাফল মৃত্যু। অধিকাংশ সময়ই এমন ভুলের প্রায়শ্চিত্ত তাদের জীবন দিয়ে করতে হয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি বছর সিডনির এই অপেরা হাউজের উজ্জ্বল আলোতে বিভ্রান্ত হয়ে হাজার হাজার পাখি মৃত্যুবরণ করে। তবে এমন ঘটনা শুধু যে এখানেই ঘটে তা কিন্তু মোটেও নয়। আবার শুধু যে পাখির ক্ষেত্রেই এমন ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয় তাও কিন্তু নয়। পৃথিবীর প্রতিটা প্রান্তে আলোক দূষণের অহরহ এমন ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। যার ভুক্তভোগী হচ্ছে পরিবেশের প্রতিটি উপাদান।

আসুন আলোক দূষণ ব্যাপারটা আর একটা ঘটনার মাধ্যমে জানার চেষ্টা করি। ধরুন, আপনার বাগানে আপনি বিভিন্ন ধরনের গাছ লাগিয়েছেন। আপনি দেখবেন যে আপনার বাগানে হরেক রকমের পাখি বাসা বেঁধেছে। কপাল ভালো হলে কাঠবিড়ালীর মতো দু-একটা বন্যপ্রাণীর দেখাও পেয়ে যেতে পারেন। নিজের অজান্তেই আপনি তাদের জন্য একটি বাস্তুসংস্থান তৈরি করে ফেলেছেন। সাধারণভাবে একটু বিজ্ঞানের জ্ঞান যাদের আছে তারা ভালো করেই জানেন যে, উদ্ভিদের যেমন দিনে সূর্যের আলোর প্রয়োজন আছে, তেমনি রাতের আঁধারের দরকারও আছে। সালোক সংশ্লেষণের অন্ধকার পর্যায়, শ্বসন সহন উদ্ভিদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ রাতের বেলা ঘটে থাকে। নির্দিষ্ট করে বললে অন্ধকারে। এবার আপনি আপনার বাগানটিকে আরো বেশি আকর্ষণীয় করার জন্য বাগানে ব্যাপক আলোকসজ্জা করলেন। সারা রাত বাগানের শোভা বর্ধনের জন্য এই আলোকসজ্জাগুলো জ্বালিয়ে রাখেন। এই কাজের মধ্য দিয়ে একদিকে উদ্ভিদের জীবন চক্রে বাধা দিচ্ছেন অন্যদিকে বাগানে বাসা বাঁধা পাখিরা রাতে আলো দেখে রাতকেও দিন মনে করবে। যা তাদের জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আবার যারা নিশাচর প্রাণী, তারা রাতের বেলায় কৃত্রিম আলোয় শিকার করতে বের হয়। রাতে কৃত্রিম আলোর ফলে তারা শিকার করতে পারবে না। এক পর্যায়ে তারা বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

২০১৬ সালের ওয়ার্ল্ড অ্যাটলাস অব আর্টিফেসিয়াল নাইটের স্কাই ব্রাইটনেসের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের জনসংখ্যার ৮৩ শতাংশ এরকম আলো দূষিত আকাশের নিচে বাস করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের ৯৯ শতাংশ মানুষ প্রাকৃতিক রাত উপভোগ করতে পারে না। অধ্যাপক গ্যাস্টন বলছেন, ‘আলো যেখানে প্রয়োজন সেখানেই ব্যবহার করা উচিত, অপ্রয়োজনীয় আলোই ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।’ সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের সমাজের সব স্তরেই আলোক দূষণ একটি নব্য সমস্যা হিসেবে উপনীত হয়েছে। আলো দূষণের ফলে যেই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে তার জন্য আমাদের যথেষ্ট সচেতন হওয়া প্রয়োজন। রাতে নিজের বাড়ি থেকে আলো কমানো শুরু করতে হবে। বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক পর্যালোচনা বিশ্বব্যাপী আলো দূষণ কমাতে পাঁচটি মূল কৌশল ব্যবহার করার কথা বলছে। তা হলো—পূর্ববর্তী অন্ধকার অঞ্চলে আলোর ভূমিকা এড়ানো, আলো সর্বনিম্ন ব্যবহারযোগ্য তীব্রতায় ব্যবহার করা, আলো কেবল যেখানে প্রয়োজন সেখানেই শুধু ব্যবহার করা, প্রয়োজনের সময় কেবল আলো ব্যবহার করা, তীব্র সাদা বর্ণালির পরিবর্তে কমলা রঙের আলো বেশি ব্যবহার করা।

আমাদের পরিবার এবং বন্ধুদের এই কাজ করতে উত্সাহিত করতে হবে। আধুনিকতার নামে যত্রতত্র প্রয়োজনে রাতের বেলা আলো জ্বালিয়ে রাখা আলোক দূষণের বড় একটি মাধ্যম। আমরা হয়তো পুরো পৃথিবীর আলোক দূষণ কমাতে বা বন্ধ করতে পারব না। কিন্তু আমার দ্বারা অন্তত আর কখনো যেন আলোক দূষণ না হয় সেটি কিন্তু নিশ্চিত করা সম্ভব। আমাদের প্রত্যেকের সচেতনতায় দূষণ মুক্ত হোক এই পৃথিবী, এমনটাই প্রত্যাশা করছি।

লেখক : শিক্ষার্থী, সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া