মেধা একটি মূল্যবান সম্পদ। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে মেধাবী মানুষকে মানবসম্পদে রূপান্তরিত করা একটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। যে সমাজে বা রাষ্ট্রে মেধাবীদের সংখ্যা যতো বেশী, সেই সমাজ বা রাষ্ট্র তাদের মেধাশক্তি নানাভাবে প্রয়োগ করার মাধ্যমে উন্নয়নের পথে কয়েক ধাপ এগিয়ে যেতে পারে। এই মেধাশক্তির প্রয়োগ এককভাবে কিংবা সামষ্টিকভাবে হতে পারে। বাঙালি জাতিগতভাবে মেধাবী হলেও অনেকাংশ ক্ষেত্রে মেধার যথাযথ চর্চা ও মেধাবিকাশের বিষয়টিকে অবমূল্যায়ন করা হয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা, আভ্যন্তরীণ কোন্দল, স্বজনপ্রীতি ও মোটা অংকের ঘুষ বাণিজ্যের কারণে প্রকৃত মেধাবীরা বঞ্চিত হচ্ছে নানাভাবে। দেশে উচ্চশিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রেও মেধার যথার্থ মূল্যায়নে দৈন্যতা প্রকাশ পেয়েছে। সম্প্রতি দেশের প্রথম সারির একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় একাধিক শিফটে নেয়া হয়েছে। এই পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেয়ার ফলে মেধার অবমূল্যায়ন হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন অনেক শিক্ষার্থী।
আর যদি সামগ্রিকভাবে শিক্ষা ক্ষেত্রের কথা চিন্তা করা হয় তাহলে এক্ষেত্রে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির ত্রুটি ফুটে ওঠে। একবিংশ শতাব্দীতে পৃথিবীর সব দেশ যখন শিক্ষাকে উন্নয়নের সিঁড়ি হিসেবে বিবেচনা করছে তখন এই ক্ষেত্রটি মেধাবীদের কাছে ক্রমান্বয়ে আকর্ষণহীন হচ্ছে। বিসিএস-এর মতো জায়গায় শিক্ষা ক্যাডারকে অপছন্দের তালিকায় ঠেলে দেয়া হয়েছে পেশাগত বৈষম্য তৈরি করার মাধ্যমে। সরকারি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও সমুদয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকরির ক্ষেত্রে দলীয় বিবেচনা গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্রমান্বয়ে বিভাগ বাড়ছে তবে সেই আলোকে শিক্ষক নিয়োগ ও অন্যান্য বিচিত্রতা আনতে সক্ষম হয় নি। এটা উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয় যে, অনেক শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষাজীবন সফলভাবে সমাপ্ত করার পর বারবার চেষ্টা করেও যখন চাকরি পেতে ব্যর্থ হয় তখন দেশ ত্যাগ করে। এমনিভাবে নানাদিক থেকে মেধাবীরা অবমূল্যায়িত হওয়ার কারণে মেধা পাচার হয়ে যাচ্ছে সেইসব দেশে যারা মেধার যথার্থ মূল্যায়ন করে। আর ইদানিং বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা ক্রমশই বাড়ছে।
সিংহভাগ শিক্ষার্থীদের গন্তব্য কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্ক, চীন, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, মিশর, তুরস্ক, সৌদি আরবসহ অন্যান্য শিল্পোন্নত দেশ। বিগত কয়েক বছর আগে বাংলাদেশে একটি জরিপ ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। উক্ত সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল ১৫-২৯ বছর বয়সী জনসংখ্যার ৮২ শতাংশই বিদেশে পাড়ি জমাতে পছন্দ করে। ইউনেস্কোর Global Flow of Tertiary-Level Students-এর একটি পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে, ২০১৭ সালে বাংলাদেশ থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য প্রায় ১ লক্ষ শিক্ষার্থী বিদেশ গমন করেছে। সম্প্রতি বছরগুলোতে এটা কয়েকগুণে বেড়েছে। The open doors report on educational exchange-এর রিপোর্ট বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে ৮ হাজার ৫৯৮ জন বাংলাদেশী শিক্ষার্থীকে স্টাডি পারমিট দিয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বৃত্তি পাওয়া বাংলাদেশীদের সংখ্যা দ্বিগুণ হবে।
জরিপ মতে, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল শিক্ষার্থীদের বিদেশ গমনের হার তুলনামূলক বেশী। সৃজনশীল গবেষণা খাতে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ না থাকার কারণে দেশের মেধাবীদের সুনিপুণ উদ্ভাবনী ক্ষমতা থাকলেও উদ্ভাবনের সুযোগ পাচ্ছেন না। মেধা অনুসারে যাথার্থ্য পারিশ্রমিক না পাওয়া এবং চাকরির ক্ষেত্রে দক্ষতার চেয়ে আনুষাঙ্গিক বিষয়াদি গুরুত্ব পাওয়ার কারণে মেধাবীরা বিদেশের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। আর এভাবেই ক্রমাগতভাবে বেড়ে চলছে অনিবার্য মেধা পাচার। বিদেশ গমন করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে আসতে চায় দেশে এসে তাদের নানারকম জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়। সম্মানজনক ডিগ্রি অর্জন করে দেশে ফিরে এলেও, সেই আলোকে তাদের জন্য সেক্টর ভিত্তিক কর্মক্ষেত্রে নেই। এক্ষেত্রে তাদের চরম বিড়ম্বনার মুখোমুখি হতে হয়। আর ওইসব দেশগুলোতে জীবন যাত্রার মান উন্নত এবং ভালো বেতনের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রণোদনা প্রদান করে থাকে। তাই বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষ করে সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। বিদেশে অবস্থানরত এসব অভিবাসীরা প্রচুর রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। আপাতদৃষ্টিতে এই ভূমিকা ইতিবাচক হলেও, তাদের শূন্যতার কারণে একটা পর্যায়ে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের অগ্রযাত্রার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়।
মেধা পাচারের প্রভাব বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এ কথা বলাই বাহুল্য। উন্নতির অগ্রযাত্রায় এগিয়ে যাওয়া একটি দেশ এর ফলে সক্ষমতা হারাতে বসবে—এটাই স্বাভাবকি। সুতরাং দেশের অগ্রগতির জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে মেধাবীদের মেধার যথাযথ মূল্যায়ন না করা। বিশ্বের সকল উন্নত দেশ তাদের মেধাবী জনশক্তিকে কাজে লাগানোর মাধ্যমেই উন্নতির উচ্চ শিখরে পৌছাতে সক্ষম হয়েছে। মেধা পাচার রোধ করা শিল্পোন্নত দেশগুলোর সকল পরিকল্পনার শীর্ষ থাকে। কাজেই আমাদেরও সে পথে হাঁটতে হবে।
বাংলাদেশের উন্নয়নের গতি সচল রাখতে হলে মেধার যথাযথ মূল্যায়ন করার মাধ্যমে মেধা পাচার রোধ করতে হবে। আর এই মেধা পাচার বন্ধের জন্য দেশের সকল সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃপক্ষকে কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করে তা অতি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। দেশের সকল নাগরিককেও বিশেষভাবে সচেতন হওয়া জরুরী। নীতিনির্ধারকসহ সকলকেই মেধাবীদের মেধার সঠিক মূল্যায়ন করতে হবে। কার্যকরী মূল্যায়নের মাধ্যমে মেধাবীদের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলে দেশ ও জাতির কল্যাণে নিয়োজিত করতে হবে। এর সুদূরপ্রসারী ফল হিসেবে বাংলাদেশ আরো বেশি সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠবে। সুতরাং,‘ নো ট্যালেন্ট ট্রাফিকিং’।
লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়