এসডিজি অর্জনের লক্ষ্য অর্জিত হচ্ছে তো?

এসডিজি বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা মূলত এমডিজি বা সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার পরিপূরক। ২০১৫ সাল পর্যন্ত এমডিজির উদ্দেশ্য ছিল ক্ষুধা ও অভাবমুক্ত সমাজ গড়ার লক্ষ্যে অন্তত অর্ধেক পথ আগানো। আর এসডিজির লক্ষ্য হলো কাজটি সম্পূর্ণ শেষ করা, অর্থাৎ ২০৩০ সাল নাগাদ কোনো ক্ষুধা বা খাদ্যাভাব থাকবে না। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যকে ‘শূন্য’ তথা সহনশীল পর্যায়ে আনার জন্য শতভাগ মনোযোগ, শতভাগ অংশগ্রহণ এবং শতভাগ ক্ষমতায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তবে বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যায় এসডিজি অর্জনের ১৭টি শর্তের প্রথম শর্ত দুটিই অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে না। অত্যধিক মুদ্রাস্ফীতি এবং দ্রব্যমূল্যের ক্রমবর্ধমান ঊর্ধ্বগতিতে নাভিশ্বাস অবস্থা দেশের জনগণের।

এসডিজির ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা হলো—দারিদ্র্যবিমোচন, ক্ষুধামুক্তি, সুস্বাস্থ্য, মানসম্মত শিক্ষা, জেন্ডার সমতা, বিশুদ্ধ পানি ও পয়োনিষ্কাশন, ব্যয়সাধ্য ও টেকসই জ্বালানি, সবার জন্য ভালো কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন ও উন্নত অবকাঠামো, বৈষম্য হ্রাসকরণ, টেকসই শহর ও সম্পদের দায়িত্বশীল ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধ, সমুদ্রের সুরক্ষা, ভূমির সুরক্ষা, শান্তি ও ন্যায়বিচার, লক্ষ্য অর্জনের জন্য অংশীদারিত্ব। এই ১৭টি লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন করার জন্য বিশ্বের প্রায় সব দেশ একমত হয়েছে। তবে ১৭টি লক্ষ্যের প্রথম দুটি অর্জন করাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে ব্যাহত হচ্ছে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অগ্রযাত্রা। 

দেশে দারিদ্র্যের সঠিক হার এখনো ধোঁয়াশার মধ্যে। সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশ আইপিসি ক্রনিক ফুড ইনসিকিউরিটি রিপোর্ট ২০০৯-১৯ সময়কালের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রণীত। এতে করোনা মহামারি-পরবর্তী সময়ের, অর্থাৎ ২০২০ ও ২০২১ সাল শেষে দেশে দারিদ্র্যের হার সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই। দারিদ্র্যের হার নির্ধারণে কাজ করা সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ২০১৬ সালের পর এ সম্পর্কিত কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। সংস্থাটির সর্বশেষ ‘হাউজ হোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে (হায়েস) ২০১৬’-এ জাতীয় পর্যায়ে দারিদ্র্যের হার দেখানো হয়েছে ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ। দেশের কয়েকটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার গবেষণা প্রতিবেদনে দারিদ্র্যের হারে যে ঊর্ধ্বগতি উঠে এসেছে, তা গ্রহণে সরকার অনীহা প্রকাশ করেছে। তাই দেশে দারিদ্র্যের বর্তমান হার নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় দারিদ্র্যের হার এখন সহজেই অনুমেয়।

অন্যদিকে ২০২২ সালে বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ১২১টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৮৪তম। ২০২১, ২০২০, ২০১৯ ও ২০১৮ সালের সূচকে অবস্থান ছিল যথাক্রমে ৭৬, ৭৫, ৮৮ ও ৮৬তম। এর অর্থ দাঁড়ায়, গতবারের তুলনায় এবার তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান আট ধাপ পিছিয়েছে। ১৯ দশমিক ৬ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশ কোনো রকমে ‘মাঝারি ক্ষুধার’ স্তরে অবস্থান ধরে রেখেছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশ পাকিস্তান (৯৯), ভারত (১০৭) ও আফগানিস্তানের (১০৯) চেয়ে বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে। তবে বিশ্বে চলমান সংকটে যে এই অবস্থা আরো প্রকট আকার ধারণ করবে, সেটা সহজেই অনুমান করা যায়। সেই সঙ্গে মুদ্রাস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এই আশঙ্কা আরো বহু গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। 

উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে তাই দেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে এ ব্যাপারে এখনই সচেতন হওয়া জরুরি। কেননা, ১৭টি লক্ষ্যমাত্রার যদি প্রথম দুটিই অর্জন না হয়, তাহলে বাকিগুলো পূর্ণ করা কখনোই সম্ভব নয়। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের এই প্রতিবন্ধকতা দূর করে দেশকে এগিয়ে নিতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।

লেখক :শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়