একটি বড় আকারের গরু আমি ৬ থেকে ৮ মিনিটের মধ্যে কেটে ফেলতে পারি। এ কথাটা অনেকেই বিশ্বাস করতে চায় না। তাই মনে হয় সুযোগ-সুবিধা হলে কারখানায় নিয়ে গিয়ে দেখাই কীভাবে আমি কাজটা করি। স্বপ্না যখন এই কথাগুলো বলছিলেন তখন একটি ‘বোন স’ বা হাড়ের করাত মেশিন দিয়ে আস্ত একটা খাসি অনায়াসে কুচি কুচি করে কেটে চলছিলেন।
স্বপ্না ২০০৬ সালে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে পাবনায় একটি শীর্ষস্থানীয় মাংস উৎপাদনকারী কোম্পানিতে যোগ দেন। সেখানে তিন মাসের ট্রেনিংয়ে তিনি শেখেন কিভাবে বার্গার, হটডগ, সসেস, নাগেটের জন্য মাংস তৈরি করতে হবে। কীভাবে মাংসকে রান্নার জন্য প্রস্তুত করে সংরক্ষণ করতে হয় আর শেখেন আস্ত গরু-খাসি অনায়াসে কেটে ফেলা।
গরু-খাসি কাটার জন্য ‘কসাই’ বললে আমাদের চোখের সামনে তামাটে চেহারার সুঠাম বাহুর লুঙ্গি-গেঞ্জি পরা ঘামে ভেজা যে চিত্র ভেসে উঠে আজকের নারী আধুনিক প্রযুক্তির ওপর ভর করে নিজ সাহসের বলে তা বদলে দিয়েছেন। তারা প্রথা ভেঙে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আধুনিক বিলাস বহুল আউটলেটে সে কাজ করছেন হরহামেশা।
শুরুর গল্পটা জানতে চাইলে স্বপ্না বলেন, বাবা কৃষক ছিলেন, তিন মেয়ের মধ্যে তিনিই বড়। তাই পরীক্ষা শেষে কিছু একটা করে বাবাকে সহায়তা করতে চান। তার এক মামার মাধ্যমেই এই কোম্পানিতে আসেন। উৎপাদন বিভাগে তখন এক সঙ্গে তারা ১১ জন মেয়ে কাজ শেখেন। তাদের প্রধান প্রশিক্ষক ছিলেন অস্ট্রেলিয়া নাগরিক ওয়েন জেসকিল। তিনি তাদের খুবই উত্সাহ দিতেন। ২০১১ সাল পর্যন্ত পাবনায় কারখানাতেই তিনি কাজ করেন। সেখানেই জানাশোনা হয় সরদার মাসনুদ রহমান রুবেলের সঙ্গে। একই কোম্পানিতে কাজ করার ফলে বোঝাপড়াটাও ভালো হয়। পারিবারিকভাবে তাদের বিয়ে হলে ঢাকায় ধানমন্ডির আউটলেটে সিনিয়র সেলস অফিসার হিসেবে যোগ দেন স্বপ্না। বিক্রিসহ দোকান পরিষ্কার করা, মাংস কাটা, মাংস প্রক্রিয়াজাত করা, ক্রেতাদের ভালোমন্দ বোঝানো, কীভাবে পণ্য ভালো থাকবে তা জানানো তার দায়িত্ব ছিল। প্রথম প্রথম এই কাজ করতে কেমন লাগত? প্রথম কোনো ভয় লেগেছে কি না জানতে চাইলে জানান, ভয় ঠিক না অজানা বিষয়টা ভালো করে জানার আগ্রহ ছিল আমার। আর মনে করতাম অন্য একজন পারলে আমিও পারবো। আমরা প্রথাগত যে কসাইদের দেখি, তাদের সঙ্গে আমাদের অনেক পার্থক্য আছে। আমাদের কাজটাও তাদের কাজের চেয়ে অনেক স্বাস্থ্যসম্মতভাবে করতে হয়। পশুকে জবাই থেকে শুরু করে চামড়া আলাদা করা ও কাটা পর্যন্ত সর্বোচ্চ স্বাস্থ্যবিধি মেনে করতে হয়। তারপর শূন্য ডিগ্রি তাপমাত্রা থেকে পাঁচ ডিগ্রি তাপমাত্রায় একটি হিমায়িত ঘরে ১৮-২৪ ঘণ্টা রেখে ব্যাকটেরিয়া মারা হয়। তারপরে আমাদের কাছে আনা হয়। আমরা আধুনিক যন্ত্রের সঙ্গে চাপাতি, চাকু, ছুরি ব্যবহার করে প্রয়োজন মতো প্রস্তুত করি।
স্বপ্না বলেন, আমাকে দেখে অনেকেই এই কাজে উত্সাহিত হয়। এখন আমাদের কোম্পানিতে অনেক মেয়ে কাজ করছে। আমি মনে করি ভালো পরিবেশে ভালো কোম্পানিতে এমন কাজ করে মেয়েরা আত্মনির্ভরশীল হতে পারে।
স্বপ্না এখন একটি আউটলেটের সিনিয়র ইনচার্জ-এর দায়িত্ব পালন করেন। ১০ থেকে ১২ জন পুরুষ কর্মী তার অধীনে কাজ করছেন। কোম্পানি তাদের অনেক সুবিধা দেয়। বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি, যখন যেমন প্রয়োজন হয় তেমন করেই পাশে থাকে।