ক্রিকেট-পাগল বাঙালির প্রত্যাশা

৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই দেশে ক্রিকেট কতটা জনপ্রিয়, সে কথা কে না জানে? শহর থেকে গ্রাম, পাড়া থেকে মহল্লা—সব জায়গাতেই শুধু ক্রিকেট আর ক্রিকেট। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ হলে তো কথাই নেই। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে বাজার-বন্দর, স্টেশন, পথঘাট, বাস, ট্রেনেও ছড়িয়ে যায় ক্রিকেটীয় উন্মাদনা। কোটি দর্শক হৃদয়ের শুধু একটাই চাওয়া, একটাই প্রত্যাশা—বাংলাদেশের জয়। বাংলাদেশের জয় দেখার জন্য নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ নানা কাজ ফেলে রেখে বসে যায় টিভি স্ক্রিনের সামনে। মোট কথা, খেলার আপডেটটা চাই-ই চাই। 

যখন দেশের কোনো স্টেডিয়ামে ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়, তখনো গ্যালারি ভর্তি দর্শকের সমর্থন পান ক্রিকেটাররা। তারা হাসলে দর্শক হাসে। তারা কাঁদলে দর্শক কাঁদে। জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের দেওয়া হয় দেশের প্রথম শ্রেণির নাগরিক সুবিধাও। ক্রিকেট-পাগল এই দেশের ক্রিকেটের দ্রুত উন্নতিই যেন সবার কাম্য। কিন্তু আফসোসের সঙ্গে বলতে হয়, কতটা এগিয়েছে দেশের ক্রিকেট? 

২০১১ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ যখন বিশ্বকাপের আয়োজক হলো, ক্রিকেট বিশ্বে তখনো আফগানিস্তানের নামগন্ধও শোনা যায়নি। কিন্তু সেই আফগানিস্তান এখন ক্রিকেট বিশ্বে বেশ পোক্ত আসন করে নিয়েছে। টেস্ট স্ট্যাটাস প্রাপ্তির পর বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জিততে যেখানে লেগেছিল প্রায় অর্ধযুগ, সেখানে যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান টেস্ট স্ট্যাটাস প্রাপ্তির কিছুদিনের মধ্যেই বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলতে এসে বাংলাদেশকে বড় ব্যবধানে হারায়! ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটেও আফগানদের কাছে বহু বার বেকায়দায় পড়তে হয়েছে আমাদের। 

টেস্ট স্ট্যাটাস প্রাপ্তির ২২ বছরেও আমাদের ক্রিকেটারদের বিদেশি লিগে খেলা যেখানে স্বপ্নের সমান, সেখানে ক্রিকেট বিশ্বে নবাগত আফগান ক্রিকেটাররা আইপিএল, বিগব্যাশসহ বিশ্বের প্রথম সারির লিগগুলোতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। তাছাড়া সদ্য টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়া আয়ারল্যান্ড কিংবা আইসিসির সহযোগী সদস্য নেদারল্যান্ডস, নামিবিয়াদের পারফরম্যান্সও চোখে পড়ার মতো। কিন্তু আমাদের অবস্থা দিনে দিনে কেবল অবনতির দিকেই যাচ্ছে! চলতি বিশ্বকাপে টাইগারদের এবারের আসরের পারফরম্যান্স কতটা খুশি করতে পেরেছে আমাদের দর্শকদের? এক কথায় বলতে গেলে, দেশবাসী যারপরনাই হতাশ!

আমাদের ক্রিকেটারদের ভয়ডরহীন ক্রিকেটের কথা অনেক দিন ধরেই বলা হচ্ছে। খেলায় হারজিত্ থাকবেই। সেটা মেনে নিয়েই তো খেলতে হবে। ঘুরে দাঁড়িয়ে পালটা মার দিতে হবে। কিন্তু খেলার কোনো একটা পর্যায়ে পিছিয়ে পড়ার পর জয়ের জন্য চেষ্টা না করে সম্মানজনক হারের চেষ্টা করার প্রবণতা ক্রিকেট-পাগল বাঙালি জনতার জন্য খুবই বেদনাদায়ক। অথচ আমাদের প্রত্যাশা—বড় দলগুলোর সঙ্গে চোখে চোখ রেখে খেলতে হবে। খেলার কোনো একটি পার্টিকুলার মুহূর্তে মোমেন্টাম হারালেও সেখান থেকে ম্যাচের টার্নিং পয়েন্টকে নিজেদের দিকে আনার চেষ্টাটা অন্তত করতে হবে। 

বর্তমান প্রেক্ষাপটে ক্রিকেটার ও সংগঠকদের কাছে একটা মেসেজ পৌঁছানো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ যে, শুধু মধ্যম সারির দল বা র্যাংকিংয়ে পিছিয়ে থাকা দলগুলোর সঙ্গে জিতে প্রাপ্তির ঢেঁকুর তুললেই হবে না; বরং বড় দলগুলোর সঙ্গে বড় মঞ্চে লড়াই করে জেতার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। দর্শক কখনই বাংলাদেশের ফাইট করে সম্মানজনক হার দেখতে চায় না। দর্শক চায় অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে আকবর আলীর হাত ধরে যেমন বিশ্বকাপ এসেছে, সে রকম বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন ট্রফি উঠবে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের হাতে। এই মন-মানসিকতা নিয়েই ক্রিকেট-সংশ্লিষ্টদের কাজ করতে হবে। ভুলত্রুটি শুধরে নিয়ে অচিরেই বাংলাদেশ ক্রিকেট বিশ্বের পরাশক্তি হিসেবে নাম লেখাবে—সাধারণ ক্রিকেট-পাগল দর্শকের এমনটাই প্রত্যাশা। 

লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ