সংকট মোকাবিলায় কৃষিজমির ব্যবহার

এই মুহূর্তে দেশের যে খাতগুলো ভয়ানক সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে, তার মধ্যে একটি হলো শিল্প খাত। ছোট, মাঝারি ও বড় আকারের শিল্প কারখানাগুলোর অধিকাংশই বন্ধ হয়ে যাওয়ার পথে। তৈরি পোশাক খাত আমাদের দেশীয় অর্থনীতিতে রপ্তানির সবচেয়ে বড় নির্ভরযোগ্য অংশ। ইউরোপের বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমানে এ খাতের অবস্থা বেশ নাজুক। 

করোনা মহামারির প্রভাবে প্রতিটি দেশের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ধসে পড়েছে। পরবর্তী সময়ে ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের প্রভাবে তেল এবং গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ থাকায় প্রচণ্ড খারাপ পরিস্থিতির সম্মুখীন গোটা ইউরোপ। এসবের কারণে স্বাভাবিকভাবেই দেশে দেশে মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়েছে। এর তীব্র প্রভাব পড়ছে উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলোতে। ইতিমধ্যেই তেল, গ্যাস এবং বিদ্যুতের সংকট বাংলাদেশকে ভোগান্তিতে ফেলে দিয়েছে। বিশেষ করে, এর ফলে পোশাক তৈরিতে ব্যবসায়ীদের গুণতে হচ্ছে অতিরিক্ত খরচ। 

বাস্তবিক অর্থে, আমরা এমন একটি পরিস্থিতির সামনে এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে চোখের সামনে আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে থেমে যেতে দেখতে হচ্ছে। শিল্প-কারখানাগুলোতে উৎপাদন কমে গেছে প্রায় ৫০ শতাংশেরও নিচে। এমন সংকট দীর্ঘ হলে আমাদের অর্থনীতি সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে যাবে—এতে কোনো সন্দেহ নেই। শুধু তাই নয়, দেশের গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য খাতগুলোতেও আমাদের পরিস্থিতি আশানুরূপ ভালো নয়। সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে যদিও, কিন্তু তা পর্যাপ্ত নয়।

বলা হচ্ছে, মহামন্দা ধেয়ে আসছে। আসন্ন মন্দায় যেসব দেশের রিজার্ভের পরিমাণ ভালো এবং উচ্চমূল্যে পণ্য ক্রয় করার ক্ষমতা রাখবে, তারা কিছুটা ভালো থাকবে। পাশাপাশি খাদ্য উৎপাদন করার ক্ষমতা পর্যাপ্ত পরিমাণে হলে সেসব দেশও কিছুটা সেইফ জোনে থাকতে পারবে। উচ্চমূল্যে খাদ্যদ্রব্য কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার ক্ষমতা আমাদের মতো আমদানি নির্ভর দেশগুলোর কিঞ্চিৎ কম। অতএব আমাদেরকে দ্বিতীয়টি অর্থাৎ খাদ্য উৎপাদনের দিকেই পা বাড়াতে হবে। 

আমাদের দেশে কৃষি জমির পরিমাণ আগের চেয়ে কমে গেলেও যতটুকু আছে, তা দিয়ে মন্দা মোকাবিলা করা সম্ভব বলে মনে করছেন অনেকে। তবে এক্ষেত্রে পূর্বশর্ত, অবশ্যই তার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু মুশকিল হলো, এক্ষেত্রেও একটি ব্যাপক সমস্যা রয়েছে। কৃষি জমিতে উৎপাদন বাড়াতে হলে কৃষি সরঞ্জাম ও ফসল উৎপাদনে উপাদানসমূহের মূল্য কমিয়ে আনতে হবে। কৃষকের ফসল উৎপাদনের প্রতি অনীহা সৃষ্টি হবার অন্যতম কারণ হলো, বাজারে কৃষকের লাভ তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচই উঠতে চায় না। সকল খরচাপাতি বাদ দিয়ে হিসাব কষলে কৃষককে তার ঘরে চাল তুলতেই হিমশিম খেতে হয়। চূড়ান্ত পর্যায়ের ভোক্তার কাছে যখন খাদ্য কিংবা পণ্য পৌঁছে যায়, তার বৃহৎ লভ্যাংশ যায় তৃতীয় পক্ষ তথা মধ্যস্বত্বভোগীর পকেটে। বাজার ব্যবস্থাপনার এই ঘাটতির ফলে কৃষক উৎপাদন করতে অনীহা দেখান স্বভাবতই। আরো একটি সংকট হলো, কোনো পণ্য আমদানি করার ক্ষেত্রে সরকার সাধারণত যে কোনো একটি দেশের উপরই অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এ প্রবণতা থেকে  বের হতে হবে। 
 
মোটকথা, এই মুহূর্তে আমাদের কৃষি জমিতে উৎপাদন বাড়ানো ছাড়া বড় কোনো বিকল্প পরিস্থিতি নেই। আসছে বছরের মন্দা মোকাবিলা করতে হলে সরকারকে সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে কৃষি এবং কৃষককে স্বাবলম্বী করতে হবে। প্রতি ইঞ্চি মাটি ব্যবহারের আহ্বান আসছে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে। সুতরাং, কৃষি জমির শতভাগ নিশ্চিতের বিষয়টি আমরা যেন ভুলে না যাই।

লেখক : শিক্ষার্থী, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়