জনবল সংকটে রেলওয়ের ৫৪ স্টেশন বন্ধ

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের অধীনে দেশের ১৭৫টি স্টেশন রয়েছে। এর মধ্যে জনবল সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে ৫৪টি স্টেশন। অবশিষ্ট ১২১টি স্টেশন চালু থাকলেও চলছে প্রয়োজনের চেয়ে কম জনবল নিয়ে।
 
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বন্ধ হয়ে যাওয়া ৫৪টি স্টেশনগুলোতে কোনো টিকিট বিক্রি হয় না। ফলে ট্রেনে উঠে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে যাত্রীদের। অন্যদিকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন কর্তব্যরত টিটিইরা। এমন অবস্থায় অনেক যাত্রী বিনা টিকিটে ভ্রমণ করছেন। ফলে প্রতিদিন রেলওয়ে আর্থিকভাবে লোকসান গুনছে। আবার অনেক যাত্রীদের নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত টাকা জরিমানা গুনতে হচ্ছে। এতে করে আর্থিক ক্ষতি এবং হয়রানির শিকার হচ্ছেন অগণিত যাত্রীরা।  

rajshahi4.PNG

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের পাকশী বিভাগীয় কার্যালয় সূত্র জানায়, ১ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৮ সালের জুনে ঈশ্বরদী থেকে ঢালারচর পর্যন্ত নতুন রেলপথ নির্মাণ করা হয়। এই ঈশ্বরদী-ঢালারচর রেলপথে ১০টি স্টেশন স্থাপিত হয়েছে। এরপর ঢালারচর থেকে রাজশাহী পর্যন্ত ‘ঢালারচর এক্সপ্রেস’ ট্রেন চালু করা হয়। কিন্তু স্টেশনগুলোর জন্য রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এখনো স্থায়ী জনবল নিয়োগ করতে পারেনি। তবে সাপ্তাহিক ছুটির দিন বাদে সপ্তাহের ৬দিন সকালে ট্রেনটি ঢালারচর থেকে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে। আবার বিকেলে ঢালারচরের উদ্দেশ্যে রাজশাহী ছেড়ে যায়।

Rajshahi University Railway Station

সূত্র জানায়, নতুন রেলপথ পাবনার ঢালারচর থেকে ঈশ্বরদী পর্যন্ত মোট ১০টি স্টেশন রয়েছে। এসব স্টেশনে যাত্রীরা ওঠানামা করেন। কিন্তু এই ১০টি স্টেশনের মধ্যে ৭টি যথাক্রমে বাঁধেরহাট, কাশিনাথপুর, সাঁথিয়া, রাজাপুর, তাঁতিবন্ধ, দুবলিয়া, রাঘবপুরে রেলওয়ের নিজস্ব কোনো জনবল নেই। দৈনিক মজুরি ভিত্তিক ‘টেম্পোরারি লেবার রিক্রুট (টিআরএল)’ অস্থায়ী জনবলের মাধ্যমে স্টেশনগুলো পরিচালনা শুরু করা হয়।  

rajshahi5

সূত্র মতে, গত ১৭ অক্টোবর এই স্টেশনগুলোর সকল কার্যক্রমের সঙ্গে টিকিট বিক্রিও হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। সপ্তাহজুড়ে বন্ধ থাকে সব কার্যক্রম ও টিকিট বিক্রি। এসব স্টেশনে নিয়োজিত ‘টিআরএল’ জনবল তাদের চাকরি স্থায়ী করার আন্দোলনে ঢাকায় যাওয়ায় স্টেশনগুলো ফাঁকা হয়ে যায়।

rajshahi6

সম্প্রতি আলাপচারিতায় ‘টিআরএল’ কর্মচারী মিথুন জানান, পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের অধীনে পাকশী, লালমনিরহাট ও সৈয়দপুর বিভাগ রয়েছে। এই তিনটি বিভাগে দৈনিক মজুরিভিত্তিক ‘টিআরএল’ জনবল রয়েছে প্রায় ২ হাজার ১০০ জন। তাদের আগামী ৩১ ডিসেম্বর চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। এর মধ্যে নতুন চুক্তি না হলে তাদের চাকরি থাকবে না। কিন্তু কবে তাদের চাকরি স্থায়ী হবে এ বিষয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। তাই তারা চাকরি নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় সময় পার করছেন।

rajshahi8
   
অন্যদিকে বাঁধেরহাট স্টেশন থেকে রাজশাহী আসা যাত্রী রফিকুল ইসলাম জানান, সপ্তাহে তিন দিন তাকে নানা কাজে বাড়ি থেকে রাজশাহীতে আসতে হয়। কিন্তু নিজ এলাকার স্টেশনে সবসময় টিকিট পাওয়া যায় না। ফলে তাদেরকে ট্রেনে ওঠার পর টিটিইকে অনুরোধ করে টিকিট কিনতে হয়। তিনি একা নন, এই বিড়ম্বনা অনেক যাত্রীর। বেশিরভাগ সময় যাত্রীদের অতিরিক্ত ভাড়া গুণতে হয়। আবার ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে টিটিইর বাগবিতণ্ডতায় ঘটনা তো লেগেই থাকে। বিষয় যাত্রী ও টিটিইর জন্য বিব্রতকর বলেও জানান তিনি। 

rajshahi9

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনৈক টিটিই অভিযোগ করে বলেন, আসলে কিছু যাত্রী আছেন, যারা নানা ছুতায় ভাড়া না দিয়েই গন্তব্যে যেতে চান। ফলে তাদের সঙ্গে প্রায়ই ঝামেলা হয়। তবে তিনি স্বীকার করেন, এমন অনেক যাত্রীই আছেন, স্টেশনে টিকিট না পেলে ট্রেনে ভাড়া পরিশোধ করেন।      

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের পাকশী বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন জানান, পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের অধীনে মোট ১৭৫টি স্টেশন রয়েছে। এর মধ্যে জনবলের অভাবে ৫৪টি স্টেশন বন্ধ রয়েছে। বাকি ১২১টি স্টেশন প্রয়োজনের কম জনবল দিয়ে চালু রাখা হয়েছে। তবে পদের সংখ্যা তিনি তাৎক্ষণিক জানাতে পারেননি।
 
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের পাকশী বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন জানান, পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের ৪২টি স্টেশনে নিজস্ব কোনো জনবল নেই। দৈনিক মজুরি ভিত্তিক ‘টিআরএল’ জনবল দিয়ে স্টেশনগুলো চালানো হচ্ছে। 

rajshahi3

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক অসিম কুমার তালুকদার জানান, পাবনার ছয়টি স্টেশন মাস দুয়েক আগে প্রায় সপ্তাহ বন্ধ ছিলো। কারণ ওই স্টেশনগুলোতে ‘টিআরএল’ জনবল কাজ করতেন। তাদের চাকরির মেয়াদ ৩১ ডিসেম্বর শেষ। তাই তারা চাকরি স্থায়ী করার দাবিতে ঢাকায় গিয়েছিলেন। তিনি জানান, আদালতে মামলাসহ নানা জটিলতার কারণে দ্রুত স্থায়ী জনবল নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয় না। দ্রুত স্থায়ী জনবল নিয়োগ এবং বন্ধ সব স্টেশন চালুর বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রাণালয়কে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত পেলে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।