বিশ্বশান্তি নেমে আসুক ধরায়

কোভিডের বিষাক্ত-ভয়াল ছোবল থেকে পৃথিবী যখন নবোদ্যমে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন বিশ্বের বুকে নেমে আসে ইউক্রেন যুদ্ধ। বিদায়ি বছরে, বিশেষ করে অর্থনৈতিক সংকটে পিষ্ট হয়েছে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্ত। নতুন বছরকে সামনে রেখে তাই স্বভাবতই প্রশ্ন জাগছে—২০২৩ সালে আমরা সংকটের ঘেরাটোপ থেকে মুক্ত হতে পারব তো? একটি সুন্দর সোনালি সকালের দেখা পাব তো? যেখানে থাকবে না কোনো হানাহানি, সংঘাত-দ্বন্দ্ব।

জাতীয়-আন্তর্জাতিকভাবে ২০২২ সাল নানাভাবে স্মরণীয়-বরণীয়। সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের সুবাতাস যেমন আমাদের দেশে বয়ে যাচ্ছে, তেমনিভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘটিত বন্যা, ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং, সীতাকুণ্ড অগ্নিকাণ্ডসহ বহুবিধ বেদনা-বিধুর ঘটনা দেশবাসীকে নাড়িয়ে দেয় বিদায়ি বছরটিতে। তবে খুশির সংবাদও আছে বহু। এই বছর বহুল কাঙ্ক্ষিত পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণের মধ্য দিয়ে এক বিরল কীর্তি স্থাপন করেছে বাঙালি জাতি। দক্ষিণ অঞ্চলের জেলাগুলোর সঙ্গে সমগ্র দেশের আর্থবাণিজ্যিক উন্নয়নে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখছে এই সেতু। পাশাপাশি গুড ইকোনমিক রিটার্ন সমৃদ্ধ মেগাপ্রজেক্ট গ্রহণও দারুণ অবদান রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে। মুদ্রার উলটোপিঠ আমরা দেখতে পাই, রিজার্ভসংকট নিয়ে বিতর্ক, সড়ক দুর্ঘটনা এবং কিছু ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা ক্রমাবনতি! এসবের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে মানবিক মূল্যবোধবিবর্জিত কর্মকাণ্ড!

একুশ শতকের তৃতীয় দশক তথা ২০২২ সাল সমগ্র বিশ্ববাসীর কাছে ঘটনাবহুল ও স্মরণীয় হয়ে থাকবে। কেননা এ বছরটিতে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট এমন এক জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে পৃথিবী নব্যশীতল লড়াইয়ের ফলে বহুপক্ষীয় মেরুকরণের দিকে অগ্রসর হচ্ছে ক্রমশ। উদাহরণস্বরূপ বলা চলে, তাইওয়ান ও দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানে চীন ও তার মিত্ররা! মার্কিন স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির তাইওয়ান সফরকে কেন্দ্র করে বিষয়টা বেশ জটিল আকার ধারণ করে। অস্থিরতা দানা বাঁধে আরো বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে যায় চলমান ইউক্রেন যুদ্ধ!

ইউক্রেন সংকটকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র-ইউক্রেন-রাশিয়া তথাকথিত প্রক্সিযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। এখন সবার সামনে একটাই প্রশ্ন—এই সংঘাত শেষ হবে কবে? অনেকে একে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি হিসেবে অবহিত করছেন। যেভাবে এই যুদ্ধ ক্রমশ ভয়াল হচ্ছে, তাতে এটি যে একটি সর্বব্যাপী লড়াইয়ে রূপ নিতে পারে, এই দাবিকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না কোনোভাবেই। মূলত বিশ্ব হাঁটছে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের রাস্তা ধরে!

মনে রাখা জরুরি, এ যুদ্ধের শেষে বিশ্বকে পরবর্তী দশকগুলোতে বহন করতে হবে মারাত্মক অভিঘাত। এতে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হবে উন্নয়নশীল দেশগুলো। সেদিক বিবেচনায় নতুন বছরে ভেবেচিন্তে পা ফেলতে হবে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলোকে। 

৩৬৫ দিনের চিরায়ত নিয়ম শেষে আগমন ঘটে আরেকটি বছরের। যেখানে থাকে নানা ভাবনা, আশাভরসা ও পরিকল্পনা। থাকে সমাজ-রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেওয়ার নতুন প্রত্যয়। থাকে সীমাহীন প্রত্যাশা। শত সফলতা-ব্যর্থতার মধ্যে বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব জাতি-গোষ্ঠীর মানুষ ২০২২ সাল পার করে নতুন বছর ২০২৩কে স্বাগত জানানোর প্রতীক্ষায় আছে। এই প্রেক্ষাপটে মনে রাখতে হবে, অনেক স্বপ্ন সত্যি হয়, আবার অগণিত স্বপ্নের ঘটে মৃত্যু। তাই বলে তো জীবন থেমে থাকে না। সুতরাং, বিদায়ি বছরের পাওয়া না-পাওয়া মন থেকে ঝেড়ে ফেলে নবোদ্যমে পথ চলার বিষয়ে ভাবতে হবে। নতুন বছরে সামাজিক মূল্যবোধের জায়গাটিতে সবাইকে একটু বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। একটি বিভেদহীন সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণে দল-মত-নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ কাজ করবে বলেই মনে করি আমরা। বিগত বছরের ভুল-ত্রুটি শুধরে অনাগত দিনের জন্য নব স্বপ্ন-সংকল্প ও দৃঢ় উদ্যোগী প্রেরণায় প্রজ্বলিত হয়ে বৈশ্বিক কল্যাণ কামনার মধ্য দিয়ে শুরু হোক আমাদের জীবনের নতুন বছর। ২০২৩-এ সুখ-সমৃদ্ধি, কল্যাণময়তায় ভরে উঠুক সবার জীবন। আঁধার কেটে ফুটুক ভোরের আলো। বিশ্বশান্তি নেমে আসুক ধরায়।

লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়