জাতি হিসেবে বাঙালির রয়েছে বিশাল ইতিহাস। এই ইতিহাসের অনেকটা জুড়েই রয়েছে ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ লোক শহিদ হয়েছেন। ২ লাখ মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছেন। শাসকগোষ্ঠীর কবল থেকে দেশকে মুক্ত করতে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছেন আপামর বাঙালি। মনে রাখতে হবে, স্বাধীনতাযুদ্ধে যে শুধু বন্দুকধারী যোদ্ধাদেরই ভূমিকা রয়েছে, তা কিন্তু নয়।
স্বাধীন বাংলাদেশ বিনির্মাণে মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখ সারির সেনাদের অবদান ব্যাপক, কিন্তু এদের সঙ্গে আরও অনেক যোদ্ধা আছে, যারা বন্দুক হাতে না নিয়েও যুদ্ধে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তারা হলেন বাংলার শিল্পীসমাজ। মানতে হবে, বাঙালি জাতি স্বভাবতই অতি আবেগি। নিজেদের জাতিগত সংস্কৃতির প্রশ্নে যেন পাগলা ঘোড়া, যার উদাহরণ আমরা খুঁজে পাই ইতিহাসে। ’৪৭-এ দেশভাগের পর পশ্চিম পাকিস্তানি বাহিনী বাঙালির ওপর বৈষম্য শুরু করলে বাঙালি প্রথম জবাবটা দেয় ’৫২ সালে। এর পর থেকেই বাঙালির সংস্কৃতি, ভাষা রক্ষার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে তখনকার বাউল-গীতিকাররা তাদের গানের কলিতে দেশ ও জাতির মাটি, পানি, বায়ুর কথা তুলে ধরতে শুরু করেন, যার প্রথম ও প্রকৃষ্ট উদাহরণ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা.... গান’। এটা আমরা এখন জাতীয় সংগীত হিসেবে গেয়ে থাকি। অনেকেই জানি না, আমাদের জাতীয় সংগীত বাউল গান থেকে নেওয়া হয়েছে। এরকম আরো শত শত বাউলের একতারায় তোলা হাজার হাজার সুরে বাংলাদেশের, বাঙালি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি সুনিপুণভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটার কথাই বলি আর গোবিন্দ হালদারের ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি’ গানটার কথাই বলি—এগুলো আমাদের রক্তের সঙ্গে মিশে আছে! কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, আজকের প্রজন্মের কজন জানে এই গানগুলো সম্পর্কে!
বাংলার গানগুলোর একেকটি কলি মুক্তিযুদ্ধের সময় বুলেটের মতো কাজ করেছে। মুক্তিযোদ্ধারা রেডিওতে গান শুনে নিজেদের আত্মবিশ্বাস বহুগুণে বাড়িয়ে নিতেন। অগ্নিঝরা দেশাত্মবোধক বহু গান থেকেই মূলত যুদ্ধের সময় দামাল ছেলেরা নিজেদের আত্মশক্তি, মনোবল খুঁজে পেতেন। মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে বন্দুক থাকলেও বুকে ছিল দেশের জন্য ভালোবাসার ফোয়ারা, এই জাতিকে মুক্ত করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। আর সে সময় তাঁদের মনোবল, মানসিক শক্তির উৎস ছিল এই দেশাত্মবোধক গানগুলো। তখনকার বাউল গীতিকারেরা সরাসরি যুদ্ধ করতে না পারলেও একতারা, দোতারায় সুর তুলে গানের মাধ্যমে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। কিন্তু আফসোস! আজকের প্রজন্ম দেশাত্মবোধক গান সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখে না! মুক্তিযুদ্ধের সময়কার গানগুলো শুনলে আজও রক্তের তেজ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। দাঁড়িয়ে যায় শরীরের লোম। অথচ চেতনা বহনকারী গানগুলোকেই পিষে মারছি আমরা!
অস্বীকার করার উপায় নেই, গানগুলো উপেক্ষা করার মাধ্যমে ধীরে ধীরে আমরা অকৃতজ্ঞ জাতিতে পরিণত হচ্ছি! সত্যিই, এ বিষয়ে চোখে পড়ার মতো কোনো উদ্যোগ নেই! টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ডিসেম্বর মাস এলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক অনুষ্ঠান করে দেশপ্রেমের বন্যা বইয়ে দেয়। পত্রপত্রিকায় শ্রদ্ধার জোয়ার আসে। এরপর আর গানগুলো খুঁজে পাওয়া যায় না। কী অদ্ভুত কথা! দেশে কত-শত সংস্থা, কত আয়োজন, কত প্রতিযোগিতা! অথচ দেশাত্মবোধক গানের চর্চা কোথাও চোখে পড়ে না!
স্বাধীনতার চেতনাকে যুগ যুগ ধরে টিকিয়ে রাখতে হলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালন করতে হবে। এর জন্য আমাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্যের পরিচায়ক দেশের গানের রস নিজের মধ্যে ধারণ করার অন্যথা নেই। তাই সিজনাল নয়, এই গানগুলোর চর্চা করতে হবে সারা বছর। এর জন্য প্রয়োজনে দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়মিত বিরতিতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজনে গানগুলো বাজানোর ব্যবস্থা করতে হবে। বহিঃশত্রুর হাত থেকে দেশকে রক্ষার জন্য প্রয়োজন জাতীয়তাবোধ। আমাদের দেশাত্মবোধক গানগুলো মূলত এর বড় উৎস। তাই আমাদের এই গানগুলো বেশি বেশি চর্চা করতে হবে। এর গুরুত্ব উপলব্ধি করতে হবে। এবং সর্বোপরি, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে গানগুলো বাঁচিয়ে রাখতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়